default-image

জীবন সিংহ ইউনিয়ন হাইস্কুল বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার সদরে। স্কুলটার বর্তমান নামে ‘মডেল’ যুক্ত হয়েছে। বাদ পড়েছে ‘ই’। সামনের দুটো খুঁটিতে লাগানো বোর্ডে তখন সেটার নাম লেখা ছিল ‘এইচ ই’ মানে ‘হাই ইংলিশ’ স্কুল। স্কুলটার নামে ‘জীবন সিংহ ইউনিয়ন’ কেন ছিল তা এত দিন পরে আর মনে নেই, সেটাও বলা ভুল হবে। কারণ, ওই স্কুলেরই শিক্ষক রমেশবাবু বলেছিলেন ইউনিয়নটার নামে ওটার নাম। এখন সেই নামে কোনো ইউনিয়ন বাকেরগঞ্জে পাইনি।

এখানে একটা কথা বলে রাখি, এ লেখায় তথ্যগত ভুলের জন্য আমাকে দায়ী করা যাবে না। আমার যদি জানাই থাকত একদিন এ কাহিনি লিখতে হবে, তাহলে হয়তো কিছু টোকা রাখা যেত। বলাবাহুল্য, টোকা নেওয়ার কোনো অভ্যেস বা যোগ্যতাই আমার ছিল না। তখন আমি কেবল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। কাজেই টোকা লেখা নিয়ে আমার ধারণা কী ছিল, তা আপনারা সহজেই বুঝে নিতে পারবেন। আপনারা শিক্ষিত সমাজ, আপনাদের এসব বিষয়ে ফাঁকি দিতে পারব না বলে আগে ভাগেই বলে রাখছি, নিজ গুণে মার্জনা করে দেবেন।

আগে যে বললাম ‘তখন’ সেটা কখন, প্রশ্নটা আপনারা করতেই পারেন। তখন মানে মারশাল্লার পর। ভাটির ভাষায়, মানে বরিশাইল্যায় মার্শাল ল মারশাল্লা বলেই কথিত। আর এ কাহিনিটা বরিশালের। বরিশাইল্যা তাই সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য হতে পারে না। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সাড়ে তিন সামরিক আইন জারির প্রথমটার কথা বলছি। পাকিস্তানের উন্নতি করার আর কোনো সুযোগ না পেয়ে ক্ষমতাটা পোক্ত করাই উত্তম ভাবেন আইয়ুব খাঁ সাহেব। ১৯৫৮ সালে তাই তিনি ‘মারশাল্লা’ জারি করে দিলেন।

আবারও প্রশ্ন করবেন চতুর্থ মানের ছাত্র হলেও হাইস্কুল কেন, আমার তো প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার কথা। ঠিকই ধরেছেন, আমার প্রাইমারি স্কুলেই যাওয়ার কথা এবং যেতামও তাই। হাইস্কুল কেন এল এখানে, তা বলছি।

এখন গুগল যেটাকে বরিশাল-সুবিদখালী সড়ক বলছে, সেটার তখন কোনো নাম ছিল না। বিঘাই নদীর বাকেরগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে তখনকার জেলা বোর্ডের ইট-সুরকি বিছানো রাস্তাটা ধরে এখনকার সিটি সুপার মার্কেটের দিকে শ দুয়েক গজ গেলে একটা চৌরাস্তা পড়ত। ঠিক সেখানেই স্কুলটা। লঞ্চঘাটে যাত্রী চলাচলের কারণে ‘মাশ্যাইব’দের (ছাত্রদের) পাঠে মনোনিবেশ করতে কষ্ট হতে পারে, হয়তো সেই বিবেচনায় এই রাস্তাটাকে রাখা হয়েছিল স্কুলের পেছন দিকে।

চৌরাস্তা থেকে বাঁয়ের পথ ধরে বিশ গজ গেলে সীমানার ঠিক মাঝ বরাবর স্কুলের প্রধান ফটক। তাতে কাঠের দুটো দরজাও ছিল। স্কুল চলার সময় তা বন্ধ থাকত, পলায়ন আকাঙ্ক্ষীদের জন্য বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। তা যে একদম অকার্যকর ছিল, এটা বলা যাবে না। সীমানা চৌহদ্দি একধরনের বুনো ঝোপ দিয়ে ঘেরা ছিল। যুক্তরাজ্যে বাড়ির সামনে ওই জাতের গাছ দিয়েই বেড়া দেওয়া হয়। বছরে হয়তো একবার, সাধারণত স্কুল পরিদর্শক আসার আগে, ওগুলো ছেটে সুন্দর করে রাখা হতো। উঁচু শ্রেণির ছাত্ররা হয়তো এসব কাজ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে করতেন।

ফটক থেকে এক শ গজ ভেতরে তৃতীয় বন্ধনীর প্রথম প্রান্তের আকারে বানানো একটা টিনের ঘরে ছিল স্কুলবাড়ি। স্কুলের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে স্কুলবাড়িটার ডান দিকের শাখাটা ছিল প্রাইমারি স্কুলের। সেটার শিক্ষকেরা কাজ করতেন পৃথক প্রধান শিক্ষকের অধীনে, যাঁর নাম ছিল আবদুল খালেক।

বাড়িটায় প্রাইমারি স্কুলের কোনো স্বত্ব ছিল না। যেটুকু তাদের দয়া করে দেওয়া হয়েছিল, সেই অংশের মাঝখানে বাঁশ ফাটিয়ে বানানো দড়মার বেড়া দিয়ে শ্রেণিকক্ষগুলো আলাদা করা হয়েছিল। সামনের দিকে টিনের দেয়াল থাকলেও পেছনে ছিল দড়মার বেড়া। আমাদের কক্ষটার পেছনের দিকের বেড়াটায় কিছুটা অংশ ভাঙা ছিল। সেই ‘ফোকল গলে’ আমাদের সহপাঠী পুতুল ক্লাসে ঢুকত। স্মৃতি হাতড়ে ওর নাম পুতুলই পেলাম। চেহারাটা আবছা যেমন মনে আছে, তাতে ওর গোলগাল ভরাট মুখটার নিচে ছিল চোখা একটা চিবুক। অনেকটা দুর্গা প্রতিমার মত। লক্ষ্মীর মতোও হতে পারে। মৃৎ ভাস্করদের বানানো প্রতিমাগুলোয় দেবীদের চেহারা প্রায় একই রকম লাগত আমার কাছে। ওর গড়ন ছিল নাদুসনুদুস। ইদানীং তরুণীরা কোনো বাচ্চাকে দেখলে যেমন নিচের চোয়ালটা ইঞ্চিখানেক সামনে বাড়িয়ে জিবটাকে অলস রেখে ‘আমা...গুটলু বাচ্চা’ বলে আহ্লাদ করেন, ঠিক তেমনি গড়নের। ওকে খাটোই বলা যায়। ‘কোন মিস্তিরি’ ওর ‘দেহঘড়ি’র রং দেওয়ার সময় দুধে দু-এক চিমটি বাটা হলুদ মিশিয়ে থাকতে পারেন। আলতা দেননি এক ফোঁটাও। তাই ওটাকে চাঁপা ফুলের রং বলা যায়।

পুতুলদের বাড়ি ছিল একদম স্কুলের লাগোয়া। আসলে স্কুলের চারপাশে বেশ কিছু হিন্দু বাড়ি ছিল। প্রায় সব বাড়ির সামনের দিকটা ছিল দোকান। স্বর্ণকার, কর্মকার, মুদি, মনিহারি আর শাঁখার। সেখানে অন্তত তিনটি বাড়িতে দুর্গাপূজা হতো শরতে। বলাই বাহুল্য, সেই সময়টা আমার জন্যও ছিল পোয়াবারো। প্রভাবশালীর ছেলে হওয়ার কারণে ওই সব বাড়িতে গেলে আমার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ত, জুটত আস্ত রসগোল্লা, কখনো কখনো একাধিক।

লক্ষ্মীপূজার পর পুতুল শিক্ষকদের জন্য নারকেলের নাড়ু নিয়ে আসত। বন্ধু হিসেবে বিবেচিত কয়েকজন ওই ফোকল গলে পুতুলের সঙ্গে যেতাম ওদের বাড়িতে। ওর দিদিমা আমাদের হাতে একটা করে নাড়ু দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ গজ গজ করতে করতে অন্য কাজে মন দিতেন। আমরা অপেক্ষায় থাকতাম ওর মা কখন বের হবে। বুঝতেই পারছেন, মিষ্টান্ন বিতরণে পুতুলের সুপারিশের কোনো দাম ছিল না। তবে ওর মা ঘর থেকে বের হলে আমরা আর হতাশ হতাম না।

একদিন পুতুল স্কুলে এল না। ওদের বাড়ির দিক থেকে কান্নার বিলাপ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমাদের স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হলো। পুতুলের বাবা মারা গিয়েছিলেন। স্কুল থেকে সহপাঠীরা দল বেঁধে দেখতে গেলাম। পুতুল ঘর থেকে বের হয়েছিল কি না মনে নেই।

ওদের বাড়ির সঙ্গেই সুপারিবাগানের একটু ফাঁকা জায়গায় বেশ কিছু গাছের গুঁড়ি দিয়ে একটা চিতা বানিয়ে তার ওপর ওর বাবাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। একটু পরেই মুখাগ্নি করা হবে। পুতুলের একটা বড় ভাই ছিল। কিশোর ছেলেটিকে ঘর থেকে বের করে আনা হলো। তারপর একটা মশাল জ্বালিয়ে মুখাগ্নি করা হলো। আগুনের লেলিহান শিখা দেখে আমি খুব বিচলিত হয়ে পড়লাম। আর দুর্গন্ধে টেকাও ছিল দায়। জ্ঞান হওয়ার পর কোনো মৃত্যু এবং সৎকারের সঙ্গে সেই আমার প্রথম চাক্ষুষ পরিচয়।

শরৎচন্দ্র বা অন্যান্য কারও লেখা বুঝে না বুঝেই পড়া শুরু করেছিলাম। হয়তো তাঁরই কোনো লেখায় সতীদাহের কথা পড়ে, পরে ইতিহাসে সতীদাহ নিবারণ, আশির দশকে ইন্ডিয়া টুডে সাপ্তাহিকে রূপ কানোয়ারের কাহিনি জেনেছি; তখন সব সময় আমার কল্পনায় ওই চিতার বীভৎস ছবি ভেসে উঠেছে। সতীদাহের ভয়াবহতা ভেবে শিউরে উঠেছি।

কী বলছি এসব। ধান ভানতে শিবের গীত। আসল ঘটনায় ফেরা যাক।

আমাদের স্কুলে নিয়মিত মাসিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। কবিতা পড়া, গান গাওয়া এসব। তখন এক আনা, দু’আনা চাঁদা নেওয়া হতো। সেই টাকায় কেনা হতো মিষ্টি বিস্কুট ইত্যাদি (চাঁদার আরেকটা বিষয় পরে বলছি।) অনুষ্ঠানের শেষে বেটে দেওয়ার জন্য। আর বার্ষিক একটা অনুষ্ঠান হতো হাইস্কুলে। অনুষ্ঠানের সময় বাড়িটার এক কোণের দিকে মঞ্চ বানিয়ে দুদিকের বেড়াগুলো খুলে দেওয়া হতো। সেখানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেন সাবরেজিস্ট্রার সাহেবের ছেলে। আর অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন আমাদের খালেক স্যার। ভদ্রলোক নাকি যাত্রাদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বার্ষিক অনুষ্ঠানে খালেক স্যার কমিক দেখালেন। আলুথালু বেশে বিলাপ করছেন, ‘মোর কি অইবেরে...।’ পাশে একজন দাঁড়িয়ে ঘটনা কী জানার চেষ্টা করছে নানা প্রশ্ন করে—বাবা, মা, ছেলে, মেয়ের মৃত্যু থেকে ফসল কেটে নেওয়া, জমি দখল, ব্যবসায় লোকসান—সব প্রশ্নেই স্যারের উত্তর শেষ হচ্ছে ‘মোর কী অইবেরে...’ জবাবে। প্রশ্নকারী শেষমেশ জিজ্ঞেস করল ‘ও মেয়া তোমার পরিবারের কিছু অইছে?’ স্যারের বিলাপ, ‘এই তো গোড়ায় আইছোরে...’। প্রশ্নকারীর উপদেশ, ‘বউ মরছে হেয়াতে অইছে গি। বিয়া আরেট্টা হইরগা লও।’ স্যার তাতে কিছুটা শান্তি পেলেন, ‘হাছা কইছ? মোর অইবে কি!’ তাঁর মুখে হাসি ফুটল। আর পুরো স্কুল ফেটে পড়ল হাততালিতে। পরবর্তীকালে বন্ধুমহলে আর বাসায় এর অনুকরণ করে আমিও প্রায় তারকা মর্যাদা পেতে চলেছিলাম। কিন্তু দাদা বাদ সাধলেন। আমার কমিক বন্ধ হলো। সে কাহিনি আরেক দিন বলব।

এমন কৌতুকবাজ খালেক স্যার কী করে জোড়া বেত দিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের পেটাতেন, আমি ভাবতেই পারি না। এক দিন তিনি আমারও আতঙ্কের কারণ হয়েছিলেন।

আগে বোধ করি বলেছি আমাদের স্কুলে এটা-সেটার জন্য চাঁদা নেওয়া হতো। মার কাছ থেকে তা চেয়ে নেওয়া ছিল এক ঝকমারি ব্যাপার। মা মনে করত ওই পয়সা খরচ হবে কটকটি আর তিলের খাজা কিনতে। ঝাল বলে এক আনা, দুআনা দামের চানাচুরের বস্তা আমার একদম পছন্দ ছিল না।

যাহোক, একদিন স্কুলে ঘোষণা করা হলো চার আনা চাঁদা দিয়ে লটারির টিকিট নিতে হবে সবাইকে। ‘প্রাইজ’ দেওয়া হবে। খেলায় আগে কার দান বা কোন দল দাঁড়িয়াবান্ধায় ‘পড়বে’ তা ঠিক করার জন্য মাটির চাড়া দিয়ে লটারি করার অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু ‘প্রাইজ’ ব্যাপারটাই উত্তেজনা বাড়িয়ে দিল। কেঁদেকেটে অনুনয়-বিনয় করে চার আনা পাওয়া গেল এবং টিকিটও কিনলাম। তারপর একসময় ভুলে গেলাম।

আমাদের স্কুলে একজন নতুন স্যার ছিলেন। কত দিন আগে তাঁর নতুনত্ব শুরু হয়েছিল, সেটা জানতে হলে গবেষণা করতে হবে। স্যার অন্য স্যারদের তুলনায় কম বয়সী ছিলেন। একদিন আমাদের ক্লাসে একটা নতুন মেয়ে এল। নাম ফিরোজা। মনে আছে, কারণ ওকে নিয়েই ঘটনাটায় আমি ফেঁসে যাই। বেশ ডাঙর মেয়েটা। দেখতে বারো-তেরো বছরের মনে হয়। পরনের ফ্রক ওপরের দিকে আঁটসাঁট হয়ে যাচ্ছিল বলে ওড়না পরতে হতো ওকে।

সেদিন ঘণ্টা বাজার পর নতুন স্যার ক্লাসে এলেন। ক্লাস ক্যাপ্টেন রুস্তম ‘স্ট্যান, সিট’ করানোর পর ফিরোজা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল:

 ‘ছার, বাইরে যামু।’ বাইরে মানে প্রকৃতির আহ্বানে। পুতুল আর ফিরোজা বাইরে চলে গেল। মেয়েরা দুজন করে যেতে পারত।

হয়তো পড়া হয়েছিল না। তাই আমিও উঠে দাঁড়ালাম:

 ‘ছার, বাইরে যামু।’

 ‘না।’

আমি হতবাক। পায়ের রক্ত ধাঁই করে মাথায় উঠে কী খেলা খেলল কে জানে। এখনো যেমন বেফাঁস কথা বলে অনেক সময় বিড়ম্বনার শিকার হই, তেমন ঘটনাই ঘটালাম।

 ‘ক্যান বাইরে যাইতে দিবেন না। ওই মাইয়াটারে দিলেন ক্যান। মাইয়া বইল্যা?’ আমি রেগে বললাম।

সমস্ত ক্লাস স্তব্ধ হয়ে গেল। ‘এমন বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ।’ নতুন স্যারও হতভম্ব। আমি চুপ করে বসে গেলাম। স্যার কিছুক্ষণ কী কী সব পড়িয়ে চলে গেলেন। তিনি যাওয়ার পরপরই ক্লাসের সবাই আমাকে ঘিরে ধরল। অনেকেরই অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী শুনতে পেলাম। জোড়া বেতের নিদেনপক্ষে পঞ্চাশ ঘা আমার বরাতে অপেক্ষা করছে। এক শ না পঞ্চাশ এই নিয়ে ছোটখাটো বিতর্কও চলছে। পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে বড় বোন অস্বাভাবিক আদর করে জিজ্ঞেস করল, ‘গতকাল কী হয়েছিল’। আমি স্কুলে না যাওয়ার পাঁয়তারা করছিলাম। সফল হলাম না।

টিফিনের আগের পিরিয়ডে খালেক স্যার হঠাৎ করে আমাদের ক্লাসে ঢুকে আমাকে বললেন, ‘টিফিনের সময় আমার ঘরে আসিস।’ শুনে আমার শরীর হিম হয়ে গেল। কোনো কোনো মুহূর্তে জেমস বন্ডের যেমন হতো, আমার শিরদাঁড়ার স্নায়ুর ভেতর
দিয়েও তেমন একটা মাকড়সা নেমে গেল।

আমার অবস্থা তখন জল্লাদের হাতে বন্দী রাজপুত্রের মতো। ঘাড়ে তলোয়ারের কোপের অপেক্ষায় বুক দুরু দুরু। অনিল দপ্তরি আমার অবস্থা বিবেচনা না করেই যথাসময়ে ঘণ্টা বাজিয়ে দিল।

আমার আর ক্লাস থেকে বের হতে ইচ্ছে করছিল না। যে ক্লাসকে কয়েদখানা ভাবতাম, সেটাকেই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে হচ্ছে। কিন্তু উৎসাহী সহপাঠীরা আমাকে একরকম টেনেহিঁচড়ে খালেক স্যারের অফিসের দিকে নিয়ে গেল। আমাকে পেটানো হবে আর আমি মাটিতে গড়াগড়ি খাব, এটা দেখার নিষ্ঠুর উল্লাস থেকে বঞ্চিত হতে তারা রাজি নয়।

 ‘মাই কামিং ছার, ’ আমি খালেক স্যারের ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে প্রায় নিস্ফুট শব্দে বললাম। ভেতরে টেবিলের ওপর সাদা দুটো বেত, একদিকে দুটোর মাথা সুতো দিয়ে বাঁধা। পাশের একটা চেয়ারে নতুন স্যার বসে। মেঝের কিছুটা অংশে ছড়িয়ে পড়েছে হলদেটে এক রকম তরল। ওটারই কটু গন্ধ হয়তো নাকে আসছিল। আমার ইংলিশ প্যান্টের ভেতর থেকে পা বেয়ে তেমন তরলের নেমে আসার আগ্রহ অনুভব করছিলাম। দরজায় ভিড় করে আছে উৎসুক চোখগুলো।

 ‘আয়।’ খালেক স্যার উঠে দাঁড়ালেন।

আমার হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেছে। অর্ধচেতন কানে কী এক গুঞ্জন শুনি, ‘তুই লটারিতে ফাস্ট হইছস। এইডা তোর প্রাইজ।’ খালেক স্যার জানালার শিক থেকে একটা দড়ি খুলে আমার হাতে দিলেন। তাঁর হাতের স্পর্শে সংবিৎ ফিরে পেলাম। দেখি দড়ির অপর প্রান্তে একটা কালো ছাগলের বাচ্চা, ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট। আমি হতভম্ব। হঠাৎ ছাড়া পেয়ে ভ্যাবাচেকা ছাগলের বাচ্চাটা দিল দৌড়। মজা দেখতে আসা সহপাঠীদের পায়ের ফাঁক দিয়ে ওটা বের হয়ে সামনের মাঠে দৌড়াতে শুরু করল।

সহপাঠীদের মধ্যে বিমল, মিজান এবং অন্যরা চারদিক থেকে দৌড়ে বাচ্চাটাকে ধরার চেষ্টা করতে থাকল। কিছুক্ষণ পর ধরলও। ওরা আর আমার ওপর ভরসা করতে পারল না। নিজেরাই আমাদের বাসায় দিয়ে আসার মজা পুরোটা নিতে চাইল। দু-তিন জন রশিটা ধরে রাখল।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রাস্তায় এমন একটা দৃশ্য দেখা গেল। একটা মুক্তিকামী ছাগলের বাচ্চা ম্যা ম্যা চিৎকার করতে করতে ছুটে যেতে চাইছে। আর জনা দশ-বারো ছেলেমেয়ে একটা দড়ি ধরে ছুটছে তার পেছনে।

ছাগল বিজয়ের মিছিল চলছে। 

অনুলেখ: মনে হয় বিশ্বের একমাত্র ছাগল বিজয়ী হিসেবে আমার নাম গিনেস বুকে জায়গা পেতে পারে।

বিজ্ঞাপন
গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন