কোলাজ
কোলাজমনিরুল ইসলাম
সম্প্রতি মার্কিন নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন কমলা হ্যারিস। রাজনীতির পাশাপাশি এই রাজনীতিবিদ লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পেঙ্গুইন বুকস থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘দ্য ট্রুথ অব হোল: অ্যান আমেরিকান জার্নি’। সেই বই থেকে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষকালের নির্বাচিত অংশ ৩ নভেম্বর ২০২০–এ প্রকাশিত হয়েছে ‘লিট হাব’–এ। সেই লেখাটির অনুবাদ করেছেন ফারহানা আনন্দময়ী।

আমি সেই মায়ের কন্যা, যাঁর দৈহিক উচ্চতা খুব বেশি হলে ৫ ফুট ১ ইঞ্চি। কিন্তু আমার মনে হতো, তিনি ৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা এক নারী। তিনি ছিলেন সপ্রতিভ, মেধাদীপ্ত ও ঋজু। একই সঙ্গে সংবেদনশীল, বিশ্বস্ত আর কৌতুকপ্রিয়। দুটো লক্ষ্যই কেবল তিনি সামনে রেখে এগিয়ে গেছেন সারা জীবনে তা হলো তাঁর কন্যা দুজনকে গড়ে তোলা এবং নিজের স্তন ক্যানসারকে পরাজিত করা। আমাকে আর মায়াকে মা সারাক্ষণ এই শক্তি আর আশা জুগিয়ে গেছেন যে আমরা পারব। নিজের কাজটা যদি ঠিকঠাক করতে পারি, তবে গন্তব্যে ঠিকই একদিন পৌঁছাব।

আমার মা সেই পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে রাজনৈতিক চেতনা আর সামাজিক নেতৃত্বের ধারণা আগে থেকেই ছিল। তাঁর মা, রাজাম গোপালা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু এলাকায় সাংগঠনিক কাজগুলো তিনি করতেন দক্ষতার সঙ্গে। স্বামীদের দ্বারা নির্যাতিত নারীদের পরম আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। আমার মায়ের বাবা পি ভি গোপালা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সহযোদ্ধা ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতার পরে আমার নানা জাম্বিয়ায় কূটনীতিক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করার সুবাদে দীর্ঘদিন তাঁরা বাস করেছেন জাম্বিয়ায়। আমার নানিকে তিনি ঠাট্টা করে বলতেন, ‘তোমার এসব জনসেবার কাজ হয়তো আমার কর্মজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে।’ কিন্তু এ রকমটি কখনোই ঘটেনি। বরং মানবতার কল্যাণের জন্য করা তাঁর এই কাজগুলো আমার মায়ের চেতনাকে সংহত করেছিল। এখান থেকে মা খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের একটা গভীর অর্থ। এবং আমার মায়ের কাছ থেকে সেই চেতনা সঞ্চারিত হয়েছে আমাদের দুই বোনের মধ্যে।

আমার মা তাঁর সাহস ও শক্তির পুরোটাই পেয়েছিলেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে। মা তাঁর মা–বাবা দুজনের কাছ থেকে আর যেটা পেয়েছিলেন তা হলো রাজনৈতিক চেতনা। সমাজের ইতিহাস, অসাম্য আর শ্রেণিবৈষম্যের সংগ্রাম বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন তিনি। আমার সব সময়ই মনে হয়, ন্যায়ের একটা স্পষ্ট ছবি, মা তাঁর বুকে এঁকে নিয়েই জন্মেছিলেন। আমার স্মরণে আছে, ছোটবেলায় আমাকে স্ট্রলারে বসিয়েই সামাজিক আন্দোলনগুলোতে শামিল হতেন মা-বাবা। সেই আন্দোলনের স্লোগান, মানুষের কোলাহল, সবই আমার একটু একটু মনে পড়ে। সামাজিক ন্যায়বিচারের আলাপ ছিল আমাদের ঘরের প্রাত্যহিক বিষয়। আমার ছোটবেলার একটা গল্পটা মা প্রায়ই বলতেন। আমি যখন শিশু, মা যখনই আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, কী চাও তুমি। আমি চেঁচিয়ে উত্তর দিতাম, ‘ফুইডম’—স্বাধীনতা!

মায়ের যাঁরা বন্ধু ছিলেন, তাঁরাও মায়ের মতো করেই ভাবতেন। সমাজ, অসাম্য, আন্দোলন, অধিকার—সবকিছুতেই তাঁরা ভাগ করে নিতেন তাঁদের সমভাবনা। ১৯৬০ সালের শুরুতে বার্কলির স্প্রোউল প্লাজায় কৃষ্ণাঙ্গ নারী-পুরুষের যে আন্দোলন হয়েছিল, মা, বাবা আর মায়ের বন্ধুরা তার অংশ ছিলেন। তাঁরা সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে, নাগরিক অধিকার আর ভোটের অধিকারের দাবিতে।

সেদিন সেই সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং। বার্কলির সেই আন্দোলনের সময়ে মা তাঁর সঙ্গে দেখা করে কথাও বলেছিলেন। মায়ের কাছে শোনা, আন্দোলন হটাতে পুলিশ যখন প্রতিবাদী মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু করল, তখন আমার স্ট্রলার নিয়ে তাঁরা দৌড়াদৌড়ি করে নিরাপদ স্থানে সরে এসেছিলেন।

আমার মা-বাবা শুধু পথের আন্দোলনের অংশীদার ছিলেন, তা নয়। তাঁরা ছিলেন মহান এক রাজনৈতিক চিন্তার ধারক এবং বাহক। তাঁদের রাজনৈতিক চেতনা, প্রতিবাদী বার্তা তাঁরা আশেপাশে সবার মধ্যে পৌঁছে দিতেন। মা, বাবা, মায়ের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, যাঁকে আমি আন্ট মেরি ডেকেছি, তিনি, তাঁর ভাই ফ্রেডি আঙ্কেল, এঁরা সবাই সংগঠন গোছানোর কাজে গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃষ্ণাঙ্গ লেখকদের রচনা পাঠক্রম থেকে ইচ্ছা করেই বাদ দেওয়া হতো। তাঁরা তখন আরও কজন শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে আন্ট মেরির বাড়িতে কৃষ্ণাঙ্গদের এক পাঠচক্রের আয়োজন করলেন। সেখানে তাঁরা রালফ এলিসন, কার্টার উডসন, ডু বয়েজ—এঁদের পাঠ করতেন, আলাপ-বিতর্কে এসব দর্শন-মতবাদ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন। এসব শুধু কেবলই পাঠ ছিল না, এ ছিল তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রামের অপরিহার্যতা। এসব আয়োজনে তাঁরা পাশে পেতেন লেরয় জনস, ফ্যানি ল্যু হ্যামারের মতো নাগরিক অধিকারসচেতন বুদ্ধিজীবী নেতাদেরও।

বিজ্ঞাপন
মা, আমার নানা-নানি এবং খুব কাছের কিছু স্বজন দক্ষিণ-এশীয় শিকড়টা আমাদের মননের গভীরে দারুণভাবে গেঁথে দিয়েছিলেন। আমাদের নামেই প্রতিফলিত হয় সেই সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের ছায়া। আমরা দুই বোন বেড়েই উঠেছিলাম শক্ত ভারতীয় সাংস্কৃতিক চেতনা গায়ে-মননে জড়িয়ে। আমার মায়ের গভীর বেদনা বা প্রবল আনন্দের অনুভূতিগুলো প্রায়ই তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হতো তাঁর মাতৃভাষায়। আমি বুঝতে পারতাম, তাঁর সেই অনুভবগুলো একেবারেই হৃদয়নিঃসৃত, এখানে কোনো মিথ্যা নেই। মা জানতেন, আমাদের দুই বোনকে তিনি বড় করে তুলছেন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে। এই কমিউনিটি আমাকে আর মায়াকে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে বলেই মনে করত। এতে অবশ্য আমাদের কোনো সমস্যা ছিল না। কারণ, মা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন এই বিশ্বাসটা নিশ্চিত করতে, আমরা যেন একজন গর্বিত কৃষ্ণাঙ্গ হয়েই নিজেদের মেলে ধরতে পারি।

বার্কলির পর্ব শেষে তাঁরা চলে আসেন সান ফ্রান্সিসকোতে। এখানেই মায়ের জীবনের নতুন এক পর্ব শুরু হয়। এ দেশে তাঁর নিজের পরিবার বলতে আত্মীয়স্বজন কেউ ছিল না। আন্ট মেরি, আন্ট লেনোর, আঙ্কেল অব্রে এঁরাই ছিলেন মায়ের পরিবার। ভারত থেকে শিকড় উপড়ে ফেলে এখানেই, এই কৃষ্ণাঙ্গ কমিউনিটিতেই তিনি নিজেকে জুড়ে নিলেন। মায়ের শিক্ষক, হাওয়ার্ড, যিনি ছিলেন একজন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট, তাঁরও কিছু স্মৃতি জমা আছে আমার হৃদয়ে। একবার জাপান ঘুরে আসার সময়ে দারুণ সুন্দর একটা মুক্তার মালা এনেছিলেন, আমার জন্য। অলংকার হিসেবে মুক্তোদানা সব সময়ই খুব প্রিয় আমার; সেই ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত।

মায়ের ভাই বালু এবং তাঁর দুই বোন, সরলা আর চিন্নি, ওদের সঙ্গে একটা যোগাযোগ ছিলই, ফোনে। যদিও ওরা হাজার মাইল দূরত্বে বাস করত, কত দূরের ভারতে, তবু বন্ধনটা ছেঁড়েনি। ফোনে কথা বলা হোক, পোস্টকার্ডে লেখা বিনিময় কিংবা অনেক অনেক দিন পরপর ভারতে বেড়াতে আসার মধ্য দিয়ে আমরা পারিবারিক বন্ধনটা লালন করেছিলাম। সেই তখন থেকে আমি উপলব্ধি করেছিলাম, খুব নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও, স্থানিক দূরত্ব থাকলেও, আত্মার টানে একজন আরেকজনের কাছাকাছি থাকাই যায়। কোনো শর্ত আর স্বার্থ ছাড়াই থাকা যায়।

মা, আমার নানা-নানি এবং খুব কাছের কিছু স্বজন দক্ষিণ-এশীয় শিকড়টা আমাদের মননের গভীরে দারুণভাবে গেঁথে দিয়েছিলেন। আমাদের নামেই প্রতিফলিত হয় সেই সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের ছায়া। আমরা দুই বোন বেড়েই উঠেছিলাম শক্ত ভারতীয় সাংস্কৃতিক চেতনা গায়ে-মননে জড়িয়ে। আমার মায়ের গভীর বেদনা বা প্রবল আনন্দের অনুভূতিগুলো প্রায়ই তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হতো তাঁর মাতৃভাষায়। আমি বুঝতে পারতাম, তাঁর সেই অনুভবগুলো একেবারেই হৃদয়নিঃসৃত, এখানে কোনো মিথ্যা নেই। মা জানতেন, আমাদের দুই বোনকে তিনি বড় করে তুলছেন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে। এই কমিউনিটি আমাকে আর মায়াকে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে বলেই মনে করত। এতে অবশ্য আমাদের কোনো সমস্যা ছিল না। কারণ, মা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন এই বিশ্বাসটা নিশ্চিত করতে, আমরা যেন একজন গর্বিত কৃষ্ণাঙ্গ হয়েই নিজেদের মেলে ধরতে পারি।

মা-বাবার বিচ্ছেদের বছরখানেক পরে আমরা চলে গেলাম ব্যানক্রফট ওয়ের একটা ভবনের একদম ওপরের তলায়। ওখানে প্রতিবেশী হিসেবে সবাই চিনত সবাইকে। সেই এলাকার মানুষেরা সৎ এবং সাধারণ একটা জীবনযাপন করত। অধিকাংশ আমেরিকান এই স্বপ্নই লালন করে, তারা যদি পরিশ্রম করে এবং বিশ্বের অন্যদের জন্য ক্ষতিকর কিছু না করে, তাহলে তাদের সন্তানেরা এর চেয়েও উন্নত জীবন পাবে। আমরা হয়তো আর্থিকভাবে খুব ধনী ছিলাম না। কিন্তু আমাদের জীবনযাপনে নৈতিক আর সামাজিক মূল্যবোধ খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর সেগুলোই ছিল আমাদের ঐশ্বর্য।

প্রতিদিন সকালে মা ল্যাবে গবেষণার কাজে যাওয়ার আগে আমার আর মায়ার জন্য নাশতা তৈরি করে যেতেন। আমরা নিজেদের পছন্দমতো স্ট্রবেরি বা চকলেট মিশিয়ে নিতাম কার্নেশনে। মা বলতেন, সকালের এই ব্যস্ত সময়টা নাশতা নিয়ে আবদার করার সময় নয়! এরপর আমি হেঁটে গিয়ে স্কুলবাসে চড়তাম। থাউজেন্ড ওকস এলিমেন্টারি স্কুলে যাওয়ার পথে এটা বুঝে নিয়েছিলাম, কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা আর বার্কলি হিলের শ্বেতাঙ্গ ধনী পরিবারের শিশুরা একই স্কুলবাসে চড়তে পারে না। তাদের জন্য আলাদা স্কুলবাস।

তবে এর পাশাপাশি অন্য চিত্রও আছে। আমি যখন স্কুলে ফার্স্ট গ্রেডার, সেই সময়ের একটা ছবি বাঁধানো আছে ঘরে। এখনো সেই ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, বিচিত্র এবং বহুমুখী একটা সমাজের অংশ হিসেবেই আমার স্কুলজীবন কেটেছে। স্কুলে যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন হতো, তখন দেখতাম, সমাজের সব শ্রেণির অভিভাবকেরা, শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে, একই স্থানে মিলিত হচ্ছে। এই স্কুলজীবন শেষে অনেক বছর পরে কী দারুণ একটা প্রাপ্তিযোগ হয়েছিল আমার জীবনে! ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে হেস্টিংস কলেজে আমার যখন গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠান চলছিল, দেখেছিলাম দর্শকের আসনে বসে আমার ফার্স্ট গ্রেড টিচার মিসেস উইলসন আমাকে অভিনন্দিত করছেন! আমি ভুলি না সেই দৃশ্য!

স্কুল ছুটির পরে আমি আর মায়া চলে যেতাম মিসেস শেলটনের ডে-কেয়ার সেন্টারে। সেটাকেই আমরা বলতাম ‘আমাদের বাড়ি’। অনেক মজার স্মৃতি আছে ওখানে। একবার মায়ের রান্নার ডায়েরি দেখে লেমন বার বানিয়েছিলাম সারা বিকেল ধরে। সব শেষ করে গুছিয়ে সাজিয়ে মিসেস শেলটনের বাড়ির বারান্দায় নিয়ে গেলাম আমি। মা আর তাঁর বন্ধুরা বসে গল্প করছিলেন ওখানে। মিসেস শেলটন দারুণ উৎসাহী হয়ে সেই লেমন-বারে বড় একটা কামড় দিলেন। কয়েক মুহূর্ত পরে বললেন, ‘উম্‌ম্‌, দারুণ হয়েছে খেতে। শুধু লবণটা একটু বোধ হয় বেশি পড়েছে!’ ব্যস, এর বাইরে আর কিছুই বললেন না। আমি নিজে যদি না খেতাম, জানতামই না, চিনির বদলে আমি পুরোটাই লবণ দিয়েছিলাম ঢেলে! কিন্তু কী হলো! ওই যে মিসেস শেলটন বললেন, দারুণ হয়েছে, সেটার পরে একবারও আমার মনে হলো না যে বিরাট কিছু ভুল করে ফেলেছি আমি! মনে হলো কাজটা দুর্দান্ত করেছি, সামান্য একটু ভুলসহ। এটাই আমার আত্মবিশ্বাসের গোড়াপত্তন করল। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, চেষ্টা করলেই আমি যে কোনো কাজই করতে পারব।

default-image

মা রান্না করতেন যখন, তখন যেন তিনি একজন বিজ্ঞানী! রান্না নিয়ে চলত তাঁর বিস্তর গবেষণা। এটার সঙ্গে সেটা, সেটার ওটা...সারাক্ষণই নতুন কিছু সৃষ্টির নেশা মায়ের মধ্যে। আমার স্কুলের টিফিনবক্সটাও তাঁর গবেষণার ল্যাব! স্কুলবাসে বসে অন্য বন্ধুরা ওদের টিফিন খুলে দেখাত। এরপর আসত আমার পালা। ‘ক্রিম চিজ উইথ অলিভ অন ডার্ক রাই’! সব সময়ই যে তাঁর সেই রান্নার গবেষণা সফল হতো, তা নয়। তবে যেটাই হতো, তা হলো ব্যতিক্রম এবং বিশেষ; আমার মায়ের মতোই। বেশির ভাগ সময় মা যখন রান্নাঘরে রাঁধতেন, রেকর্ড-প্লেয়ারে বাজাতেন অ্যারিথা ফ্রাংক্লিন। আর আমি লিভিংরুমে সেটা শুনে শুনে গাইতাম, নাচতাম। ওটা যেন আমার মঞ্চ। প্রায় সময়ই একটা গানই বাজত, ‘টু বি ইয়ং, গিফটেড অ্যন্ড ব্লাক…’ নিনা সিমোন যেটা কৃষ্ণাঙ্গদের জাতীয় সংগীত হিসেবে পরিবেশন করতেন।

মাকে আমরা সব সময়ই পেয়েছি, আমাদের হাতটা ধরে আছেন, আমার আনন্দে কিংবা মন খারাপের দিনে। এমন হতো, আকাশের মুখ গোমড়া, আমার কিংবা মায়ার মন ভারী হয়ে আছে কোনো কারণে, মা একটা ‘আনবার্থডে পার্টি’ আয়োজন করে ফেলতেন। ‘আনবার্থডে কেক’ আর আনবার্থডে গিফটস’ দিয়ে সাজিয়ে আমাদের চমকে দিতেন। আমাদের মন হেসে উঠত তাতে। কখনো আমাদের দুই বোনের প্রিয় চকলেট চিপস প্যানকেক বা আমার জন্য স্পেশাল ‘কে’ সিরিয়াল কুকিজ বানিয়ে দিতেন। ‘কে’ মানে কমলা!

রোববার সকালে মিসেস শেলটনের স্টেশন ওয়াগনের পেছনে বসিয়ে মা আমাদের চার্চে পাঠাতেন। সেই গাড়িতে থাকত অন্য শিশুরাও। ছোটবেলাকার চার্চের স্মৃতির মধ্যে যেটা আমার মনে দাগ কেটেছিল, তা হলো বাইবেলে ঈশ্বর বলছেন ‘তুমি তাদের হয়ে কথা বলো, যারা নিজেদের কথা বলতে পারে না।’ আরও একটি কথা মনে ধরেছিল, ‘দরিদ্র এবং দুর্বলের অধিকার সংরক্ষণ করো।’ তো তখন থেকেই ‘বিশ্বাস’ শব্দটা আমার কাছে একটি ক্রিয়াপদ। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সেই বিশ্বাসকে ধারণ করতে হয় এবং কর্মের ভেতর দিয়ে তাকে চর্চা করতে হয়।

বিজ্ঞাপন

সপ্তাহের বৃহস্পতিবারের রাতটা ছিল আমার খুব প্রিয়। প্রায় প্রতি বৃহস্পতিবারের রাতে আমাদের সবাই দেখতে পেত গ্রোভ স্ট্রিট আর ডার্বির কোনায় একটি সাদামাটা বাড়িতে। একসময় সেটা শবাগার ছিল। পরে সেখানে ‘রেইনবো সাইন’ নামে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র খোলা হলো। কৃষ্ণাঙ্গরাই সেটা পরিচালিত করত। রেইনবো সাইন ছিল একাধারে একটি আর্ট গ্যালারি, থিয়েটার মঞ্চ, নাচের স্টুডিও এ রকম অনেক কিছু। বড় একটি রেস্তোরাঁর মতোও ছিল সঙ্গে। সেখানে সব সময়ই রান্না করা হতো স্বাদু সব খাবার। দিনের বেলায় রেইনবো সাইনে ওয়ার্কশপ, নাচের ক্লাস, বিদেশি ভাষাশিক্ষার ক্লাস এসব হতো। আর সন্ধ্যার পরে বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ কোনো চিন্তক বা বুদ্ধিজীবীদের লেখার স্ক্রিনিং বা বক্তব্য পরিবেশিত হতো। এ ছাড়া অন্য কৃষ্ণাঙ্গ খ্যাতনামা ব্যক্তিদের পরিবেশনাও চলত, এঁদের সবাই কেউ না কেই সংগীতকার, চিত্রশিল্পী, লেখক, নাটকার, অভিনেতা বা নৃত্যশিল্পী। মা, মায়া আর আমাকে প্রায়ই সেখানে দেখতে পেত প্রতিবেশীরা। আমাদের ওরা ডাকত, ‘শ্যামলা অ্যান্ড দ্য গার্লস’। তিনজন মিলে আমরা যেন একটা একক ছিলাম। একটা দল। ওখানে গেলে সবাইকে আমরা প্রাণখোলা হাসি আর উষ্ণ আলিঙ্গনে স্বাগত জানাতাম। রেইনবো সাইন একটা ইতিবাচক তরঙ্গ বইয়ে দিত আমাদের মধ্যে।

এই বে এলাকাটা ছিল অনেক সাধারণ আর অসাধারণ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অনুপম এক মিলনমেলা। কৃষ্ণাঙ্গ নেতারা এবং অন্য যাঁরা আসতেন, তাঁরা সবাই কালো হওয়াটাকে গর্বের বিষয় মনে করতেন। আর এখানে আমার মতো শিশু-কিশোরেরা যারা আসত, তারাও এদের ঋদ্ধ সান্নিধ্যে এসে বুঝে নিত, ভবিষ্যতে আমাদেরও কীভাবে পথ কেটে এগোতে হবে। ১৯৭১ সালে কংগ্রেসওম্যান শার্লি চিজম এসেছিলেন এই রেইনবো সাইনে। নিজেকে তখন তিনি প্রেসিডেন্ট দৌড়ে যুক্ত হওয়ার জন্য তৈরি করছেন। তাঁর শক্তিময় স্লোগান ছিল, ‘আনবট অ্যান্ড আনসসড’। পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী অ্যালিস ওয়াকার একবার এখানে এসে তাঁর ‘দ্য কালার পার্পল’ পাঠ করেছিলেন। বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ লেখিকা মায়া অ্যানজেলো তাঁর জীবনী ‘আই নো হোয়াই দ্য কেইজেড বার্ড সিংগ্‌স’ পাঠ করেছিলেন এই রেইনবো সাইনে বসে। মনে পড়ে, আমার যখন সাত বছর বয়স, তখন নিনা সিমোনও এখানে এসে গান গেয়ে অনুষ্ঠান করেছিলেন।

এখানে গেলে আমার সেই ধারণা পোক্ত হতো আরও বেশি, মায়ের কাছ থেকে যে যৌক্তিক মতবাদগুলো আমি জেনেছিলাম। সাহস করে কল্পনা করে নিতে পারতাম, ভবিষ্যৎ আমার জন্য কী নির্ধারণ করে রেখেছে। আমার মা আমাদের সেই বিশ্বাসটি দিয়ে বড় করেছিলেন যে, ‘এটা করা খুব কঠিন’ এই অজুহাত সবচেয়ে দুর্বল অজুহাত। তিনি বলতেন, প্রকৃত ভালো মানুষেরা মানুষের দুর্দশায় পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করে না। তোমার সফলতা নির্ধারণ করা হবে, তুমি আরেকজন মানুষকে সফল হতে কতটা প্রাণিত করেছ তার মাধ্যমে। মা আমাকে আরও বলতেন, অচলায়তন ভাঙতে চাইলে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। রেইনবো সাইনে গিয়ে আমি মায়ের কাছে জানা এই মূল্যবোধগুলোরই প্রতিফলন দেখতে পেতাম। এই মূল্যবোধগুলো চেতনায় নিয়ে বড় হয়ে ওঠাটা আলোকিত জীবনের দিকেই এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। আমার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেকেই এভাবে বেড়ে উঠেছে বলে আমার মনে হয়েছে।
অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0