default-image

কোপেনহেগেনের এক শীতল রাত। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে শীত একটু বেশিই পড়ে। তার ওপর উত্তর মেরুর বরফের চাঁইয়ের শরীর স্পর্শ করে আসা ঠান্ডা বাতাস ছলকে ছলকে এসে চাবুক মারে শরীরে। ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ করে দিয়ে এক বোঝা কাগজের বান্ডিল নিয়ে বসেছেন এক স্কুলশিক্ষক। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা। অনেকগুলো দেখেও ফেলেছেন। ঘরের এককোণে ফায়ারপ্লেসের আগুনটা যেন নিবু নিবু। সেটা উসকে দিয়ে এলেন শিক্ষক। ফ্ল্যাক্স থেকে এক মগ কফি নিয়ে আবার বসলেন খাতা নিয়ে।

মনোযোগ দিয়ে খাতা দেখছেন। একটা খাতা মেজাজ খারাপ দেয় মাস্টারমশাইকে। বেয়াদব ছেলের খাতা! একটা প্রশ্ন এসেছিল পরীক্ষায়, ‘কীভাবে তুমি একটা ব্যারোমিটারের সাহায্যে একটা বিল্ডিংয়ের উচ্চতা মাপবে?’

উত্তরে বেয়াদব ছোকরাটা লিখেছে, ‘এক দড়ির মাথায় একটা ব্যারোমিটার বাঁধব। তারপর ওটাকে ঝুলিয়ে দেব বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে। তারপর দড়ির দৈর্ঘ্য আর ব্যারোমিটারের দৈর্ঘ্য যোগ করে মোট যে দৈর্ঘ্য পাব, সেটাই হলো বিল্ডিংয়ের উচ্চতা।’
কত্ত বড় বদমাশ! মাস্টারমশাই খেপে আগুন, ‘আরে ব্যাটা, এভাবেই যদি বিল্ডিংয়ের উচ্চতা মাপবি তাহলে আর ব্যারোমিটার লাগানো কেন? শুধু দড়ি দিয়েই তো মাপা যায়!’ ছোকরা কি ইচ্ছে করে এমন উত্তর লিখেছে, নাকি আদৌ সে ব্যারোমিটার দিয়ে উচ্চতা মাপার ব্যাপারটা জানেই না? রেগেমেগে মাস্টারমশাই কেটে দিলেন উত্তরটা আর নম্বরের ঘরে বসালেন শূন্য।
পরে যখন ফল প্রকাশ করা হলো, দেখানো হলে সে বেয়াদব ছেলের খাতা, সেও তখন হতাশ। মানতে পারছে না শিক্ষকের দেওয়া নম্বর। তাই আপিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বোর্ডের কাছে। সেই আপিলের ফরমে সে লিখেছে, ব্যারোমিটারের সাহায্যে অনেকভাবেই বিল্ডিংয়ের উচ্চতা মাপা যায় অনেকগুলো পদ্ধতিতে, প্রশ্নপত্রে তো বলা ছিল না কোন পদ্ধতি মাপতে হবে। সে একটা পদ্ধতির কথাই লিখেছে, তাহলে কেন তার নম্বর কাটা যাবে?
বোর্ড তার আবেদন উড়িয়ে দেয়নি। ছেলেটার কথায় যুক্তি আছে, প্রশ্নে তো উল্লেখ করে দেওয়া হয়নি অমুক পদ্ধতিতে বিল্ডিংয়ের উচ্চতা নির্ণয় করা হোক। তবু ছেলেটা যে উত্তর দিয়েছে, সেটাও হয়তো যুক্তির খাতিরে ঠিক বলা যায়, কিন্তু একই প্রশ্নের উত্তর অন্য শিক্ষার্থীরাও লিখেছে, তারা তো ঠিকই বুঝেছে, কোন পদ্ধতিতে উত্তর দিতে হবে। বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়, আরেকবার যাচাই করা হোক ছেলেটাকে, যদি দেখা যায় সঠিক উত্তরটা সে জানে না, তাহলে বহাল থাকবে মাস্টারমশাইয়ের দেওয়া নম্বর।
ছেলেটাকে ডাকা হলো স্কুলে। স্কুলের প্রশাসক টিম তাকে সময় দেয় ছয় মিনিট, এর মধ্যেই প্রমাণ করতে হবে সে ব্যারোমিটার দিয়ে বিল্ডিংয়ের উচ্চতা মাপার আসল সূত্রটা জানে। ছেলেটা রাজি। তবে সে বড্ড ঘাড়ত্যাড়া। বলে, ‘অনেকগুলো ব্যাখ্যাই আসলে আছে, কোনটা দিয়ে শুরি করি?’
প্রশাসক টিম বলে, তোমার পছন্দমতো যেকোনো একটা দিয়ে শুরু করো। সময় ওই ছয় মিনিট।
কিন্তু ঘাড়ত্যাড়া ছেলে আসল উত্তরের ধার দিয়েই গেল না। বলল, একটা ব্যারোমিটারকে ছাদে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে ছেড়ে দিতে হবে। মাটিতে পড়তে যে সময় লাগে, সেটা গুনে রাখতে হবে ঘড়ি দেখে। তারপর পড়ন্ত বস্তুর সূত্র থেকে হিসাব করে গুনে ফেলা যাবে ব্যারোমিটারের হিসাব।
প্রশাসন টিম তো বিরক্ত। একটা ঢিল ছুড়েও তো এই পদ্ধতিতে বিল্ডিংয়ের উচ্চতা মাপা যায়, ব্যারোমিটার ব্যবহারের বিশেষত্ব কোথায়?
তখন সে বলল আরেকটা পদ্ধতির কথা। বলল, বিল্ডিংয়ের ছায়া আর ব্যারোমিটারের ছায়া মেপে সেই দুই মাপের অনুপাত থেকেও বের করা যায় বিল্ডিংয়ের উচ্চতা। আবার সরল দোলকের সূত্র ব্যবহার করেও বিল্ডিংয়ের দৈর্ঘ্য মাপা যায়। এ জন্য একটা সুতায় ব্যারোমিটার ঝুলিয়ে ব্যারোমিটার তৈরি করতে হবে। তারপর সেটা মাটিতে একবার দুলিয়ে নিন। আরেকবার বিল্ডিংয়ের ছাদে নিয়ে গিয়ে দোলান। দুই জায়গার দোলনকালের পার্থক্য থেকে হিসাব কষে বিল্ডিংয়ের উচ্চতা বের করা যাবে।
প্রসাশক টিম ততক্ষণে মহাবিরক্ত। তারা বেশ বুঝতে পারছে, এ ছেলে আসল উত্তর জানে, ইচ্ছে করেই তাদের ল্যাজে খেলাচ্ছে।
ওদিকে সময়ও শেষের দিকে। ছেলেটা তখন তার তুরুপ থেকে বের করে এল অস্ত্র। বলে, ক্লিশে একটা উপায় আছে। সেটা দিয়েও বিল্ডিংয়ের উচ্চতা সহজেই মাপা যায়। এ জন্য প্রথমেই ব্যারোমিটার মাটিতে রেখে মাপতে হবে বায়ুর চাপ। তারপর সেই ব্যারোমিটার বায়ুর চাপ মাপতে হবে ওই বিল্ডিংয়ের ছাদে নিয়ে গিয়ে। দুই চাপের পার্থক্য থেকে হিসাব কষে বের করা যাবে বিল্ডিংয়ের দৈর্ঘ্য।
এতক্ষণে খুশি প্রশাসক টিম। আসল উত্তর পেয়ে গেছে। ছেলেটার আপিল কবুল করে তাকে পূর্ণ নম্বর দেয়।
সেদিনের সেই ছেলেটাই হলো কোয়ান্টাম মেকানিকসের পুরোধা পুরুষ নিলস বোর, পরে যিনি বারবার ঘাড়ত্যাড়ামি করে আইনস্টাইনকে ঘোল খাইয়েছেন। যদিও এই গল্পের সত্যতা নিয়ে দ্বিমত আছে বৈজ্ঞানিক সমাজে। তবে সেটা তেমন জোরালো নয়।
লেখক: সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা
সূত্র: স্পেস ডট কম

বিজ্ঞাপন
নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন