বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জেন ব্রেটের তখন খুব নামডাক। ২০ বছরে বাচ্চাদের জন্য তিনি শুধু উনিশখানা বই-ই লিখেননি, বইগুলোর সব রঙিন ছবিও এঁকেছেন নিজের হাতে। তাঁর বই পড়ে সচরাচর বাচ্চারা প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে পারে জীবজন্তু ও পশুপাখি সম্পর্কে। তাঁর স্বামী জোসেফও গুণী লোক। সেমিনারের শেষ দিকে তিনি সবাইকে ব্রাস বাজিয়ে শোনান। তারপর জেন ব্রেট শ্রোতাদের উদ্দেশে জানতে চান, এখানে কারও কি বাচ্চাদের জন্য বই লেখার পরিকল্পনা আছে? আমি একটি বাচ্চা-হাতিকে মূল চরিত্র করে বড় গল্প লেখার আইডিয়া পেশ করলে তিনি বিষয়টি বিস্তারিত বলতে বলেন। আমি জানাই যে আমার এক বয়োবৃদ্ধ আত্মীয়া দূর সম্পর্কে খালাম্মা হাতিটির মালকিন। তাঁর বাপের বাড়িতে সয়সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা হলে তিনি শিশু-হাতিটির ভরণপোষণের দায়িত্ব পান। তাঁর বড় ভাইয়ের ভাগে পড়ে একটি দাঁতাল ও ছোট ভাইয়ের ভাগে পড়ে একটি মাদি হাতি। এরা পার্বত্য চট্টগ্রামে গাছ টানার কাজ করে। এ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনে জন ব্রেট আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন,‘লিসেন, তুমি তো শিশু-হাতিকে নিয়ে লিখবে, তো তোমার খালাম্মার ভাইদের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে শুধু শিশু-হাতির বিষয় বর্ণনা করো।’ আমি থতথত খেয়ে কী বলব ঠিক বুঝতে না পারলেও তাঁর স্বামী জোসেফ হিয়ারন কথার খেই ধরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বাচ্চা-হাতিটির কোনো নাম আছে কি?’ আমি জবাব দিই, ‘ওর নাম হচ্ছে হাতেম তাই। ঘটনা হলো, বাচ্চা-হাতিটি যেদিন মাহুতের তাড়া খেয়ে সারা দিনমান হেঁটে বেশ রাত করে ক্লান্ত হয়ে খালাম্মার বাড়িতে পৌঁছায়, অই দিন তাঁদের দহলিজ ঘরে হাতেম তাইয়ের পুঁথি পড়া হচ্ছিল। শিশু-হাতিটিকে খুব পেরেশান দেখাচ্ছিল, তাই খালাম্মা তাঁর কাজের লোককে চটপট একটি কলাগাছ কেটে আনতে বলেন। ডোমা কলার চারাগাছ খেতে খেতে শিশু-হাতিটি নাকি চোখ বড় বড় করে হাতেম তাইয়ের পুঁথি পড়া শুনছিল, সে থেকে তার নামডাক হয় হাতেম তাই।’ ‘নাও স্টপ প্লিজ’, বলে আমাকে থামিয়ে দিয়ে জন ব্রেট বলেন, ‘ইট অল সাউন্ডস লাইক অ্যান ইন্টারেস্টিং স্টোরি।’ তিনি চটপট তা লিখে ফেলার জন্য এনকারেজ করেন।

কনফারেন্সে জেন ব্রেট এসেছিলেন ঝুড়িতে করে গলায় রুমাল বাঁধা একটি মোরগ নিয়ে। তিনি কথা বলতে বলতে ফ্লিপচার্টে তাঁর গ্রন্থের চরিত্রগুলোর ছবি এঁকে যাচ্ছিলেন অবলীলায়। তিনি যখন মাইক্রোফোনে কথা বলছিলেন, মুরগাটি তখন চুপচাপ বসে ছিল টেবিলের ওপর। এ মুরগাকে জেন সংগ্রহ করেন একটি বই লেখার সময়। বইতে মোরগের প্রসঙ্গ ছিল, আর জেন এ মুরগার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে করে এঁকেছিলেন অনেকগুলো ছবি। মুরগাটি নাকি আজকাল অপেরা গানের সমঝদার হয়ে উঠেছে। বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য জোসেফ পোর্টেবল টেপে জোরেশোরে ইতালিয়ান অপেরার সুর বাজান; আর কী আশ্চর্য, মুরগা ঝুঁটি দুলিয়ে পাখা বিস্তারিত করে সাড়া দেয়, আর আমিও সবার সঙ্গে হাততালিতে শরিক হই।

সামার কটেজটির পাহাড়ে ওঠার জন্য নিশ্চয়ই মোটর চলাচলের সড়ক আছে। আমি সম্ভবত ভুল ট্রেইল ধরে উঠছি, তাই ভারী মাউন্টেনবাইকটি ঠেলে ঠেলে ঝোপঝাড় ভেঙে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ি। আমি রওনা হওয়ার আগে তাঁদের টেলিফোনে ধরতে পারিনি। তবে আনসারিং মেশিনে মেসেজ রেখেছি। যদি তাঁরা বাড়িতে না থাকেন, এ নিয়ে একটু দ্বিধাও হয়। জেন ব্রেটকে নিয়ে বছর কয়েক পত্রপত্রিকায় কোনো আলোচনা হয়নি। লেখক হিসেবে কী কারণে জানি তিনি একটু বিস্মৃত হয়েছিলেন। তারপর নিউইয়র্ক টাইমস-এ তাঁকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ ছাপলে, আবার তিনি লাইমলাইটে চলে আসেন। গেল ৩০ বছরে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০; এবং এ বছর বই বিক্রি হয়েছে মোটমির্যা ৩৪ মিলিয়ন কপি।

default-image

ঝোপঝাড়ের ওপেনিং দিয়ে আমি সড় সড় করে চলে আসি সরাসরি আঙিনায়। সামার কটেজের বারান্দায় রেলিংয়ে ঝুঁকে অপেক্ষা করছেন জোসেফ। তাঁর ঝোলা গোঁফ পেকে কাশফুলের মতো সাদা হয়েছে। এত বছর পরও তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন দেখে খুশি হই। আমরা বারান্দার দুটি ডেকচেয়ারে বসলে তিনি লিভিং রুমের দিকে ইশারা করে বলেন, ‘লুক, সি ইজ স্টিল ওয়ার্কিং। প্রতিদিন ঘড়ি ধরে আট ঘণ্টা সে কাজ করবেই। তারপর রাতে আবার ছবিও আঁকে।’ পাইনের হানি কালার সব গোটা গোটা গাছ ও বাকলা দিয়ে তৈরি সামার-কটেজের লিভিং রুমে মস্ত মস্ত সব আয়নার জানালা। তা দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাই, জেন ব্রেট ড্রয়িং-টেবিলের ওপর পেনসিল, রোলার ও কম্পাস দিয়ে বোধ করি স্টোরিবোর্ডের নকশা করছেন। পাশেই ডালা খোলা ল্যাপটপ। কাছে স্ট্যান্ডে দাঁড় করানো ফ্লিপচার্টেও কিছু ড্রয়িং। আমি জোসেফের কাছে জানতে চাই, ‘অবসরে এন্টারটেইনমেন্টের জন্য আপনারা কী করেন?’ জোসেফ হেসে বলেন, ‘কাছেই বার্কশেয়ারের এয়ারপোর্টে রাখা আছে আমাদের ছোট্ট একটা প্লেন। জেন ভালোবাসেন লো ফ্লাইং। আমি তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যাই বনানী আর সরোবরের ওপর দিয়ে।’ জেন এসে দোরগোড়ায় দাঁড়ালে আমি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত স্পর্শ করি। ‘তুমি নিশ্চয় মোরগ পছন্দ করো, এসো আমার সঙ্গে, আমি তাদের খাবার দেব।’ আঙিনায় বেশ কয়েকটি সিরামিকের ডিশে জেন মিলেটের দানা ছড়িয়ে দেন। এবং তা খুঁটে খায় মোট ১৭টি রঙিন হৃষ্টপুষ্ট নানা সাইজের মোরগ-মুরগি। জেন ‘সিল্কি বানটামস’ প্রজাতির পালক ফুলানো চেস্টনাট ব্রাউন কালারের একটি মুরগার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এর নাম হচ্ছে মি. ইউনিভার্স, একটু ঝগড়াটে প্রকৃতির হলেও মডেল হিসেবে হি ইজ আ ওয়ান্ডার বার্ড। আমি যখন তার ছবি আঁকি, সে একেবারেই নড়াচড়া করে না।’ ‘সিলভার লেইস ওয়ানডটেস’ প্রজাতির আরেকটি মুরগা তার লিপস্টিক-রেড ঝুঁটি ঝাঁকিয়ে জেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, তিনি তার নাম ‘জুনবাগ’ বলে উল্লেখ করেন। এ মুরগার ছবি তাঁর অনেকগুলো বইতে আছে। সে নানা এক্সিবিশনে দরাজ গলায় বাঁক দিয়ে প্রাইজও পেয়েছে।

খাওয়ানো শেষ হলে পর জেন ‘ব্ল্যাক-পোলিশ’ বলে একটি মোরগ কোলে নিয়ে আমাকে তাদের চিকেনকুপ বা মোরগের ঘর দেখান। কাঠে তৈরি চিকেনকুপটি ত্রিভুজাকৃতির। তার সামনে নেটে তৈরি খোলামেলা বারান্দা। জেনের উৎসাহে আমি হামাগুড়ি দিয়ে মূল ঘরে উঁকি দিই। এখানে জেন রীতিমতো মোরগদের বৈঠকখানা সাজিয়েছেন। দেয়ালে তাঁর জলরঙে আঁকা মোরগদের প্রতিকৃতি। ছাদে আটকানো সাউন্ডবক্সে বাজছে ইউরোপিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের টিউন। তাঁর মোরগগুলো কেবল ধ্রুপদি সংগীতের সমঝদারই না, গান শুনে তারা নাকি রিল্যাক্সও করে, তাদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি ককফাইটও কম হয়।

জেনের মাথায় মনে হয় মোরগের বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই ঢুকেছে। তিনি অতঃপর আমাকে কটেজে নিয়ে এসে দেয়ালে ঝোলানো মোরগের পোর্ট্রেট, স্কেচ ও ড্রয়িং দেখাতে শুরু করেন। তিনি বেশ কিছু কাজ সিরামিকেও করেছেন। এসব দেখাতে দেখাতে তিনি জানতে চান, ‘তোমার হাতির বাচ্চা নিয়ে লেখাটা তৈরি হয়েছে কি?’ আমি আমতা-আমতা করে বলি, ‘এবার বাংলাদেশে গিয়ে শোনলাম, খালাম্মার বাচ্চা-হাতিটা বেশ সেয়ানা হয়েছে, সে আজকাল সার্কাসে ফুটবল খেলছে।’ জেন বলেন, ‘লিসেন, দিস ইজ অ্যান অপরচুনিটি। ফিরে গিয়ে হাতিটাকে আবার অবজার্ভ কোরো। সার্কাসে তার পারফরম্যান্স নিয়ে কিছু ছবি তোলো। তারপর সবকিছু জড়ো করে লিখতে বসে যাও।’ জোসেফ এসে খানিক ইতস্তত করে বলেন,‘ থ্যাংক ইউ ফর স্টপিং বাই। আমরা কিন্তু এবার ফ্লাই করতে যাব। উড ইউ লাইক টু জয়েন আস? আমাদের প্লেনে এক্সট্রা সিট আছে।’ আমি একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ি।

জোসেফ হিয়ারন আন্তরিকভাবে আমার পিট চাপড়ে বলেন, ‘কামঅন, ম্যান...ডোন্ট হেসিটেট। চলো আমাদের সঙ্গে আজ ঘণ্টাখানেক ফ্লাই করবে।’ ঠিক বুঝতে পারি না প্লেনে চাপতে গেলে আমার মাউন্টেবাইকখানা কী করব? জোসেফ বিষয়টার ফয়সালা করে দেন। তিনি নিজেই বাইকটি ঠেলে উঠিয়ে দেন তার পিকআপ ট্রাকের পেছনে। কথা হয় বেলা এখনো পড়ে আসেনি, ফ্লাইংয়ের পর ল্যান্ড করে আমি দিব্যি মাউন্টেনবাইক হাঁকিয়ে ফিরে যেতে পারব আমার গন্তব্যে।

মাত্র মিনিট দশেক ড্রাইভে আমরা এসে পৌঁছি ছোট্ট একটি এয়ার স্ট্রিপে। জঙ্গলাকীর্ণ এ মাঠে সুন্দর করে ছাঁটা ঘাসে বেশ দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি ছোট ছোট ব্যক্তিগত বিমান। সারা এয়ার স্ট্রিপে হাতির শুঁড়ের মতো বাঁকানো হলুদ রঙের একটি উইন্ড সক্স ছাড়া জায়গাটিতে এয়ারপোর্টের অন্য কোনো আলামত নেই। রোদে দাঁড়িয়ে থাকা নাকের ডগায় প্রপেলার জোড়া তাদের ছোট্ট জাবিরু জে ৪৩০ প্লেনটিতে কায়ক্লেশে বসা যায় মাত্র চারজন। বিমানখানার ভেতর দেখতে অনেকটা পুরোনো দিনের ডাটসান মোটর কারের মতো। পাইলটের ভূমিকায় জোসেফ প্রপেলার ঘুরিয়ে বিমানটি স্টার্ট দিলে তার পাশে বসে কানে ইয়ার প্লাগ গুঁজে জেন ব্রেট স্কেচ খাতায় আঁকিবুঁকি শুরু করেন। আমার পাশে বেতের ঝুড়িতে সিটবেল্ট বাঁধা হয়ে বসেছে জুন বাগ নামে মোরগটি। সে জানালা দিকে উঁকি দিয়ে দেখে উড়ন্ত প্লেনের তলা দিয়ে ছুটে যাওয়া গাছপালা।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন