default-image
>দেশে–বিদেশে ক্রিকেট নিয়ে লেখা হয়েছে অজস্র সাহিত্য। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জমজমাট প্রহরে সেই সব সাহিত্যের দিকে ফিরে দেখা।

একসময় বলা হতো ‘রাজার খেলা’, সেখান থেকে ক্রিকেটকে ‘খেলার রাজা’র আসনেও অধিষ্ঠিত করে ফেলেছেন অনেকে। তবে যত বিশেষণেই ভূষিত করা হোক না কেন, ক্রিকেটকে কোনোমতেই বৈশ্বিক খেলা বলা যাবে না। হাতে গোনা কয়েকটি দেশই খেলে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তবে একটা জায়গায় ফুটবল-টেনিস-অ্যাথলেটিকসের মতো বৈশ্বিক খেলাকেও ম্লান করে দিয়ে ক্রিকেট উঠে গেছে অন্য উচ্চতায়। আর কোনো খেলা নিয়ে লেখালেখি এমন সাহিত্যপদবাচ্য বলে বিবেচিত হয়নি। যে খেলাটি এ ব্যাপারে ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, তাতে এমনিতে সাহিত্যের উপাদান খুঁজে পাওয়া কঠিন। অথচ মজার ব্যাপার হলো, ক্রিকেটের পর বক্সিং নিয়েই সাহিত্য রচিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি!

বক্সিং নিয়ে সাহিত্য একটু বিস্ময়ের জন্ম দিতে পারে, তবে ক্রিকেট নিয়ে সাহিত্য রচিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রথম কারণ অবশ্যই খেলাটির দৈর্ঘ্য। ফুটবলের মতো অন্য অনেক খেলা যেখানে ঠাসা উত্তেজনা উপহার দিয়ে চোখের পলকেই শেষ, ক্রিকেট সেখানে রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করার জিনিস। প্রতিটি বল, প্রতিটি ওভারের পর বিরতি ক্রিকেটকে অন্য সব খেলার চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। সুযোগ করে দিয়েছে এই খেলার কুশীলবদের চরিত্র স্ফুটনেরও। আর মানবচরিত্রই তো সাহিত্যের মূল অবলম্বন। ক্রিকেট নিয়েও তাই এমন সব লেখা হয়েছে, যা নিছক খেলা নিয়ে লেখার সীমানা ছাড়িয়ে উঠে গেছে বিশ্বজনীন সাহিত্যের দরবারে।

ক্রিকেটের আদিকাল থেকেই এমন হয়ে এসেছে বললে ভুল হবে। সবকিছুরই একটা শুরু থাকে এবং সেই শুরুটা অমিত প্রতিভাবান কারও হাতেই হয়। ক্রিকেট সাহিত্যের শুরু যেমন নেভিল কার্ডাসের হাতে। সংগীত আর ক্রিকেট এই দুই-ই ছিল এই ইংরেজ ভদ্রলোকের ধ্যানজ্ঞান। প্রচলিত সামাজিক রীতি অনুযায়ী তিনি ছিলেন মায়ের ‘অবৈধ সন্তান’। নিজের জনকের পরিচয় কখনো জানা হয়নি তাঁর, কিন্তু নিজে অমর হয়ে আছেন ‘ক্রিকেট সাহিত্যের জনক’ হিসেবে। নেভিল কার্ডাস সম্পর্কে চমৎকার বলেছেন ক্রিকেটের অমর ধারাভাষ্যকার জন আর্লট, ‘কার্ডাসের আগে ক্রিকেট শুধু রিপোর্ট করা হতো...তিনিই প্রথম এটিকে অনুভব করে, ভালোবেসে, কল্পনাশক্তিযোগে তা বর্ণনা করেছেন।’

ওইকল্পনাশক্তি কথাটাই নেভিল কার্ডাসের লেখার মূল সুর। তাঁর লেখা শুধুই খেলার বর্ণনা নয়, ক্রিকেটের সঙ্গে তাতে সংগীত-কবিতা মিলেমিশে একাকার। এটি যদি তাঁর শক্তির জায়গা হয়, আধুনিক ক্রিকেট সাংবাদিকতার আয়নায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও সেটিই। নিজের লেখার প্রয়োজনে কার্ডাস প্রায়ই এমন কল্পনার রথে উড়ে বেড়াতেন যে এমন সব ঘটনাও লিখেছেন, মাঠে যা আদৌ ঘটেনি! খেলোয়াড়দের মুখে অবলীলায় বসিয়ে দিতেন সংলাপ। প্রিয় ক্রিকেটারদের জীবনের চেয়ে বৃহদাকার দেখাতেই সেটি করতেন বলে খেলোয়াড়েরাও তা পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন।একবার কে যেন কার্ডাসকে বলেছিলেন, ‘আপনি যে লিখেছেন, বোলিং মার্কে ফিরে যাওয়ার সময় অমুক বোলার এটা বলেছেন, আসলে তো তা বলেননি।’ কার্ডাস নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দেন, ‘বলেনি, তাতে কী! বলা উচিত ছিল।’

default-image

আধুনিক ক্রিকেট সাংবাদিকতায় কার্ডাসকে তাই সেভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মানতে রাজি নন অনেকেই, কিন্তু তাঁর লেখার জাদুতে আবিষ্ট হয়নি কে! ঝরনাধারার মতো বয়ে চলা কাব্যিক গদ্য তাৎক্ষণিক পাঠানন্দ দিয়েই শেষ হয় না, এরপরও আবেশ ছড়িয়ে রাখে মনে। নেভিল কার্ডাসের আত্মজীবনী অটোবায়োগ্রাফি বইটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সাম্প্রতিক কালের সেরা ক্রিকেট–লেখকদের অন্যতম শিল্ড বেরি তাই লিখেছেন, ‘কার্ডাস অবশ্যই ইতিহাসের সেরা ক্রিকেট-লেখক নন, কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে তিনিই সেরা লেখক।’ নেভিল কার্ডাসের বই এখন রীতিমতো দুষ্প্রাপ্য, পুরোনো বইয়ের দোকানই একমাত্র ভরসা। আগ্রহী পাঠকদের জন্য উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বইয়ের নাম দিয়ে দিই—গড ডেইজ, ক্রিকেট অল দ্য ইয়ার, ডেইজ ইন দ্য সান, সেকেন্ড ইনিংস, ক্লোজ ব প্লে, অস্ট্রেলিয়ান সামার

নির্জলা তথ্যকে পাত্তা না দিয়ে কল্পনায় গা ভাসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নেভিল কার্ডাসের পুরো বিপরীত বলে মানতে হবে রে রবিনসনকে। অস্ট্রেলিয়ার সেরা ক্রিকেট লেখক হিসেবে মোটামুটি সর্বজনস্বীকৃত রবিনসন ছিলেন খুঁটিনাটি সব বিষয়ে অসম্ভব রকম খুঁতখুঁতে। রবিনসনের কলমে চিত্রিত ক্রিকেটাররা যেন রক্ত–মাংসের মানুষ হয়ে হাজির হয় পাঠকের চোখের সামনে। রে রবিনসনের ‘ম্যাগনাস ওপাস’ বলে মানা হয় যে বইটিকে, সেই অন টপ ডাউন আন্ডার–এর আদর্শ উদাহরণ। বইয়ের বিষয় এমন অভিনব কিছু নয়, অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট অধিনায়কদের পরিচিতি। কিন্তু সেটিই অন্য মাত্রা পেয়ে গেছে রবিনসনের কল্যাণে। বছরের পর বছর পরিশ্রম করে তাঁদের সম্পর্কে এমন সব খুঁটিনাটি তথ্য জোগাড় করেছেন যে চেনা ক্রিকেটাররাও নতুন রূপে চোখের সামনে নেচে বেড়ায়। অন টপ ডাউন আন্ডার অবশ্যই রবিনসনের সবচেয়ে বিখ্যাত বই, তবে তাঁর সেরা বই সম্ভবত বিটুইন উইকেটস। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত এই বই, অথচ এখনো কী আশ্চর্য রকম আধুনিক!

রবিনসনের বড় একটা সুবিধা ছিল। তাঁর সময়ে খেলাটা ছিল অন্য রকম, সাংবাদিকতাও। সাংবাদিকদের তখন শুধু খেলা নিয়ে লিখলেই চলত, বিতর্ক খুঁজে বেড়াতে হতো না, মাঠের বাইরের কেচ্ছাকাহিনিও নয়। অনেক দিনই ড্রেসিংরুম যেখানে সাংবাদিকদের জন্য ‘নো গো জোন’, সেখানে অস্ট্রেলিয়ান ড্রেসিংরুমের দ্বার ছিল রবিনসনের জন্য অবারিত। রবিনসন বিশ্বাসের অমর্যাদা করবেন না জেনে খেলোয়াড়েরা তাঁর সামনেই একটু আগে শেষ হওয়া খেলা, নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন সবকিছুই মেলে ধরতেন। রবিনসনেরও তাই সুযোগ মিলেছে ক্রিকেটারের আড়ালে রক্ত–মাংসের আসল মানুষটিকেও জানার। সেটিই তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর কলমে। রবিনসনের উল্লেখযোগ্য আরও তিনটি বই—ফ্রম দ্য বাউন্ডারি, গ্রিন স্প্রিগসদ্য ওয়াইল্ডেস্ট টেস্টস। শেষটির বিষয় দাঙ্গাহাঙ্গামা আক্রান্ত সব টেস্ট ম্যাচ।

default-image

ক্রিকেট লেখায় কাব্যরসের বিবেচনায় নেভিল কার্ডাসের পরই হয়তো আসবে অ্যালান রসের নাম। রসের লেখায় কাব্যরস থাকাটাই স্বাভাবিক, কারণ তিনি ছিলেন নির্ভেজাল কবি। ক্রিকেটবিষয়ক বইয়ের আগেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ। অস্ট্রেলিয়া ফিফটি ফাইভ অস্ট্রেলিয়া সিক্সটি থ্রি নামে অ্যালান রসের বই দুটি ক্রিকেট সফর নিয়ে লেখা কতটা স্বাদু হতে পারে, তার আদর্শ উদাহরণ। অনেকেই বলেন, অ্যালান রস অবসর নেওয়ার পরই আসলে ক্রিকেট সাহিত্যের মৃত্যু হয়েছে। রসের মহিমা বোঝাতেই বলা হয় এমন। তবে ক্রিকেট সাহিত্য কি আর মরে যাওয়ার জিনিস! যুগে যুগে সেটি রূপ বদলেছে, এই যা।

নাম ধরে বিস্তারিত আলোচনার পরিসর এই লেখায় নেই। আগ্রহী পাঠকদের জন্য তাই আধুনিক কালের কিছু লেখকের নাম অন্তত উল্লেখ করি, যাঁদের হাতে ক্রিকেট-লেখা সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে। সবার আগে বলতে হবে পিটার রোবাকের নাম। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে ২৫ হাজারের বেশি রান করেছেন; সমারসেটে ভিভ রিচার্ডস, ইয়ান বোথাম, জোয়েল গার্নাররা খেলেছেন তাঁর অধিনায়কত্বে, ক্রিকেট ইতিহাস তাঁকে এসবের জন্য যতটা মনে রাখবে, তার চেয়ে মনে রাখবে ক্রিকেট নিয়ে লেখাকে অন্য মাত্রা দেওয়ার জন্য। ইংলিশ ক্রিকেট লেখকদের মধ্যে ফ্র্যাঙ্ক কিটিং ও মার্টিন জনসনের নামও আলাদা করে বলা উচিত, যদিও তাঁরা অন্য সব খেলা নিয়েও লিখেছেন। একই কথা প্রযোজ্য দীর্ঘদিন দ্য টাইমস-এর প্রধান ক্রীড়া লেখকের পদ অলঙ্কৃত করা সাইমন বার্নসের ক্ষেত্রেও। হেন খেলা নেই, যা নিয়ে লেখেন না; লেখেন ওয়াইল্ডলাইফ নিয়েও, হয়তো এ কারণেই ক্রিকেট নিয়ে যখন লেখেন, সেটিতে ভিন্ন একটা দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পাওয়া যায়।

লেখার সাহিত্যমূল্যের জন্য ভারতীয় ক্রিকেট লেখকদের মধ্যে কে এন প্রভুর খুব নাম ছিল। মুদার পাথেরিয়া অনেক দিন আগেই ক্রিকেট লেখক জীবনের অবসান ঘটিয়েছেন। তারপরও লেখার প্রসাদগুণেই তাঁর নামটি নস্টালজিয়া জাগায় মনে। বয়স ২২ পেরোনোর আগেই দুটি বই লিখে ফেলেছিলেন। তবে পাথেরিয়ার লেখার আসল স্বাদ পেতে হলে অধুনাবিলুপ্ত স্পোর্টসওয়ার্ল্ড সাময়িকীর পুরোনো সংখ্যা ওলটানো ছাড়া উপায় নেই।

default-image



এতক্ষণ যাঁদের নিয়ে কথা হলো, তাঁদের সবারই লেখার বাহন ছিল ইংরেজি। সেটিই স্বাভাবিক। ক্রিকেট খেলার মতো ক্রিকেট লেখালেখির চর্চাও তো এগিয়েছে ইংরেজিভাষীদের হাত ধরেই। তাই বলে বাংলাতেও কি ক্রিকেট সাহিত্য রচিত হয়নি? সেই রচয়িতাদের মধ্যে সবার আগে বোধ হয় নাম আসবে শঙ্করীপ্রসাদ বসুর। ক্রিকেট যে শুধু রান আর উইকেটেই শেষ নয়, রমণীয় ক্রিকেট, ইডেনে শীতের দুপুর, ক্রিকেট সুন্দর ক্রিকেট—শঙ্করীপ্রসাদ বসুর এসব বই-ই তার যথার্থ প্রমাণ। ক্রিকেট লেখায় দারুণ সব পরিভাষা যোগ করার কৃতিত্বও প্রাপ্য তাঁর। পরে মতি নন্দীর কলমে যেটি আরও যুগোপযোগী, আরও আধুনিক রূপ পেয়েছে।

বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ বলতে হবে বদরুল হুদা চৌধুরীকে। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বই তবু ক্রিকেট ভালবাসি এ দেশে ক্রিকেটাশ্রিত সাহিত্য রচনার প্রথম প্রয়াস। পরে তিনি লেখেন আরও দুটি বই—দুটি ব্যাট, একটি বল রূপে রসে ক্রিকেট। এরপর সেই ধারাটাই টেনে নিয়ে গেছেন জালাল আহমেদ চৌধুরী। কিছুটা শঙ্করীপ্রসাদ বসু প্রভাবিত, তবে ইতিহাসমনস্কতার সঙ্গে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে মাঠের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তাঁর লেখায় যোগ করে ভিন্ন একটা মাত্রা। একটাই দুঃখ, জালাল আহমেদ চৌধুরী বেশির ভাগ লেখা সম্পাদকদের অনুরোধ আর পীড়াপীড়িতে পত্রপত্রিকায় ছাপা, হারিয়ে যাওয়াই যেসবের ভবিতব্য। বই লেখার কষ্টটা তিনি করতে চাইলেন না। প্রয়াত রণজিৎ বিশ্বাসও তা-ই। তিন দশকেরও বেশি নিয়মিত লিখে গেছেন ক্রিকেট নিয়ে। পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিকদের বাইরে ক্রিকেট নিয়ে এত লেখা বিশ্বেই আর কেউ লিখেছেন কি না সন্দেহ! সেসব লেখায় সাহিত্যগুণ ছিল, ছিল নিজস্ব একটা ধরনও, লেখকের নাম না দেখেও পাঠক বুঝতে পারতেন, এটা রণজিৎ বিশ্বাসের লেখা। কিন্তু আগ্রহী পাঠকেরা এখন তা কোথায় খুঁজে পাবেন!

সময় বদলে গেছে, তার হাত ধরে ক্রিকেটও। ক্রিকেট নিয়ে লেখালেখিও। অনেক দিনই জনপ্রিয়তায় পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচকে হারিয়ে দিয়েছে এক দিবসীয় ক্রিকেট। যেটিকে একসময় চটজলদি ক্রিকেট বলা হতো, এখন আর বলা যাচ্ছে না। কারণ তা হলে টি-টোয়েন্টিকে কী বলবেন? বাজার অর্থনীতি আর যুগের চাহিদা মিলিয়ে ক্রিকেটও এখন তাৎক্ষণিক ফুটবলীয় উত্তেজনা খোঁজে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট যদি সাত কোর্সের ডিনার হয়, এক দিবসীয় ক্রিকেট বা টি-টোয়েন্টি স্যান্ডউইচ-বার্গারের মতো ইনস্ট্যাস্ট ফুড। এই পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে ক্রিকেট লেখাতেও। শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখা থেকেই তুলে দিই, ‘সাহিত্যের মূলে থাকে জীবন। খেলার ক্ষেত্রে সে জীবন মানে নয় ফুটবলি উত্তেজনা—তার মধ্যে থাকা চাই উত্তেজনার সঙ্গে গাঢ় আবেগ ও সঘন ধীরতার সুষম বিন্যাস।...এখন হিসেবি উত্তেজনা। এখন ঘড়ির কাঁটা আর কড়ির খেলা। ওভার মেপে, ঘড়ি ধরে বলতে হবে, ওহে ব্যাটধারী, এইবার তুমি ঠ্যাঙাড়ে হও, খেপে যাও, এসে গেছে ধাতানি-পর্ব (স্লগ ওভারস)। এখন মারকাটারি, ধুন্ধুমার।’

default-image

এই তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় আর যা-ই হোক, সাহিত্য হয় না। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট তো এখনো আছে, তা নিয়ে তো হতে পারে। কিছুটা হয়ও। তবে আগের মতো হওয়ার আর উপায় নেই। আগে পাঠক ক্রিকেট লেখকের লেখা পড়েই খেলার খবর জানত, ক্রিকেটারদের সম্পর্কে জানতেও সেটিই ছিল ভরসা। রেডিওর ধারাবিবরণী হয়তো কিছুটা ক্ষুধা মেটাত, তবে সেটিও তো সুযোগ করে দেয় কল্পনার অবাধ বিস্তার ঘটানোর। এখন টেলিভিশন আর সেই সুযোগ রাখছে কই? সরাসরি খেলা দেখছেন দর্শকেরা, শুনছেন গ্রেট পঙ্‌ক্তিভুক্ত সব ক্রিকেটারের ধারাবর্ণনা। ম্যাচের আগে-পরে, বিরতির সময় খেলোয়াড়দের সাক্ষাৎকারও পৌঁছে যাচ্ছে ড্রয়িংরুমে। খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পরই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে শুরু হয়ে যাচ্ছে সেই ম্যাচ নিয়ে আলোচনা। এত সব দেখে-শুনে ফেলা পাঠককে পরদিনের পত্রিকায় সেই খেলার খবর পড়তে বাধ্য করানোটা আধুনিক ক্রিকেট সাংবাদিকের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ।

পরিবর্তন তো শুধু টেস্ট থেকে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়। আগে দলগুলো জাহাজে চেপে সফরে যেত। দুই-তিন মাসের সেই যাত্রায় সঙ্গী ক্রিকেট সাংবাদিকেরা যাত্রাপথেই পেয়ে যেতেন লেখার অনেক রসদ। পাঁচটি টেস্ট খেললে পনেরোটি প্রথম শ্রেণির প্রস্তুতি ম্যাচ—রসদ মিলত দুলকি চালে এগোতে থাকা সফরেও। আর এখন সফর শুরু হয়ে চোখের পলকেই শেষ। জেট যুগের বর্তমান ক্রিকেটে পেশাদার সাংবাদিকের কলমে (ল্যাপটপে) তাই ক্রিকেট সাহিত্য রচিত হওয়ার সুযোগ আর নেই। রচিত হলে তা হবে দৈনিক পত্রিকার প্রতিদিনের রিপোর্টিংয়ের দায় থেকে মুক্ত কারও হাতে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0