default-image

রুবি দাদি আর জুবি দাদি। দুই বোন, আমার দুই দাদি। গ্রাম সম্পর্কের দাদি, ঠিক বুড়িয়ে যাওয়ার গন্ধে ভরা দাদি নয়। ওই যেমন দাদি হলে নরম সুতির শাড়ি—নরম কাঁথাকম্বল—নরম মাছের ঝোল এই সব দরকার হয়, তেমন দাদি নয়। যেসব দাদি নামেই দাদি, বয়সে খালাদের কিংবা আম্মারও ছোট এবং সতেজ। দাদি না বলে বুবু বললে ঠিক হতো, কিন্তু আমরা দাদিই তো ডাকতাম।

রুবি দাদি ছিল ডালিমের দানার লাল আলোটা দিয়ে তৈরি, তেমনি সুস্বাস্থ্যের দীপ্তি, তেমনি গালে পেকে যাওয়া ফলের মতো একটা টোল। দুই কাঁধ থেকে নেমে যাওয়া বিনুনির জোড়া প্রপাত, অঝোর। হবে না? রুবি-জুবিদের মা যত্ন করে কেশুতপাতা-একাঙ্গী-আমলকী-জবাকুঁড়ি–মেহেদি এই সব বেটে রোদে শুকিয়ে বড়ি করে মাথা ঘষার তেলে দিয়ে রাখত, সেই তেল চুলে মেখে মেখে, তারপর শর্ষের খোল আর রিঠার জলে শ্যাম্পু করে করে তবে তো ওই রকম চুল! অত সুন্দর বোনের সহোদরা জুবি দাদি, ওরও তো রূপ ছিল ভারি তাকিয়ে দেখবার মতো, কিন্তু বড় অযত্ন, চুলের গোছা এমন করে ছাঁটা যেন হাতে মুঠি করে ধরে দা চালিয়ে কেটে দিয়েছে কেউ। গায়ে যেসব রঙের শাড়ি চড়াত জুবি দাদি, সেসব শাড়ির তৃণভোজী গবাদিপশুর জিবের মতো রং, কাঁধের আঁচলও যেন কোনোক্রমে মুষ্টি করে জড়ো করে এনে ব্রোচ দিয়ে আটকে দেওয়া। ওরা দুজন ও রকমই, ছোট্টবেলা থেকেই আলাদা। ছোটবেলার ছবির অ্যালবামে রুবি দাদি হাসিমুখে তুলোর পুতুল বুকে করে উঁকি দিয়ে তাকিয়ে হাসছে তো না, গাছপাকা ফল যেন তাকিয়ে আছে পাতার ফাঁক দিয়ে। আর জুবি দাদি তাকিয়ে আছে ক্ষিপ্ত মুখে, ঠোঁট ওলটানো, চোখ দুটো পর্যবেক্ষণশীল, সন্দেহে ভরা। যেন জুবি দাদিকেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ‘তোমাকে বারণ করিতেছি...গোল করিও না।’

বিজ্ঞাপন

আমাদের শৈশবের চোখে রুবি দাদি ছিল ঠিক দাদি আর জুবি দাদি ছিল ভুল দাদি। কেন? রুবি দাদি গালভরা হাসি দেয় আর জুবি দাদি ‘তোদের হলুদমাখা গা, তোরা রথ দেখতে যা’ টাইপের বেজার চেহারা করে রাখে বলে? কে জানে! ধরুন, আপনি কারও মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলে কেউ যদি হাসিটা ফেরত দেয়, তবেই না আপনার ভালো লাগবে, মনে হবে, দুনিয়া ঠিকঠাক চলছে। কেউ যদি হাসির প্রতিদান হিসেবে ওভাবে খেপে গিয়ে তাকায়, তাহলে কি আর ঠিকঠাক লাগে, বলুন?

রুবি দাদির বিয়ে হয়ে গেল খুব অল্প বয়সে, ভারি কেলেকুলো এক পয়সাদার আদমির সাথে। বর দেখতে ভিড় করে এসে আমরা দেখলাম এ কী, লোকটা দেখতে এমন কেন! কচ্ছপের ছানার মুখের রেখায়ও যেমন একটা বুড়োটে ভাব স্থায়ী, তেমন চেহারা উফ্​। সামনের রাস্তা ঝাঁটা দিতে এসে বিহারের মেয়ে লছমী এসে কাঁকাল বাঁকিয়ে কী কী সব বলে গেল, ‘কালে কাউয়েকে চোঁচমে আঙ্গুর কা দানা’...আমরা উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এর মানে কী গো?’

লছমী জবাব দেবার আগেই জুবি দাদি বিরক্ত হয়ে জবাব দিল, ‘চিকায় নিল বাসনা সাপুন।’

আমার মনোভাব রুবি দাদি ফিরানিতে এলে পরে যা হয়েছিল, সেটা আমি সেকালে বুঝতে পারিনি। অনেক কাল পরে বুঝেছি। সে কথা যখন উঠল, বলেই ফেলি। এটা রুবি দাদিদের বিয়ে হবার অনেক বছর পরের কথা। একবার আমি রিমোট ঘুরিয়ে টেলিভিশন দেখছি, দেখি ডেভিড অ্যাটেনবরো ‘কুইন অব দ্য নাইট’ মানে একরাত-কি-রানি ফোটার গল্প দেখাচ্ছেন, যে ফুলকে আমরা ডাকি নাইটকুইন, মিশনারি স্কুলে পড়তাম যখন, তখন সিস্টার দীপশিখা কুইয়া আমাদের শিখিয়েছিলেন—যিশুর জন্মের রাতে সারা বেথলেহেম ভরে গিয়েছিল এই ফুলে। এ ফুল ফোটে বছরে একটিমাত্র রাত্রির জন্য। টেলিভিশনের পর্দায় পূর্ণিমার মধুযামিনীতে আকাশভরা জোছনার দিকে মুখ করে তার জ্যোতির্ময় হৃদয় মেলে দিচ্ছে ফুল, যেমন তার রূপ, তেমন যোজনগন্ধা সুবাস, তেমনি তার বুকভরা মধু। কোত্থেকে তাকে পরাগায়িত করতে ডানা ঝাপটে উড়ে এল বাদুড়, অসুন্দর, শিথিল তার ডানা, আকারে কুশ্রী। টিভি স্ক্রিনে সেই দৃশ্য দেখামাত্র আমার মনে পড়ে গেল রুবি দাদির ফিরানির সন্ধ্যা। বউভাতের অনুষ্ঠান শেষে বর–কনে ফিরে এসেছে মেয়ের বাড়ি। সবুজ রং করা অপরিসর ঘরে বড় পালঙ্কে তাদের বসিয়ে খুব ঠাট্টা-বটকেরা চলছে, ধাক্কা দিয়ে পান-শরবত খাওয়ানো চলছে। আমার কেন অত খারাপ লাগছিল কে জানে, আমি ঘরটা থেকে বের হয়ে বাইরের উঠানে এলাম, মাঠের দিকে সন্ধ্যা নামছে, অন্ধকারের রং সবুজ। গোবরের গন্ধে ভারী হয়ে আসা বাতাস। ঘরের ভেতর রুবি দাদিকে বোধ হয় কোলে করেছিল দাদা, সবাই হইহই করছে যখন। দাদিদের রাখাল অদূরে দাঁড়িয়ে একবার আমাকে বলে গেল, ‘তুমারেও সেমনে আলগামু!’ মাঠচরা গাভি যেন আমার খারাপ লাগাটা টের পেয়ে গম্ভীর গলায় হাম্বা রব করে উঠল, পুরো শব্দটা ‘ঢ়’ দিয়ে উচ্চারণ করল যেন। যেন ও জানে ডালিমগাছে কিংবা একরাত–কি–রানিগাছে ওভাবেই বাদুড় নামে আর প্রকৃতি সেটা সহ্য করে।

আমাদের মনের অবস্থা যা–ই হোক, রুবি দাদি অবশ্য বিয়েতে ক্ষুণ্ন হলো না, সে সংসারের শাখায় অতিপক্ব মেওয়ার মতো দোল খাচ্ছিলই, তাকে পেড়ে নিয়েছে লোকে, গতি হয়েছে তরুজীবনের, বিবর্তন এবং বংশগতির। তা বিয়ে যখন লাগে, মহামারি আকারেই লাগে। জুবি দাদির বিপুল অনীহা এবং আপত্তি সত্ত্বেও তাকে অবিলম্বে পাচার করে দেওয়া হলো শ্বশুরবাড়ি, ছেলে কিন্তু এবার কালোকুলো নয়, মাজা গায়ের রং...ওই যেমন হলে গ্রামে সুপুরুষ বিবেচিত হয়, কৃতবিদ্য যুবক, জোরালো স্বাস্থ্যের জৌলুশ গায়ে...সে যেদিক দিয়ে যায়, লোকে তাকিয়ে দ্যাখে তাকে। রুবি দাদির বরের মতো অত পয়সাঅলা পরিবারের না হলেও সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলে, মোসাফাহা করার সময় নিজের হাত আগে সরিয়ে নেওয়া নাকি তার আদব!

বিজ্ঞাপন

রুবি দাদি তো সংসারে দিব্যি ফিট করে গেল। ওই কেলেকুলো দাদাকেই খুব ভালোবাসল, আর দাদা তো তাকে চক্ষে হারাত। স্ত্রীকে লোকে কত যুগের অন্বিষ্টের মতো ভালোবাসতে পারে, সেই–ই আমার দেখা। দাদার প্রেম ছিল বারমাস্যা, সেই প্রেম রুবি দাদিকে কেন্দ্রে রেখে আমাদের সবার দিকে ছিটকে পড়ত, রুবি দাদির সমস্ত ছিটেফোঁটা আত্মীয়কে দাদা আপনজ্ঞানে ভালোবাসত, মিষ্টি কিনে দিত, মেলায় নিয়ে যেত, খলিফার কাছে নিয়ে গিয়ে পছন্দসই ফ্রক বানিয়ে আনত।

জুবি দাদিকে তার বর ভালোবাসত নিশ্চয়ই, জুবি দাদি বাসত না, এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত। রাগে-ক্ষোভে জ্বলতে জ্বলতে, একরকমের গা ঘিনঘিনে অনুভূতি নিয়ে সংসারে নিজেকে আহুতি দিয়েছিল জুবি দাদি, বছরের পর বছর বাচ্চাও জন্ম দিয়েছে—মাই দিয়েছে—মুতের কাঁথা সাফ করেছে, ভালোবাসার খোরাক হয়েছে—আধার হয়নি...অত সুপুরুষ দাদাকে সে দুই চক্ষে দেখতে পারত না। এই গভীর ঘৃণা জুবি দাদি লুকাতেও পারত না, ছোটরা তো কিছুতে বিস্মিত হয় না, বড়রা হতো, খুব অবাক হতো।

বছরে একবার শুধু জুবি দাদির শরীর জুড়াত। তার বন্ধু সুখলতা আসত বিদেশ থেকে। অবেলায় তার ঘরের জানালা দিয়ে আসা রোদে বসে দুজন রেডিও শুনত। সুখ দাদি জুবি দাদির চুল আঁচড়ে দিত এমন আদরে আর ধৈর্যে যেন জীবনের জট ছাড়াচ্ছে...পায়ে কাঁচা হলুদ আর নারকেল তেল দিয়ে দিত—মুখে হেজলিন স্নো, তার কৌটোয় নীলের পাতে পর্বতশিখর আঁকা...যেন জুবি দাদি সত্যি নবীন তুষারের লাবণী হিমানীর মতো করে মুখে মেখেছে এমন ফুটিফুটি করত তার চেহারা...দুজনে কাঁচা থাকতে নরম তামাকপাতা সেঁকে গুঁড়িয়ে—মৌরি-মিছরি-ধনে ভেজে—গুড়ের মতো চুয়া দিয়ে মেখে তারপর চুন, খয়ের আর এলাচি দিয়ে জাদুর মাদুরের মতো গুটিয়ে আনত পানপাতা এক আশ্চর্য খিলিতে, তারপর একে অন্যের মুখে দিয়ে চোখ মুদত। কত দুপুরে ওদের ঘরে গিয়ে দেখতাম, বেলা গড়িয়ে যাওয়া রোদ্দুরে বেলাউজ ছাড়া গায়ে সুতির শাড়ি মেলে সুখ দাদি আর জুবি দাদি শুয়ে আছে জড়াজড়ি করে, নীল শাড়ির জলকাচা আঁচলের আড়ালে নীল কাচের অ্যাসিরীয় ‘ইভল আই’য়ের মতো ড্যাবডেবিয়ে আছে তাদের স্তনবৃন্ত। আমরা কেউ দুরন্ত পায়ে দৌড়ে ওই ঘরে পৌঁছালেই সেই অনাবিল সুখের ছবিটা ভেঙে যেত। অনাবিল শব্দটা নিয়ে আমার পিউরিটান দীপশিখাদির সাথে তর্ক লেগে যেতে পারে, কিন্তু প্রেমে আবিলতা কই? বরং তাতে স্নোয়ের কৌটোর মতো করে লেখা ‘ডেইন্টি অ্যান্ড ডিসটিংক্ট’।

রুবি দাদি বা জুবি দাদির সাথে তো আমার আর সারা বছর দেখা হতো না, দেখা হতো বিয়েশাদিতে, দেখা হতো ঈদে-চান্দে। বাকি সময় আমার কাটত ক্যাথলিক স্কুলের দেয়াল দেখে। আমার খুব পরিচিত দেয়াল, সেখানকার ম্যুরাল, পুরানো সাদা–কালো ছবি, ঈশ্বরের কাছে মেষহৃদয়ের আকুল আবেদন, প্রভুর ডাক ভেতর থেকে আসে নাকি বাইরে থেকে, সেই পর্যালোচনা। দেয়ালে রঙিন কাগজে লেখা বাণী, ‘যে-বা আমায় ডাকবে, তার ডাকে আমি সাড়া দেব’। দেয়ালের খোপে টুকরো টুকরো জানালা, জানালার কাচ পরিষ্কার—প্রতিদিন বিজয়া গোমেজ ভেজা ত্যানা দিয়ে মুছে রাখে, আর তার বাইরের চত্বরে গ্রাউন্ড অর্কিডগাছের পঙ্​ক্তি। দেয়ালের দিকে আর জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি বড় হচ্ছিলাম।

কিছু সময় আসে যখন প্রতিটি বিষয় একেকটি ইমেজারির জন্ম দেয়, বাদুড়ের ডানা ঝাপটানিটা যেমন, কিংবা সুগন্ধি সাবান ঠোঁটে করে পলায়নপর চিকাটা যেমন। একটা সময় তেমন আমার শৈশবকে আমার নিজের কাছে একটা জানালাহীন কুঠরির মতো লাগত, ঝুলকালিময়। অতগুলো কাচের জানালাঘেরা স্কুলঘরেও আমার কেন ও রকম লাগত। আর ইশকুলের ওই সব দেয়ালে অন্তরের ডাক পাওয়া পাদরিদের ছবিগুলো লাগত বড়শি গেলা মাছের মতো। বড়শি দিয়ে যারা মাছ ধরত, সেই সব শৌখিন লোকের বিলাইতি ম্যাগাজিন থাকত ইশকুলের লাইব্রেরিতে, দুহাতে কোলপাঁজা করে তুলে নিয়েছে আয়না-রুই (মিরর কার্প), সেই মাছের বিবমিষারত মুখের ভঙ্গিটা দেখবার মতো। ম্যাগাজিন খুলে দেখতাম লেখা আছে—বড়শিতে ধরা মাছ নাকি আবার এরা ছেড়ে দেয় জলে...তা সেই মাছের ব্রহ্মতালুতে কদিন ব্যথা ব্যথা লাগে? যে বাঘ জখমি হয়, সে যেমন মানুষখেকো হয়ে যায়; তেমন করে এই জখমি জলকন্যারাও কি মানুষখেকো হয়ে যায়? কী করে তারা? পানির অতল থেকে অব্যর্থ নাবিকভুলানিয়া ডাক দিয়ে কাউকে টেনে নেয় গভীর পানিতে? নাকি শেওলার কিংখাবে মোড়া তার জলজ বিছানায় গিয়ে তিন সত্যি করে নিজের কাছে—আর যাবে না আর যাবে না আর যাবে না। আর গিলবে না সরস কোনো টোপ।

কে যে কী খায়, আর কে যে কী গিলে। রুবি দাদি একবার বোয়াল মাছ কাটবার সময় মাছের পেটে আস্ত ছুঁচো পেয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল বঁটি ছেড়ে। আর জুবি দাদি ঘর ছেড়ে এই সব বোয়াল মাছ কাটাকুটির সংসার ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, পোস্টমর্টেমের রিপোর্টে জানা গিয়েছিল ওর পেটে হজম না হওয়া অনেকখানি ভাত ছিল। আমাদের ভুল দাদি জুবি দাদি, আমরা ওকে ভুলে যেতে পেরেছিলাম। যেন শুধু রুবি দাদিকেই আমরা বরাবর চিনতাম। শুধু মাঠের দিকে মুখ করে জুবি দাদির আদরের গরুটা ‘ঢ়’ বলবার মতো গাঢ় করে মাঝে মাঝে ডাকত।

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন