default-image

ফেব্রুয়ারি মাস বরাবরই আমাদের জন্য বিশেষ। জাতীয় জীবনে উৎসবের-অর্জনের, পারিবারিক জীবনে আনন্দের-উদ্​যাপনের। আমার প্রয়াত বাবা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের জন্মদিন এই মাসেরই ১৮ তারিখে। জাতীয় উৎসব বইমেলাও শুরু হয় এই মাসেই এবং সেখানে বেশির ভাগ সময়, বিশেষ করে শেষ ১০ বছর, বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন তিনি। ২১ ফেব্রুয়ারি এ মাসের আরেক অর্জনের দিন, আমাদের জাতীয় জীবনে। আর ২৮ ফেব্রুয়ারি আমার মায়ের জন্মদিন। সব মিলিয়ে উৎসব, আয়োজন, ব্যস্ততা, ফুল, কেক, নিমন্ত্রণ, অনুষ্ঠান, ভালোবাসায় কেটে যায় আমাদের ফেব্রুয়ারি মাস।

নানা কারণে এ বছরে চলছে ব্যতিক্রম। করোনার কারণে জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো প্রায় সবই স্থগিত। আব্বাও আমাদের কাছে নেই। সব মিলিয়ে এবারের ফেব্রুয়ারি খুবই নিরুৎসব, নীরব। আব্বাকে স্মরণ করার মধ্যেই এবার সীমিত রয়েছে আয়োজন। এর আগে আরও দুটি লেখা লিখেছি আমি, তাঁকে নিয়ে—যিনি ব্যক্তিজীবনে ছিলেন উদ্বেগহীন—সমষ্টির মঙ্গলের ব্যাপারেই কেবল সচেতন। অন্যরাও অনেক বিশেষণে, বিশ্লেষণে আখ্যায়িত করেছেন তাঁকে। আমিও তাঁর কিছু গুণের কথা লিখেছি। তবে বরাবরই আমার মনে হয়েছে, তাঁর আসল পরিচয় ছিল, তিনি একজন ‘প্রকৃত মানুষ’ ছিলেন।

আব্বা এর প্রথম পরিচয় দেন ৯ বছর বয়সে। নিজের চোখের সামনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দুজন মানুষের মৃত্যু তাঁকে ভাবিয়েছিল। শুধু ধর্মের কারণে মানুষ মানুষকে মেরে ফেলতে পারে—এটা দেখে তাঁর শিশুমনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। এর সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়ায় ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ রোপিত হয়, সব মানুষকে একভাবে, এক করে দেখার বিশ্বাস জাগ্রত হয়।

বিজ্ঞাপন

অন্যের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়াই যে মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—বাকি জীবন তা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস ও লালন করতেন তিনি। তাই ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো সব সময় থাকত ঊর্ধ্বে, ঊহ্যে। তাঁর দর্শন ছিল, মানুষ কেন নিজেকে নিয়ে চিন্তা করবে, আত্মকেন্দ্রিক হবে? নিজের লেখা বই কখনো কাউকে জন্মদিন বা বিয়েতে উপহার হিসেবে দিতেন না। আমি বলতাম, সৈয়দ শামসুল হক বা আনিসুল হক আর কিছু না দিয়ে যদি তাঁর লেখা কোনো বই অটোগ্রাফসমেত আমাকে উপহার দিতেন, তাহলে আমার কাছে তো তা অনেক বেশি মূল্যবান হতো। আব্বা বুঝলেও কখনোই তা করতেন না। নিজের ছবিও কখনো বসার ঘরে রাখতেন না, প্লাক-ক্রেস্ট তো দূরের কথা। আত্মপ্রচার একদমই পছন্দ ছিল না তাঁর।

আব্বার খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন আমার বড় ফুফা। তাঁকে সমাহিত করেই তিনি যোগ দিলেন বাংলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে। বিদেশে আমার বোনের স্বামীর মারা যাওয়ার খবর পাওয়ার এবং দেহাবশেষ দেশে ফেরার মধ্যেও তিনি গেলেন এক অনুষ্ঠানে। সব সময়ই আব্বা মনে করতেন, নিজের বা পরিবারের চেয়ে তাঁর ওপর অন্যের দাবি বেশি।

২০১২ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলা একাডেমির সভাপতি করার সময় তাঁকে রাজি করাতে সবার বেশ বেগ পেতে হলো। ২০১৫ সালে পুনর্বার সভাপতি করার পর ২০১৮-তে যখন টানা তৃতীয়বার সভাপতি হওয়া আসন্ন, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলেন আব্বা। পদ প্রত্যাশার এই যুগে এটা বোধ হয় এক বিরল দৃষ্টান্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি হওয়ার সুযোগ যখন এল, সেটাও তিনি ফিরিয়ে দিলেন।

মরণোত্তর চক্ষু দান করেছিলেন। তবে দুর্ভাগ্য, মৃত্যুর সময় করোনা-উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতিতে তাঁর সেই ইচ্ছা পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। একসময় আমাদের কিছু না জানিয়ে দেহদানের সব আয়োজনও প্রায় সম্পন্ন করেছিলেন। তবে যাঁদের কাছে অনুরোধটা নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রবল মানসিক শক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর। সিগারেট খাওয়ার ২৫ বছরের পুরোনো অভ্যাস ছাড়লেন একনিমেষে। প্রাণশক্তিও ছিল প্রচুর। আমেরিকা থেকে এসে পরদিন ধরেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্লেন। ভোরে জার্মানি থেকে ফিরে সকালে গেছেন ক্লাস নিতে। কলকাতা থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌঁছে সেখান থেকেই ধরেছেন কাঠমান্ডুর ফ্লাইট। দিল্লি থেকে ফিরে দুপুরে দাওয়াত খেয়ে, বিকেলে অনুষ্ঠান আর রাতের খাবারও বাইরে খেয়ে একবারে বাসায় ফিরেছেন।

তাঁর সময়ানুবর্তিতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কষ্ট হলেও সময়মতো অথবা সময়ের আগে গিয়ে বসে থাকতেন, যাতে আমন্ত্রণকারীর উদ্বেগ না হয় অথবা তাঁর জন্য অনুষ্ঠানে কোনো দেরি না হয়। শরীর যখন বেশি খারাপ, তখনো, আমরা বলা সত্ত্বেও, এর ব্যত্যয় করতে রাজি হতেন না।

ছিলেন সততা ও নৈতিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ দেশের মানুষের খুব স্বাভাবিক চল হিসেবে তাঁর অভিভাবকদের আনুকূল্যে কমানো নিজের জন্মসন সঠিক করার উদ্যোগও একসময় নিয়েছিলেন। কিন্তু নানা জটিলতায় তাতে সফল হননি। তবে আমাদের সঠিক জন্মতারিখ-সন নিশ্চিত করেছিলেন।

বাহুল্য বর্জন করেছেন সব সময়ই। আমার দাদার রাখা নাম এ টি এম আনিসুজ্জামান একসময় ছেঁটে, ছোট করে ফেলেছিলেন। বক্তৃতা দিতেন খুবই সংক্ষিপ্ত। কেউ কেউ বলতেন, স্যার সবচেয়ে কম সময় বলেন, অথচ সবচেয়ে বেশি বলেন।

বিজ্ঞাপন

একজন সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন তিনি। তার প্রমাণ রেখেছিলেন এ দেশের সংবিধান রচনার সময়। ইংরেজিতে নানা দেশের সংবিধান সামনে থাকলেও বাংলা ভাষায় প্রথম সংবিধান লিখতে গিয়ে শব্দের ঘাটতি, অভিব্যক্তির তারতম্য ও নানা জটিলতা দেখা দেয়। সে থেকে উত্তরণ খুব সহজ ছিল না। চট্টগ্রামের পত্রিকা পূর্বকোণ, প্রথম আলোর প্রথমা প্রকাশন, ভাষা প্রতিযোগ, বন্ধু শফিক রেহমানের ম্যাগাজিন যায়যায়দিন—এসবের নামকরণেও তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এগুলোও আমি জেনেছি অনেক পরে, অন্যের মুখে। আব্বা আসলে প্রচার চাইতেন না কখনোই। আমাদের এ-ও বলেছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে পরিবার থেকে আমরা যেন কোনো উদ্যোগ না নিই। তবে কেউ সাহায্য চাইলে তা করার অনুমতি দিয়েছিলেন।

কলকাতায় ইডেন গার্ডেনসে বসে খেলা দেখছি। ঢাকা থেকে এসেছি শুনে পাশের মানুষটি জানতে চাইলেন খেলা দেখার জন্যই আসা কি না। বললাম, আমার বাবা একটা অনুষ্ঠানে এসেছেন, সেটাও একটা কারণ। পরে আব্বার নাম শুনে রীতিমতো দাঁড়িয়ে গেলেন সেই ভদ্রলোক। কলকাতার সাধারণ মানুষও এভাবে তাঁকে সম্মান করে দেখে খুব ভালো লেগেছিল। আরেকজন বলেছিলেন, কী দুর্ভাগ্য আপনাদের! যে মানুষটাকে দেখলে পুরো ভারতবর্ষ মাথা নামিয়ে ফেলে, তাঁকে গানম্যান নিয়ে চলতে হয়!

শেষ পর্যন্ত হয়তো বিরুদ্ধবাদীদের ক্ষোভ কমেনি। তবে কখনো কখনো তিনি তাঁদের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তাঁর বিবেক ও যুক্তিনির্ভর, আবেগবিবর্জিত, পক্ষপাতমুক্ত চরিত্রের কারণে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে একবার কোনো এক সহিংস ঘটনার তদন্ত কমিটি গঠন করা নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিবদমান ছাত্রসংগঠনগুলো কোনো কমিটিই মেনে নিতে চায়নি। পরে নাকি আব্বাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়াশীল একটি ছাত্রসংগঠন বলেছিল, ‘স্যার, আমাদের আদর্শে বিশ্বাস না করলেও আমাদের প্রতি অন্যায় করবেন না।’ চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম আব্বার এক সংবর্ধনায়। অনুষ্ঠান শেষে ট্রেনে ওঠার পর আব্বা জানতে চাইলেন, ফুলগুলো কোথায়? বললাম, আমাদের নিতে কষ্ট হবে দেখে ফুল-উপহার সব পরে পাঠিয়ে দেবেন বলেছেন আয়োজকেরা। মানপত্র? বললাম, আমরা শুধু মানসম্মান নিয়ে আসতে পেরেছি! প্রবল ভালোবাসায় সিক্ত আব্বা মৃদু হাসলেন।

আব্বার মৃত্যুর পর দেখলাম একজন পোস্ট করেছেন, ‘স্যার, আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, ওপরে আপনি ভালো থাকবেন।’

অন্যজন আমাকে বলেছিলেন, ‘তাঁর জন্য দোয়া করছি, কিন্তু আমি জানি তার কোনো প্রয়োজন নেই।’

এত মানুষের প্রাণে যিনি বাস করেন, তিনি যেন ভালো থাকেন।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন