বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই যে বাবা মারা গেলেন। ছেলের হঠাৎ মনে পড়ে গেল, এই ঘটনার প্রায় ৫০ বছর আগে লেখা শত বছরের নিঃসঙ্গতার একটি ঘটনা। চমৎকার এক বৃহস্পতিবার দুপুরে উরসুলা মারা যায়। সেদিনও একটা পাখি কাচের দেয়ালে উড়তে গিয়ে বেডরুমে মরে পড়ে ছিল। ফলে জাদুবাস্তবতার যে কল্পিত জগৎ মার্কেস নিজের লেখায় তৈরি করেছিলেন, তিনি সেই জগতের বাসিন্দাও ছিলেন।

স্মৃতি ছিল মার্কেসের লেখার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। তিনি বলেছেন, ‘স্মৃতি হচ্ছে আমার লেখার টুল ও র ম্যাটেরিয়াল। আমি এটা ছাড়া কিচ্ছু করতে পারি না।’ সেই স্মৃতিই তিনি একসময় হারিয়ে ফেলেন। মজা করে ছেলেকে বলেছিলেন, ‘আমি স্মৃতি হারিয়েছি। কিন্তু সৌভাগ্য যে স্মৃতি হারানোটা আমি ভুলেই গিয়েছি।’ মাকোন্দো গ্রামের মানুষ যে স্মৃতি খোয়ানোর রোগে ভুগত, সেই আলঝেইমার্সে লেখক নিজেই কুপোকাত হলেন। পরিস্থিতি এত জটিল হয়ে উঠল যে ছেলেদের চিনতে পারতেন না। স্ত্রীকেও মনে করতে পারতেন না।

শেষ বয়সে একদিন বাগানে পায়চারি করছিলেন নোবেলজয়ী এ লেখক। সচিবকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কোথায়?

‘আপনার বাড়ি’, সচিবের কাছে এ উত্তর শোনার পর মার্কেসের বিস্ময় আর কাটে না, ‘হতেই পারে না। আমি বাড়ি যাব। দাদুর পাশে শুয়ে ঘুমাব।’

default-image

অথচ এই মানুষই একসময় দুচোখ বন্ধ করে টানা পঁয়তাল্লিশ মিনিট স্মৃতি থেকে কবিতা শোনাতে পারতেন। প্রতিদিন সকাল নয়টায় বসতেন লেখার টেবিলে। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চলত। এ সময় তাঁর সঙ্গে কথা বলা ছিল বারণ। দরকার পড়লে চিরকুট লিখে চুপি চুপি দিয়ে আসতে হতো।

জীবদ্দশায় মার্কেস মৃত্যুকে পারতপক্ষে এড়িয়ে গেছেন। মৃত ব্যক্তিদের শেষকৃত্যে যেতেন না। মেহিকোর ফাইন আর্টস প্যালেসে তাঁর স্মরণসভায় বার্সা পরিচিতজনদের সতর্ক করেন—কেউ যেন কাঁদে না। রাষ্ট্রপতি এনরিক পেনা নিয়েতো লেখকের স্ত্রীকে ‘বিধবা’ বলে সমবেদনা জানিয়েছিলেন। এই ‘বিধবা’ শব্দটি মেনে নিতে পারেননি বার্সা। প্রথম যে সাংবাদিক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তাঁকে তিনি অকপট বলেন, ‘যত শিগগির সম্ভব, বিয়ে করব। আমি বিধবা নই। আমি আমিই।’

১৫ আগস্ট ২০২০। কিছুক্ষণ পর বার্সা শ্বাসকষ্টে মারা যাবেন। অক্সিজেন চলছে। ফাঁকে ফাঁকে তিনি সিগারেট টানছেন। এর মধ্যে ছেলে রদ্রিগোকে সতর্ক করছেন, ‘অক্সিজেনের সুইচ বন্ধ কোরো না। আমি ঠিকই ফিরে আসব।’

না, আর ফেরেননি মার্কেসের স্ত্রী।

মার্কেস বলতেন, মানুষের তিনটি জীবন। প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন। মার্কেস যে বাঁ চোখে দেখতে পান না, এটা তাঁর ছেলে প্রথম শুনেছিলেন ৫০ বছর পর।

মার্কেস আর বার্সার শেষ দিনগুলো নিয়ে যে বই তাঁদের ছেলে রদ্রিগো লিখেছেন, সেখানে এমন টুকরো টুকরো অনেক গোপনই ফাঁস করেছেন। কেন তিনি এমন করলেন? বাবা রদ্রিগোকে বলেছিলেন, ‘যখন আমি থাকব না, তোমার যা ইচ্ছা কোরো।’

মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে মার্কেস ছেলেদের একবার বলেছিলেন, অষ্টাদশ শতাব্দীর রাশিয়ান ক্ল্যাসিকের মতো তিনি একটা বই লিখতে পেরেছেন। সেই ব্যক্তিই শেষ জীবনে তাঁর বই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন এই ভয়ে যে এগুলো শেষে তাঁকে লজ্জায় ফেলে না দেয়।

নিজের সাহিত্যিক জীবনী লেখেননি মার্কেস। লিভিং টু টেল দ্য টেইল হলো লেখক হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁর জীবনকাহিনি। কিন্তু গার্সিয়া মার্কেসের লেখকজীবনের ঘটনাগুলো জানতে তাঁর ছেলের এই বইয়ের কাছে পাঠককে দ্বারস্থ হতেই হবে।

সূত্র: লিটহাব ডটকম, ওপেন দ্য ম্যাগাজিন ডটকম ও এনওয়াইটাইমস ডটকম

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন