আবদুস সালামের তোলা বইমেলার ছবি অবলম্বনে
আবদুস সালামের তোলা বইমেলার ছবি অবলম্বনে কোলাজ: আমিনুল ইসলাম

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই কেমন যেন খচখচ করে উঠল মনের ভেতরে। মনে হলো, আজও কি একই সূর্য উঠছে? কোথাও কোনো বৈপরীত্য নেই তো!

প্রশ্নগুলো জড়ো হতে সময় লাগে না, উত্তরও জানা। তারপরও আজ ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১-এর সকালে কেমন যেন লাগে। এত দিনের অভ্যস্ততা, কিন্তু এ বছর ফেব্রুয়ারিতেই কেবল সেই অভ্যাসের রূপটি নেই! হ্যাঁ, বইমেলা নেই, তবু এল পয়লা ফেব্রুয়ারি।

এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলা হচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবারের একুশে বইমেলাটি হবে ১৮ মার্চ থেকে। বলা ভালো, বইমেলা পেছানোর এ সিদ্ধান্ত হয়তো বাস্তবসম্মতও বটে। তবু দীর্ঘদিনের চেনা অভ্যাস, পরিচিত অভ্যস্ততায় ছেদ পড়লে ‘কী যেন নেই নেই’ ধরনের একটা ব্যাপার ঘটে। মন খারাপের অনুভূতি মনের মধ্যে জেঁকে বসলে দোষ দেব কাকে?

আমাদের অভিজ্ঞতায় পয়লা ফেব্রুয়ারি মানে বই উৎসব, বইমেলা শুরুর দিন। এদিন শাহবাগ থেকে পথগুলো ছুটে যায় বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে।

এরপর ফেব্রুয়ারিজুড়ে ওই দুই উদ্যানে প্রকাশক-লেখক-পাঠকের সমাগম, হইহুল্লোড়—এ তো আমাদের চেনা ছবি। মাঝখানে বসন্তের হু হু বাতাস বইয়ের পাতাতেও দোল দিয়ে যায়। বেয়াড়া কোকিল গলায় কুহু সুর তুললে তখন আমাদের মনের কোকিলও জেগে ওঠে। সে সময় কবির ভাষায়, বিনয় মজুমদার থেকে ধার করে মনে মনে আমরা বলি যে ‘ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?’

ভালোবাসি বলেই বইমেলায় যাই। ফুল ফুটুক না ফুটুক, বইমেলায় যাই আমরা, মেতে উঠি বইবসন্তে। বই আর বসন্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে ‘কেবলি দৃশের জন্ম হয়’ আমাদের বইয়ের মেলায়। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে এবারই ঘটল ব্যতিক্রম। না, হয়তো ভুল বললাম খানিকটা, ১৯৭৬ ও ’৭৭ সালেও ব্যতিক্রম ঘটেছিল। এই দুই বছরও বইমেলা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাস বলছে, আমাদের এখানে বইমেলার শুরু গত শতকের ষাটের দশকে। উদ্যোক্তা কথাসাহিত্যিক ও তৎকালীন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক সরদার জয়েনউদদীন।

১৯৬৫ সালে বর্তমান জাতীয় গণগ্রন্থাকারের নিচতলায় তিনি একটি বইমেলার আয়োজন করলেন, নাম শিশু গ্রন্থমেলা। পরে নারায়ণগঞ্জেও তিনি একটি বইমেলা করেছিলেন ১৯৭০ সালে। এই বইমেলার সঙ্গে বাংলা একাডেমির প্রকাশনা কর্মকর্তা ফজলে রাব্বিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

default-image

বাংলাদেশে বইমেলা শুরুর বৃত্তান্তটি সবিস্তার লিখেছেন লোকসংস্কৃতিবিদ শামসুজ্জামান খান। তাঁর লেখা থেকে ইতিহাসের পাতায় আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক:
‘এখানেই সরদার জয়েনউদদীন থেমে থাকেননি। ১৯৭২ সালে তিনি যখন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক, তখন ইউনেসকো ওই বছরকে “আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ” হিসেবে ঘোষণা করে।

’গ্রন্থমেলায় আগ্রহী সরদার সাহেব এই আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা।

‘১৯৭২ সালে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানে কোনো বইমেলা হয়নি। তবে বাংলা একাডেমির দেয়ালের বাইরে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনীর কিছু বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন। তাঁর দেখাদেখি মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা এবং বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলামও ওভাবেই তাঁদের বই নিয়ে বসে যান।’

পরে ১৯৮৩ সালে মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন করেন। সেই সময় থেকে গেল বছর অবধি ফেব্রুয়ারিতেই হয়ে আসছিল বইমেলা।

আর সত্তরের দশকের শুরুতে বাংলা একাডেমিসংলগ্ন এলাকায় সেই যে প্রকাশকেরা বইয়ের পসরা নিয়ে বসা শুরু করলেন, এ ধারায় ছেদ পড়েছিল ১৯৭৬ ও ’৭৭ সালে। ১৯৭৫-এ সপরিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর অস্থিতিশীল দেশে ওই দুই বছর বইমেলা হয়নি বলে জানা যায়।

এরপর এই ২০২১-এ হলো ব্যতিক্রম, করোনা পরিস্থিতির কারণে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা হচ্ছে না।

সত্তরের দশকের শুরুতে বাংলা একাডেমিসংলগ্ন এলাকায় সেই যে প্রকাশকেরা বইয়ের পসরা নিয়ে বসা শুরু করলেন, এ ধারায় ছেদ পড়েছিল ১৯৭৬ ও ’৭৭ সালে। ১৯৭৫-এ সপরিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর অস্থিতিশীল দেশে ওই দুই বছর বইমেলা হয়নি বলে জানা যায়।

করোনাভাইরাস ওলট–পালট করে দিয়ে গেল সবকিছু। মাত্র এক বছর আগে যা ছিল চেনা আচার, এই কয়েক দিনে বদলে গেছে তার অনেক কিছু। নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় এখন এসেছে অনেক নতুন ধরনের জীবনধারা। আমাদের জীবনযাত্রায় মাস্কের আবির্ভাব যেমন ঘটেছে, তেমনি ফেব্রুয়ারির চেনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এখন অচেনা। এখানে আজ নেই বইয়ের গন্ধরাজি।

এবার জানুয়ারিতে কলকাতা বইমেলা হয়নি। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা হলেও দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো হয়েছে অনলাইনে। আর আমাদের বইমেলা ফেব্রুয়ারি ছাড়িয়ে মার্চে গিয়ে ঠেকেছে।

ফেব্রুয়ারির বইমেলার স্মৃতি মাথার মধ্যে ঘাই মারলে মনে জেগে ওঠে স্মৃতির সেলুলয়েড। বই বই গন্ধের সেই স্মৃতি কত না মনোহর—ফেব্রুয়ারি আসি আসি করার মুহূর্তে লেখকদের উৎসাহ-উদ্দীপনাও তো বলশালী হয়ে উঠত। আর মেলা শুরু হলে আড্ডা, মফস্বলের লেখক-পাঠকদের দিন গোনাও শুরু হতো, সবাই হিসাব কষতেন, কবে যাবেন ঢাকায়, বইমেলায়।

বইমেলায় এসে স্টলে স্টলে ঘোরাফেরা। প্রকাশক, বিক্রয়কর্মীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। ‘আপনার এবার কী বই আসছে?’ লেখকদের সঙ্গে দেখা হলেই এ প্রশ্ন ছিল খুবই স্বাভাবিক।

বিজ্ঞাপন

আর বইসহ লেখকের সঙ্গে সেলফি, আপনারা বলবেন, এসব তো ফেব্রুয়ারির চিরচেনা দৃশ্য। আক্ষরিক অর্থে কয়েক প্রজন্ম এমনই দেখে আসছিলাম আমরা। ফলে একুশের চেতনাঋদ্ধ ফেব্রুয়ারি যেমন ভাষার মাস, একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে এ মাসে বইমেলা হওয়ার কারণে এটি হয়ে উঠেছিল বইয়ের মাসও।

default-image

গেল বছরও এই ফেব্রুয়ারিতে ছিল কত কলরব। বইয়ের বহুরঙিল হুল্লোড়। মনে পড়ে, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যখন বইমেলার উদ্বোধন হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে তখন ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আর এখন তিনি বিগতের কাতারে। এখনো বইমেলা হবে, আর মাসখানেক পরই বইয়ের উৎসবে উদ্বেল হয়ে উঠবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। কিন্তু সেখানে আর পাওয়া যাবে না শুভ্রসফেদ আনিসুজ্জামানকে। কোভিডকাল কেড়ে নিয়েছে দেশের অনেক লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিক ও প্রকাশককে—আনিসুজ্জামান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রশীদ হয়দার, কামাল লোহানী, মনজুরে মওলা, রাবেয়া খাতুন, মকবুলা মনজুর, মান্নান হীরা, দাউদ আল হাফিজ, হিমেল বরকত, সেলিম আহমেদ, সৈয়দ লুৎফুল হক, খন্দকার মাহমুদুল হাসান এবং প্রকাশকদের মধ্যে লুৎফর রহমান, আহমেদ মাহফুজুল হক, সজীব সাহা ও নজরুল ইসলাম বাহার…। হ্যাঁ, বিগতের কাতার বড় দীর্ঘ হয়ে গেল একটি বছরে। এক বছরেই বদলে গেল বিস্তর। সংস্কৃতিক্ষেত্রে এর বড় দৃষ্টান্ত হলো—ফেব্রুয়ারির অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলে গেল মার্চে।

মার্চ আর মাস্ক। ১৮ মার্চ থেকে মাস্ক পরে আমরা বইমেলায় যাব। বইয়ের অক্ষরের সঙ্গে আবারও মিলবে মাস্ক পরা মানুষের মন। তবে বসন্তের কোকিলের কুহু ডাক সেখানে হয়তো আর শোনা যাবে না।

করোনাময় পৃথিবীতে, নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় আদতে অনেক কিছুই তো মেনে নিতে হয়, মনে নেওয়া লাগে।


অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন