>ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত কবি ও ঔপন্যাসিক মায়া আবু আল-হায়াতের জন্ম লেবাননের বৈরুতে। কর্মসূত্রে এখন বাস করছেন রামাল্লায়। তিনি প্যালেস্টাইন রাইটিং ওয়ার্শপের একজন পরিচালক। মায়া আবু আল-হায়াতকে বলা হয় বর্তমান সময়ের আরব বিশ্বের কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখা উপন্যাস ‘নো ওয়ান নোজ হিজ ব্লাড টাইপ’ ২০১৩ সালে প্রকাশের পরপরই আরব বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি তিনি সাহিত্যের শক্তি, নিজের লেখক হয়ে ওঠা ও ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘আরব নিউজ’-এর সঙ্গে। লেখাটি অনুবাদ করেছেন মারুফ ইসলাম

সাধারণভাবে আমরা যদি বলি তবে ‘লেখা ও পড়া’ হচ্ছে ফিলিস্তিনবাসীর মতপ্রকাশের সবচেয়ে ভালো উপায়। কারণ তারা অনেক চাপের মধ্যে রয়েছে। অন্যরা ফিলিস্তিনবাসীকে কী বলতে চায় বা ফিলিস্তিনবাসী কীভাবে কথা বলতে চায়—এ সবকিছু সব সময় প্রত্যাশা অনুযায়ী ঘটে না। আপনারা জানেন, ফিলিস্তিনবাসীরা নানা বিষয় নিয়ে ভয়ংকর চাপের মধ্যে রয়েছে।

থাকুক সেসব চাপ। আমি আমার লেখালেখির কথা বলি। যত দূর মনে করতে পারছি, আমার লেখালেখির শুরুটা হয়েছিল ছোটবেলাতেই। আমার বেশ স্পষ্ট মনে আছে, স্কুলের কোনো এক অনুষ্ঠানে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলাম। কবিতাটি ছিল আমার নিজেরই লেখা। তখন আমার বয়স মাত্র তিন। তার পর থেকে স্কুলে সবাই আমাকে কবি বলে ডাকত। আমার কবিতা শুনে সবাই অনেক প্রশংসা করেছিল। তখনই বুঝেছিলাম কবিতার গুরুত্ব। ভাবছেন, অত ছোট বয়সে কীভাবে বুঝলাম? খুব ছোটবেলা থেকেই আমার বোধশক্তি পরিণত হয়েছে। কারণ, বাল্যকাল থেকেই আমি বেড়ে উঠেছি মা-বাবার আদরযত্ন ছাড়াই। শৈশবেই আমার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আমি বড় হয়েছি আমার এক ফুফুর কাছে। ১০ বছর বয়স পর্যন্ত আমি আমার বাবাকে দেখিনি। আর মাকে দেখেনি অন্তত ২০ বছর বয়স পর্যন্ত। এই রূঢ় বাস্তবতাই আমাকে খুব অল্প বয়সেই বুড়ো বানিয়ে দেয়।

বুঝতেই পারছেন, বলার মতো অনেক গল্প আছে আমার। আমি সব সময় ভালোবাসার কাঙাল ছিলাম। সর্বদা চেয়েছি কেউ আমাকে ভালোবাসুক। এখন অসংখ্য মানুষ আমাকে ভালোবাসেন। এটা সম্ভব হয়েছে আমি লিখি বলে। আমার কবিতা, গল্প, উপন্যাস তাঁরা পছন্দ করেন। তাই তাঁরা আমাকে ভালোবাসেন।

এই মুহূর্তে একটি পরিবারের কথা মনে পড়ছে আমার। সেই পরিবারের কেউই পড়তে আগ্রহী ছিল না। কিন্তু আমার ছিল পড়ার প্রতি বেজায় আগ্রহ। বিশেষ করে কবিতা। স্কুলে পড়ার সময়ই আমি প্রচুর কবিতা পড়ে শেষ করে ফেলি। গল্পও পড়ি। এসবের মধ্য দিয়ে আমি এক কল্পনার জগতে বিচরণ করতে শিখেছিলাম। আমার কল্পনাশক্তি ও মনে রাখার ক্ষমতা এত প্রখর হয়েছিল যে, স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফল করতে শুরু করি। তখন সবাই আমার দিকে মনোযোগ দেয়। শিক্ষকেরা ভালোবাসতে শুরু করেন।

আমি আমার পেশাগত জীবন শুরু করেছিলাম সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। একজন পুরকৌশলী হিসেবে আমি বেশ কয়েক বছর কাজ করেছি। তখন আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি যে আমি আমার সত্যিকারের জগতে আছি। আমি অনেকগুলো প্রকল্প সম্পন্ন করেছি বটে, তবে কখনোই ওই কাজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাইনি। ভালোবেসে কাজগুলো করা হয়নি। সব সময় মনে হয়েছে এটা আমার কাজ নয়। সবশেষে আমার ভালোবাসাকে খুঁজে পেয়েছি শিশুদের জন্য গল্প লেখার মধ্যে, শিশুদের জন্য কাজ করার মধ্যে। তখন ফিলিস্তিনজুড়ে এমন কেউ ছিল না, যিনি সার্বক্ষণিক সৃজনশীল লেখালেখির মধ্যে থাকেন। অর্থাৎ পেশাগতভাবে গল্প-কবিতা লেখেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0