বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তৃতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে কবি পা রাখলেন ১৯২০-২১ সালে। ১৯১৬ সালের পর এ মুলুকে রবীন্দ্র-উন্মাদনা তত দিনে থিতিয়ে গিয়েছে। আমেরিকা তখন ব্রিটেনের অন্যতম সেরা মিত্র। আর ব্রিটিশবিরোধিতা করে ‘নাইট’ উপাধি ছুড়ে ফেলেছেন তিনি। আমেরিকানরা এটি ভালোভাবে নেয়নি। তাই এবার তিনি তেমন অভ্যর্থনা পেলেন না। ছিলেন দুই সপ্তাহ।

চতুর্থবার এসেছিলেন ১৯২৯ সালে। এ সময় পাসপোর্ট হারানোকে কেন্দ্র করে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা কবির সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেন, বসিয়ে রাখেন অনেকক্ষণ। ফলে নির্ধারিত সব বক্তৃতা বাতিল করে এবং অল্প কিছুদিন লস অ্যাঞ্জেলেসে থেকে চলে যান তিনি।

আমেরিকায় রবি ঠাকুরের পঞ্চম ও শেষ ভ্রমণ ছিল ১৯৩০ সালে। এবার মার্কিনরা তাঁকে অনেক সম্মান দেখান। হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট হুবারের সঙ্গে দেখা করেন কবি। এই যাত্রায় তাঁর প্রতিটি বক্তৃতা সভায় প্রচুর জনসমাগম হয়েছিল। সে সময় নিউইয়র্ক ও বোস্টনে কবির আঁকা ছবির দুটি সফল প্রদর্শনীও হয়েছিল। ৬৭ দিনব্যাপী শেষ আমেরিকা ভ্রমণের সময় নিউইয়র্ক টাইমস রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ২১টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মধ্যে দুটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার এবং রবি ঠাকুরের সঙ্গে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ঐতিহাসিক সেই ছবিও ছাপা হয়। রবীন্দ্রনাথের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের সময় বেশ কিছু বিচিত্র ঘটনার কথা জানা যায় তখনকার পত্রপত্রিকাসহ চিঠিপত্র সূত্রে। তেমন কিছু ঘটনা নিয়েই এই লেখার অবতারণা।

‘নিউইয়র্ক টাইমস’–এ প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ

রাশিয়া ভ্রমণ শেষে জার্মান ‘ব্রেম্যান’ জাহাজে ১৯১৩ সালের ৯ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ নিউইয়র্কে পৌঁছান। নিউইয়র্ক টাইমস ১০ অক্টোবরে কবির আগমনের সংবাদ প্রকাশ করে লেখে, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভারতীয় কবি এবং দার্শনিক গতকাল জার্মান জাহাজ “ব্রেমেন” করে এখানে পৌঁছান। নোঙর করা জাহাজটি তখন সঙ্গরোধে ছিল। অসম্পূর্ণ নাশতা খেতে খেতে কবি নিউইয়র্ক টাইমস–এর সঙ্গে তাঁর স্বপ্নের কথা বলছিলেন, একটি জাতিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগে অবশ্যই শিক্ষিত করতে হবে। তিনি ভারতের মানুষের বর্তমান অবস্থার কথা বলেছিলেন এবং বর্তমান অবস্থায় ভারতের স্বশাসন বা স্বাধীনতার বিষয়ে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরাধীন থাকা অবস্থায় কোনো দেশই নিজেকে শাসন করতে সক্ষম নয়...।’

নিউইয়র্ক টাইমস রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ভুলভাবে প্রকাশ করায় কবি পত্রিকায় একটি লিখিত প্রতিবাদ পাঠান। এটি ছাপা হয় ১৩ অক্টোবর। সেই প্রতিবাদে তিনি লেখেন, ‘ভারতীয় কিছু সমস্যা সম্পর্কে আমার যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা আপনার পত্রিকার সকালের সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে, তা ভুল ও বিভ্রান্তিকর, এ বিষয়টির অনুমতি আমি কিছুতেই দিতে পারি না। এটি অবশ্যই নিশ্চিতভাবে জানবেন যে আমার মতে, একটি স্ব–সরকার নিজেদের পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেরাই প্রশিক্ষণ নিতে পারে, তবে বিদেশিদের অধীনস্থ না থেকে। লোকদেখানো শান্তির উপস্থিতি কখনোই প্রকৃত শান্তি হতে পারে না। দুর্ভোগ ও সংগ্রামের মাধ্যমেই কেবল এটি অর্জন করা যেতে পারে।’

বরফে রবীন্দ্রনাথের পতন

জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতা দেবীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ নিজেই জানাচ্ছেন যে বরফের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯১৩ সালে পোস্ট করা এই চিঠিতে কবি লিখছেন, ‘আর্ব্বানায় যখন ছিলুম, তখন একদিন রাত্রে খুব বৃষ্টি হয়ে গিয়ে সেই বৃষ্টির জল জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল—রাস্তার ধারে গাছপালা যেন কাচ দিয়ে মুড়ে দিয়েছিল—সেই বরফের ভারে মাঝে মাঝে গাছের ডাল মড়মড় করে ভেঙে ভেঙে পড়ছিল। সমস্ত রাস্তার ওপর পুরু বরফ—তার ওপর দিয়ে চলা শক্ত—পা পিছলে পড়ে যেতে হয়—অনেককেই পড়তে হয়েছিল। আমি পড়বার ভয়ে সাহস করে বাড়ি থেকে বেরুতে পারতাম না। শেষকালে দু–তিন দিন বাড়িতে কয়েদির মতো বন্ধ থেকে একদিন বেরিয়ে পড়লুম। অল্প একটু দূর গিয়েই পতন। পথে লোক প্রায় ছিল না। কেবল একজন মাত্র পথিক আমার পিছন পিছন আসছিল। নিজের দেহভার সামলাতেই তাকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে হয়েছিল—কাজেই তার আর হাসবার সময় ছিল না। আর এক পা অগ্রসর হবার উৎসাহ আমার রইল না। সেইখান থেকেই বাড়ি ফিরলুম—তার পরে যে পর্যন্ত না বরফের পাষাণ হৃদয় সম্পূর্ণ বিগলিত হলো, সে পর্যন্ত আর আমার কোণের থেকে বেরোইনি।...’

হৃদ্‌রোগে আক্রান্তের খবর

১৯৩০ সালের ৯ অক্টোবর নিউইয়র্ক থেকে বস্টন হয়ে কানেটিকাট রাজ্যের নিউ হ্যাভেনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় ইয়েলে রবীন্দ্রনাথ এলেন ১৯ অক্টোবর। এখানে আসার পর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলেন কবি। এ সময় চিকিৎসক তাঁকে সব কর্মসূচি বাতিল করে বিশ্রামের পরামর্শ দিলেন। তখনকার পত্রিকাগুলো নিয়মিতভাবে কবির ভ্রমণ, অসুস্থতা এবং বিশ্বভারতীর জন্য তহবিল সংগ্রহের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল। যদিও রবীন্দ্রনাথ সেই হৃদ্‌রোগ উপেক্ষা করে তাঁর স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন।

‘আমেরিকান স্ত্রী’ থাকার খবর

নিউইয়র্ক টাইমস ১৯৩০ সালের ২৭ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে তারা কবির আমেরিকান স্ত্রীর আর্থিক সহায়তায় শান্তিনিকেতনে স্কুল চলছে বলে উল্লেখ করে।

এর এক মাস পর কবির অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রদূত হেনরি মরগেনথ কবির একজন আমেরিকান স্ত্রী–সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ করে বলেন, ‘কবির পত্নী কবির মতোই একজন ভারতীয় উচ্চবর্ণের হিন্দু, যিনি ২৬ বছর আগে গত হয়েছেন। তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ আমেরিকায় ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ে অধ্যয়ন করেছেন।’

যুক্তরাষ্ট্রে বড়দিন ও নববর্ষ উদ্‌যাপন

আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ যুক্তরাষ্ট্রে বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষ উদ্‌যাপন করেন। পরে তাঁর অভিব্যক্তি লিখে পাঠান বন্ধু সি এফ অ্যাণ্ড্রুজের কাছে। এখানে কবির বেশ কিছু বন্ধু ছিলেন, যাঁরা সব সময় তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন। তাঁদেরই একজন উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রিচার্ড টি এলি (১৮৫৪–১৯৪৩)। কয়েক দিনের জন্য কবিকে তিনি নিউইয়র্কের অদূরে ক্যাটস্কিল এলাকায় অবস্থিত ‘ইয়ামা ফার্মস’ নামের অতিথিশালায় বড়দিনের অবকাশ কাটাতে নিয়ে যান। ২৫ ডিসেম্বর সেখান থেকে অ্যাণ্ড্রুজকে রবিঠাকুর লেখেন, ‘আজ বড়দিন। আমরা প্রায় ৫০ জন মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে একত্রিত হয়েছি...এই পবিত্র দিনে খ্রিষ্টের কথাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোথায় মানুষের অন্তরে খ্রিষ্টের বাণী। আজ নর–নারীরা অতিরিক্ত ভোজন–পানে ব্যস্ত, অতি উচ্চহাসি তমসায় উন্মত্ত। এদের আমোদ-আহ্লাদের মধ্যে অনন্তের স্পর্শ কোথায়—ভক্তির চিহ্ন কোথায়?...’

সেখান থেকে নববর্ষের আগেই নিউইয়র্কে ফিরে আসেন কবি। ১৯২১ সালের ১ জানুয়ারি অ্যাণ্ড্রুজকেই তিনি আবার লিখছেন, ‘আজ নতুন বছর। কিন্তু বাতাসে আমি তা অনুভব করছি না, আমার কাছে কোনো বার্তা নিয়েও আসেনি। এই দেশগুলোতে নতুন বছর উদ্‌যাপন, নতুন রাজনৈতিক সামঞ্জস্য ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আসে। তবে শান্তিনিকেতনে আমরা যে নতুন বছরটি জানি, তা আসে আমাদের ভেতরের সংস্কার সরিয়ে আত্মার পরিস্ফুটনের জন্য। ...গত রাতে সমস্ত শহর ছিল প্রচণ্ড ফুর্তি ও উল্লাসে উন্মত্ত এবং আজ সকালে তারা এত ক্লান্ত যে হৃদয় উন্মুক্ত করে চমৎকার সূর্যের আলো তারা দেখতে পারছে না। আমার হৃদয় সব সময় এই ভেবে বেদনাক্রান্ত যে শান্তিনিকেতনে সকালের সূর্য আমার জন্য আশীর্বাদ নিয়ে আসবে, কিন্তু দেখবে আমার আসনটি ফাঁকা...।’

নিউইয়র্কের বেকারদের জন্য অনুদান

১৯৩০ সালের ১৪ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস ‘ত্রাণ তহবিলে ঠাকুরের অনুদান’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। এ সংবাদে ছিল, ‘আজ রাতে (১৪ ডিসেম্বর) ব্রডওয়ে ও ফিফটি-থার্ড স্ট্রিটে অবস্থিত ব্রডওয়ে থিয়েটারে অনুষ্ঠিতব্য বিনোদন অনুষ্ঠানে কবি স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থিত থাকবেন; এবং এই অনুষ্ঠান থেকে যে আয় হবে, তা মেয়র ওয়াকারের বেকারদের জন্য গঠিত ত্রাণ কমিটির কাছে দেওয়া হবে।’ পত্রিকাটি আরও উল্লেখ করে, এই বিনোদন অনুষ্ঠান থেকে অর্জিত আয় মূলত রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতনে দেওয়ার কথা ছিল। বলা দরকার, আমেরিকায় তখন অর্থনৈতিক মহা মন্দা বা ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ চলছিল। এই প্রেক্ষাপটেই কবি বেকারদের অর্থ দান করেন।

১৪ ডিসেম্বরের পরদিন নিউইয়র্ক টাইমস ‘আবৃত্তিতে ঠাকুর’ শিরোনামে এই বিনোদন অনুষ্ঠানের আরেকটি সংবাদ প্রকাশ করে। এখানে রবিঠাকুর যে বেকারদের অনুদান দিয়েছেন, সে বিষয়ে সবিস্তার লেখা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রবীন্দ্রনাথের শেষ উপস্থিতিটি ছিল নিউইয়র্কের জগদ্বিখ্যাত ব্রডওয়ে থিয়েটারের উজ্জ্বল আলোকচ্ছটায় অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটি নাচ, গান, অভিনয় ও আবৃত্তিতে ঠাসা ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন শান্তিনিকেতনের কোনো তরুতলে অনুষ্ঠানটি হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এটিই ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ উপস্থিতি এবং শেষবার মার্কিন মলুকে আসা। ১৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতেই ভারতের উদ্দেশ্যে আমেরিকা ত্যাগ করেন তিনি।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন