default-image

চল্লিশের পর বৃষ্টি নামলে কোনো একটা শেডের নিচে দাঁড়াতে হয়। না হলে বিপদ। জ্বর, সর্দি, কাশি—এসব হাবিজাবি পেয়ে বসে। আমার ৪০তম জন্মদিনের ৭ মাস ১৯ দিন পর এ রকম সর্দিজ্বর বাধিয়ে বসলাম। মিথিলার সঙ্গে ব্রেকআপ হয়ে গেল।

এর আগে আমরা দুজন মাস তিনেক বৃষ্টিতে ভিজেছি। মিথিলার বয়স ২৯। এত লোক থাকতে সে একচল্লিশের একজনের সঙ্গে কেন বৃষ্টিতে ভিজতে চেয়েছিল, জানি না। এটুকু বলতে পারি, সে যত দিন আমার সঙ্গে ছিল, একবারের জন্যও মনে হয়নি, কোথাও কোনো সমস্যা আছে। সবকিছু যেমনটা হওয়া উচিত, সেভাবেই চলছিল।

আমার ব্লাইন্ড স্পট সমস্যা আছে। কিছু ব্যাপার মিস করে যাই।

দুই.

ক্যাসানোভা নই আমি। মেয়ে পটানোর ১০১টা সহজ উপায় থাকতে পারে, সেগুলো জানি না। বরং ১০১টা উপায়ে পটে যেতে পারি।

২০২০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি। তখন কোভিড-১৯ ভাইরাস পিক ফর্মে। ঢাকায় লকডাউন। ঘরে বসে সবাই ফেসবুক লাইভ, ওয়াচ পার্টি—এসব নিয়ে মেতে আছে। সে রকম একটা লাইভ শোয়ে মিথিলাকে প্রথম দেখি। ঘর বা অফিস কীভাবে সুন্দর করে সাজানো যায়, তার ওপর ছিল সেই শো।

মিথিলা হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে, আমার চোখ দুটো ল্যাপটপের স্ক্রিনে আটকে গেল। সে আকর্ষণীয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সেদিন পরেছিল মিডনাইট ব্লু রঙের ফতুয়া। চুলগুলো কাঁধ পর্যন্ত ছড়ানো। চোখগুলো ভেজা। দেখে মনে হয়, ভেতরটায় উঁকি মেরে দেখি একবার।

কিন্তু চেহারা আমাকে টানেনি। আমি মূলত স্যাপিওসেক্সুয়াল। আমাকে টানল তার কথা বলার ভঙ্গি। তার ভেতর একটা বন্য সারল্য আছে। কথা কমই বলছে। তবে যখন বলছে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছে। প্রোফাইল ঘাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, বুয়েট থেকে আর্কিটেকচারে পাস করেছে। তারপর ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ে জড়িয়ে পড়ে। রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসে লেখা, ইটস কমপ্লিকেটেড।

কমপ্লিকেসি কোনো সমস্যাই নয়। এগুলো পাত্তা দিই না আমি। আমার সমস্যা সাহসে। সাহস করে তাকে আউটবক্সে একটা মেসেজ দিতে পারছিলাম না। পুরো দুদিন চেষ্টা করলাম। হলো না।

মূল্য ব্যাপারটা সব সময়ই আপেক্ষিক। বাজার চাহিদার সঙ্গে ওঠানামা করে। মিথিলার ব্যাপক বাজার চাহিদা থাকার কথা। সে যদি ইনবক্স–আউটবক্সে সবার টেক্সটের উত্তর দিতে শুরু করে, তাহলে তার এক জীবন সেটা করতে করতেই কেটে যাবে। সুতরাং আমাকে ইনোভেটিভ হতে হবে। ‘গডফাদার’ ছবিতে মারলন ব্রান্ডো যেমন বলে, ‘আই অ্যাম গনা মেক হিম অ্যান অফার হি কান্ট রিফিউজ...’, সে রকম।

হঠাৎ মনে পড়ল, আমার স্টুডিওটা রিনোভেট করা দরকার। আমি তো তার ক্লায়েন্ট হতে পারি। ক্লায়েন্ট হিসেবে নক দিতে সমস্যা কোথায়? গুছিয়ে একটা মেসেজ লিখলাম।

পরের মাসে চারবার সে আমার অ্যাপার্টমেন্টে এল, দলবল নিয়ে। লোকেশন দেখে আমার চাহিদা কী কী, সেসবের তালিকা করল। তারপর নকশা। বাজেট নিয়ে সমস্যা হলো না।

আমার স্কেচবইয়ে প্রতিবার তার একটা করে রাফ স্কেচ করলাম। সে যখন কাজে ব্যস্ত, তখন আমি রুমের এক কোণে গোবেচারার মতো বসে স্কেচগুলো করে ফেললাম।

স্টুডিও রিনোভেশন শেষ হওয়ার পরদিন ইজেলে একটা নতুন ক্যানভাস বসালাম আমি। আমার সামনে একটা চেয়ারে রাখা স্কেচবই। সেখানে মিথিলার চারটা রাফ স্কেচ করা। তিন নম্বর ব্রাশ দিয়ে তার মুখের আউটলাইন দিলাম প্রথমে। স্কেচগুলো কিছুক্ষণ পর আর দেখার দরকার পড়ল না। ওই মুখ মনে গেঁথে আছে। হাত আপনাআপনি কাজ করতে শুরু করল। অটো পাইলট মুড অন তখন। দিন–দুনিয়া ভুলে গিয়ে পোর্ট্রেটটা শেষ করলাম। এক সপ্তাহ সময় লাগল। রং শুকাতে লাগল আরও দুই সপ্তাহ। ফ্রেমে বাঁধাই করে সেই অয়েল পেইন্টিং নিয়ে সোজা গেলাম মিথিলার অফিসে।

এরপর সবকিছু খুব দ্রুতই ঘটে গেল। বর্ষার মৌসুম তখন। বৃষ্টিবাদলা লেগেই থাকে। আকাশ কালো করে মেঘ করে। অঝর ধারা ঝরে। আমরা ভিজলাম। ওর স্বামীর সঙ্গে সেপারেশন চলছিল। ভিজতে আমাদের কোনো অসুবিধা ছিল না। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ও একটা বড় ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে এসে উঠল আমার অ্যাপার্টমেন্টে।

বিজ্ঞাপন

তিন.

শুরুতেই বলেছিলাম, চল্লিশের পর বৃষ্টিতে ভিজলে সর্দিজ্বর পেয়ে বসবে। সেই জ্বর আমাকে ধরল অক্টোবরের এক বিকেলে। তেপায়া টুলে বসে পেইন্টিং করছিলাম। আমার স্টুডিও রুমটা অ্যাপার্টমেন্টের একদম পশ্চিমে। দুপুর পর্যন্ত সেখানে বাতি জ্বালিয়ে কাজ করতে হয়। আর শেষ বিকেলে সূর্যটা যেন একদম তেরছাভাবে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। অক্টোবরের সেই রোদঝলমলে বিকেলে আকাশে কোনো মেঘ ছিল না। কিন্তু বজ্রপাত হলো, বোল্ট ফ্রম দ্য ব্লু। মিথিলা তার ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি একটু মার বাসায় যাচ্ছি।’

অবাক হয়ে মেঝেয় রাখা ব্যাগটার দিকে তাকালাম। ব্যাগের আকার দেখে ‘একটু যাওয়া’ বলে মনে হলো না।

‘কবে আসবে?’ হাতের ব্রাশটা রেখে বললাম।

সে বলল, ‘এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।’

‘মানে কী?’

‘কয়েকটা ব্যাপার নিয়ে আমি বেশ আপসেট।’

‘আপসেট!’

‘হুমম।’

‘আমাকে নিয়ে?’

‘না, নিজেকে নিয়ে।’

‘আমার সাথে শেয়ার করা যাবে না?’

‘এই মুহূর্তে পারছি না।’

আমি কিছু বললাম না। মিথিলা অন্যমনস্কভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘আমরা মাঝেমধ্যে কথা বলতে পারি। আমি তোমাকে ফোন দেব। কেমন?’

‘তুমি ফোন দেবে? আমি দিতে পারব না?’

‘না।’

‘কেন?’

‘প্রতিটা খেলারই নিয়ম আছে।’

আমি চুপ করে রইলাম।

‘ক্রিকেট বলো, ফুটবল বলো—আলাদা আলাদা নিয়ম। কিন্তু খেলার মূল নিয়মকে সবাই শ্রদ্ধা করে। সেগুলো ভাঙে না।’

‘হুমম।’

‘যতক্ষণ পর্যন্ত শ্রদ্ধা থাকবে, খেলা চলতে পারে। তোমার নিয়ম অনুসারে তুমি, আমি আমার। শ্রদ্ধা শেষ তো খেলাও শেষ।’

‘আমাদের কি শ্রদ্ধা শেষ?’

কী একটা যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল মিথিলা। বলল, ‘আমি ফোন দেব, পরে কথা হবে।’

ভাবলাম, সম্পর্ক যদি শেষ হয়ে যায়, ও আমাকে কেন ফোন দেবে? কী কথা বলব আমরা? পুরো ব্যাপারটাই একটা ধাঁধার মতো মনে হলো। মিথিলা চলে যাচ্ছে, এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলাম না। ব্রেকআপের পর আমরা কী নিয়ে কথা বলব, তা খুঁজে বের করাই সে মুহূর্তের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনো হলো।

মিথিলা তার ট্রাভেল ব্যাগটা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে বলল, ‘কেন চলে যাচ্ছি, কাল বলব। আজ রাতে একটু গুছিয়ে নিই নিজেকে। সকালে টেক্সট করব।’

‘টেক্সট করবে!’

‘হুমম, সকাল ১০টায়।’

পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল যখন কিছু বুঝতে পারে না, তখন সেটা বাদ দিয়ে যা বুঝতে পারবে, সেসব নিয়ে মেতে ওঠে। অন্য আরেক দল মানুষ আছে, তারা বুঝতে না পারা বিষয়টার পেছনে লেগে থাকে। সেটা বুঝে তবেই তাদের শান্তি। আমি এই দুই ধরনের বাইরের মানুষ। বিরল প্রজাতির। যখন কিছু বুঝতে পারি না, তখন মাথা কাজ করতে দিই না। অটো পাইলট মুড অন করে নিজেকে ছেড়ে দিই। হাত–পা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে। তখন হুইস্কি আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

চার.

পরদিন সকাল দশটায় ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজল। সঙ্গে সঙ্গে টুং টুং করে মেসেজ অ্যালার্ট টোন। কোনোটা আগে, কোনোটা পরে নয়; একই সঙ্গে। কিছু কিছু মানুষের সময়জ্ঞান এত নিখুঁত হয় কী করে! দশটা মানে দশটা। এমন নয় যে মিথিলা ঘড়ি সামনে নিয়ে বসে ছিল। এটা তার অভ্যাস। ক্যাজুয়ালি সে এই অভ্যাস রপ্ত করেছে। হয়তো চা খাচ্ছে, খবরের কাগজ পড়ছে; হঠাৎ ফোনটা টেনে নিল, মেসেজ টাইপ করে সেন্ড করল। ঘড়িতে তখন ঠিক দশটা।

ঘুম ঘুম চোখে মেসেজটা খুললাম। লেখা, ‘আমার স্বামীর সঙ্গে প্যাচআপ হয়ে গেছে। কখন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, জানতে চেয়ো না। ব্যাখ্যা করা কঠিন। প্যাচআপটা হয়ে যেতে পারে বলেই তোমার সঙ্গে সিরিয়াস কোনো কমিটমেন্টে যাইনি। আমার সঙ্গে আর যোগাযোগের চেষ্টা কোরো না। সবকিছুর জন্য সরি। ভালো থেকো।’

আমার মনে হলো, আমাদের তিন-চার মাসের সম্পর্কটা মুঠোফোনের পর্দার এই কটা লাইনে বেশ এঁটে গেছে। আমার রাগ হলো না। হওয়ার কথা কি না, জানি না। বিষয়টা দাঁড়াল এই, ‘তুমি সুমন, তুমি আমাকে ভালোবাসতে। আমি তোমার ভালোবাসা নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি। আমি চাই এখন আমাকে অন্য কেউ ভালোবাসুক।’ এই তো?’

মিথিলার একটা ফাঁকা জায়গা ছিল, সেই জায়গাটায় ছিলাম আমি। সেই জায়গাটার জন্য এখন সে তার স্বামীকে উপযুক্ত মনে করছে। আমার কি দুঃখ পাওয়া উচিত এখন? অথবা নিজের ভেতরটা ফাঁপা লাগা উচিত? ইংরেজিতে যাকে বলে নাম্বনেস!

একটা পথ ধরে হাঁটছিলাম আমি। হাঁটতে হাঁটতে পথটা একসময় শেষ হয়ে গেল। সামনে দেয়াল। এগোনোর রাস্তা নেই।

ঘোরের মধ্যে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। নিজ থেকে আমি আর মিথিলার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি; বা করতেও পারি। সঠিক বলতে পারব না। অটো পাইলট মুড অন থাকলে কী করি, সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই। সে সময় বাস্তবতা আর কল্পনার মধ্যে সীমানাটা এলোমেলো হয়ে যায়, দুটোর পার্থক্য করতে পারি না। পাশাপাশি দুটো দেশের সীমানার রাতের অন্ধকারে কখনো পরিবর্তন হয়ে যায়। এক দেশ দখল করে নেয় আরেক দেশকে।

নতুন বছরের শুরুতে মিথিলা ইনবক্স করেছিল একবার, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’।

উত্তরে লিখলাম, ‘থ্যাংকস।’

‘কেমন আছ?’

‘ঠিকঠাক।’

‘ঠিকঠাক মানে কী?’

‘মানে হলো, ভালো না খারাপ আছি, ঠিক বুঝতে পারছি না। যে স্কেলে ভালো–মন্দ বিচার করতে হয়, সেই স্কেলটা পেন্ডুলামের মতো দুলছে। কখনো ভালোর দিকে ঝুঁকে পড়ছে, কখনো খারাপের দিকে।’

এরপর আর কথা এগোতে পারেনি। মেসেজ সিন, নো রিপ্লাই। আমার এই কথার উত্তরে তার যদি কিছু বলতে হয়, তাহলে আমার ভালো বা মন্দের দায়িত্ব কিছুটা হলেও তার কাঁধে গিয়ে পড়ে। একজন বুদ্ধিমান মানুষ যেচে দায়িত্ব নেয় না।

বিজ্ঞাপন

পাঁচ.

পরশু দিন ফেসবুক চালাতে গিয়ে হঠাৎ একটা জিনিসে চোখ পড়ল। বইমেলা হবে কি না, এটা নিয়ে একটা লাইভ শো চলছিল তখন। মোট সাতজন ছোট ছোট উইন্ডোতে কথা বলছে। তার মধ্যে এক লেখিকা আছে, বয়স পঁচিশের আশপাশে হবে। চেহারাটা মায়া মায়া। বেশ দৃঢ়ভাবে কথা বলছে। যুক্তিগুলো খুব গোছানো, পরিষ্কার। তার একটা পোর্ট্রেট আঁকা যায় কি না ভাবছিলাম। আউটবক্সে নিজের পরিচয় দিয়ে পোর্ট্রেট এঁকে দেওয়ার প্রস্তাব দেব?

শীতকাল চলছে। বৃষ্টিবাদলা নেই। সর্দিজ্বরের আশঙ্কা কম। তখনই বিখ্যাত অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদির বলা একটা কথা মনে পড়ে গেল। সেটাও টক শোয়ে শোনা। ইন্টারভিউতে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কখন ঘুম থেকে ওঠেন?’

তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ভোরে।’

‘কী বলেন? আপনার বিরুদ্ধে তো অভিযোগ, দুপুরের পর ঘুম থেকে ওঠেন।’

তিনি নির্বিকারভাবে বলেছিলেন, ‘আমি যখন ঘুম থেকে উঠি, তখনই ভোর।’


চল্লিশের পর আসলে সব মৌসুমই বর্ষাকাল। ভিজতে ইচ্ছে করবে। ভিজলেই সর্দিজ্বর।

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন