কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম

‘সব কিছুর পর
একজোড়া চোখই থাকে—দেবার মতো।’

হিমেল বরকত—হিমেল আর বেঁচে নেই শুনে যখন হঠাৎ কান্না পেল, তখন তার ‘চোখ’ নামের কবিতার এই চরণটাই মনে পড়ল।

একজোড়া চোখই তাকে প্রথমে মনে করল। সেই উনিশ-কুড়ি বছর বয়স থেকে যে বন্ধুকে চিনি, তার জন্য কখনো কাঁদতে হয়নি। তার সঙ্গে কথা বলাবালি ছিল, হাসি-গান ছিল, কান্না তো ছিল না। কিন্তু একজোড়া চোখেই ছিল সে। বন্ধু মরে গেলে ঠিক পাশেই একটা বিরাট গর্ত হয়ে যায়। সে অতল খাদে সব হাসিঠাট্টা গড়িয়ে পড়ে কেবল কান্নার শব্দই উঠে আসে।

এক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বছরে পড়তে গিয়েছিলাম হিমেল বরকতের সঙ্গে। ভিন্ন বিষয়ে পড়েছি আমরা, কিন্তু কলাভবনে রোজ যাওয়া হতো, না হলে আড্ডা হতো না।

সাহিত্যের ছাত্র হিমেলের সঙ্গে সেখানেই, ঘাসের ’পরে এক আড্ডায় বসে পরিচয় হয়েছিল। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ভাই সে, শুনে আবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম, যেন রুদ্রর মুখের আদল খুঁজেছিলাম। মনে হয়েছিল, হ্যাঁ, ও ভাইয়ের মতোই দেখতে। আমরা যেমন সারাক্ষণ হইচইয়ে মেতে থাকতাম, হিমেল তেমন ছিল না; হিমেল গভীর ছিল, গম্ভীর ছিল।

মনে মনে ভেবেছি, ছোটবেলা থেকে অকালমৃত ভাই তার মনজুড়ে ছিল বলে হয়তো সে অত গম্ভীর হয়েছিল। ও যে কবি, সেটা জানতে আমাদের একটুও দেরি হয়নি। ক্যাম্পাসে থাকতে কবিতার বই এল, ‘চোখে ও চৌদিকে’। মনে আছে, খুব হইচই করে সেই বই কিনেছিলাম।

বিজ্ঞাপন

হিমেল লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল, ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল। পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে—জানাই ছিল। আর শিক্ষক হলে ওর একটু গম্ভীর হওয়াই ভালো। প্রেমের কবিতা নিয়ে হাসাহাসিতে ও যদি আমাদের সঙ্গে সমানতালে গলা না মেলাত, আমরা ওকে বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দিতাম।

পাস করে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম, হিমেল রয়ে গেল প্রিয় ক্যাম্পাসেই। দূর থেকে শুনতে পেতাম, খুব ভালো শিক্ষক হয়েছে সে, ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় শিক্ষক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবান্ধব, যে কারও যেকোনো কাজে তাকে পাশে পাওয়া যায়। শুনে খুব আনন্দ হতো। নিজের লেখালেখি, সম্পাদনা, গবেষণা—সবকিছুতে সে খুব যত্নবান ছিল। ওর একেকটা বই এলে খুব গর্ব হতো, বন্ধুদের মধ্যে সেটা নিয়ে কথা হতো খুব।

হিমেলের মরে যাওয়ায় দ্বিগুণ কষ্ট হচ্ছে। হতে পারত, ওর বউ কোনো অচেনা মেয়ে। তাহলে হয়তো সেই মেয়েটার জন্য এত কষ্ট হতো না। কিন্তু হিমেলের বউ পপিও আমাদের বন্ধু, হিমেলের ক্লাসমেট। সে কীভাবে হিমেলকে ছাড়া থাকবে! পপির কান্না দেখে কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল সব। ‘কীভাবে হিমেলকে ছাড়া থাকব’ বলতে বলতে যেন আমাদের বলল, তোরা তো দূরে দূরে ছিলি, হিমেল তো আমার সব ছিল! মাত্র কয়েক দিন আগে পপির বাবা মারা গেছেন। পপি বলছিল, ‘সে কান্নাই শেষ হয় নাই আমার!’

হিমেল মরে গেছে বলে আমি ওকে নিয়ে লিখতে বসেছি, এটা মনে হতেই মনে হলো, চল্লিশ পেরিয়েছি আমরা মাত্র দু-তিন বছর আগে। বন্ধুকে হারাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। একটা মহামারি শুরু হয়েছে, এই অবরুদ্ধ সময়ে, বন্ধুদের সঙ্গে নতুন করে আবার খুব কথা হচ্ছিল, দেখা না হলেও ফোনে-নেটে। যেন আমার সবাই সবাইকে বেঁধে বেঁধে রাখছিলাম। হঠাৎ হিমেল সেই বাঁধন আলগা করে চলে গেল।

হিমেলের মরে যাওয়ায় দ্বিগুণ কষ্ট হচ্ছে। হতে পারত, ওর বউ কোনো অচেনা মেয়ে। তাহলে হয়তো সেই মেয়েটার জন্য এত কষ্ট হতো না। কিন্তু হিমেলের বউ পপিও আমাদের বন্ধু, হিমেলের ক্লাসমেট। সে কীভাবে হিমেলকে ছাড়া থাকবে! পপির কান্না দেখে কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল সব। ‘কীভাবে হিমেলকে ছাড়া থাকব’ বলতে বলতে যেন আমাদের বলল, তোরা তো দূরে দূরে ছিলি, হিমেল তো আমার সব ছিল! মাত্র কয়েক দিন আগে পপির বাবা মারা গেছেন। পপি বলছিল, ‘সে কান্নাই শেষ হয় নাই আমার!’

default-image

হাসপাতাল থেকে হিমেলের মৃতদেহ প্রথমে আনা হয়েছে বড় বোনের বাসায়। সেখানেই গিয়েছিলাম একবার শেষ দেখা দেখতে। পরিবারের মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম অন্যমনস্কভাবে। কিন্তু চমকে উঠে দেখলাম, যেন সবার মুখেই আরেকটা অকালমৃত্যুর জোড়া-কষ্ট! যেন রুদ্র আছেন আশপাশেই। বোনের বাসার দেওয়ালজুড়ে ছবিতে হাসছেন রুদ্র।

হিমেলের মেয়ে অতন্দ্রিলা। তার সামনে দাঁড়াবার শক্তি আমি কোথায় পেলাম কে জানে!

কিন্তু সে শক্ত আছে। কাঁদছে মা, মায়ের হাত ধরে আছে। যখন একবার কথা বলল, তখনই আসলে বুঝলাম, ওর ভেতরটা একেবারে ভেঙে গেছে। আগের দিন থেকে কত যে কেঁদেছে, ভেঙে গেছে কণ্ঠস্বর! যেন জেনে গেছে, বাকি জীবন বাবাকে ছাড়াই বেঁচে থাকতে হবে ওর। হিমেল কন্যাঅন্তপ্রাণ বাবা ছিল। মেয়ে বাবার মনের মতোই, বাবার স্বপ্নের মতো বড় হচ্ছিল। মেয়ের লেখা বই আসছে দেখে হিমেলের সঙ্গে খুব খুশি হয়েছিলাম আমরাও। কত কিছু আর দেখা হবে না হিমেলের। কত কিছু আমাদের দেখতে হবে হিমেলকে ছাড়া, হায়!

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0