রবেয়া খাতুনের ছবি অবলম্বনে কোলাজ
রবেয়া খাতুনের ছবি অবলম্বনে কোলাজ আমিনুল ইসলাম

তেতলার বইয়ের দেরাজটা রাবেয়া খাতুনের বইয়ে বোঝাই, বই খুললেই উৎসর্গের পাতায় বাঁকা হরফে হাতে লেখা, ‘আফি কাকার জন্য’, বা ‘আফি কাকার উদ্দেশ্যে’।

কোনোটি আফি কাকাকে উৎসর্গ করা। আমি জানি ‘আফি’ মানে আফিজউদ্দিন আহমেদ, আমার নানার নাম। হাফিজউদ্দিনের পরের ভাই বলে আঁতুড়ে মিলিয়ে রাখা নাম আফিজউদ্দিন, এ নামের আর কোনো অর্থ নেই—এসব বলে বলে আমার নানা হাসতেন। হাসতেন আর নিমগাছতলার কালো কাঠের চেয়ারটায় বসে আলোর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে কী সব ভাবতেন। তাঁর জন্য প্রতিবছর প্রচুর বই আসত রাবেয়া খাতুনের কাছ থেকে। কে রাবেয়া খাতুন? আমার হাত থেকে ‘বড়দের বই’ কেড়ে নিতে নিতে আম্মা কিংবা ছোট খালা মিটমিট করে হেসে বলত, ‘আমাগো বইন। চাচতো বইন।’ শুনতাম মহা রূপসী, শুনতাম সাংঘাতিক বিদুষী, এক হাতে রুটি বেলে আরেক হাতে বই। শুনতাম রাবেয়া খালা আমাদের নানির চেয়ে বয়সে বড়, শুনতাম মেজ খালার নাম রাবেয়া খালাই রেখেছিলেন, ‘মেরী’। এ নাম আমার মায়ের হওয়ার কথা, রাবেয়া খালা আমার মায়ের জন্য এ নাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় নানা প্রবোধকুমার সান্যালের ‘হাসুবানু’ পড়ে প্রথম কন্যার নাম দিলেন ‘হাসু’, রাবেয়া খালার দেওয়া নাম নাকচ হয়ে গেল, পরে মেজ খালা জন্মালে নাম রাখা হলো ‘মেরী’। সেই বারান্দাঘেরা বাড়িতে ‘রাবেয়া’ নামটা বিক্রমপুরের জিবে উচ্চারিত হতো ‘রাবেয়্যা’। ‘রাবেয়্যায় খোব সুন্দর আছিল, খালি পড়নের ঝুঁক।’

রাবেয়া খালার বাবার নাম ছিল মুলুকচাঁদ, আম্মাদের মেজ জেঠা। বড় জেঠার নাম ফকিরচাঁদ, সম্ভবত এই জেঠার একটি মেয়ের নাম আমেনা। রাবেয়া আর আমেনা ভাইঝি হলেও তাদের আফি কাকা বা ছোট কাকার (মানে আমার নানার) ছিলেন বয়স্যতুল্যা। ওঁদের সঙ্গে ওঁদের বাড়িতেই এই ছোট কাকা বড় হয়েছিলেন, কাছের বন্ধু, গল্প আর ডুয়েট গানের সঙ্গী, ময়দানে বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গী, পাটুয়াটুলীর দোকান থেকে কলের গান কিনে আনার সঙ্গী। বড় ভাই-ভাবি কিংবা মেজ ভাই-ভাবির বিছানায় সদ্যোজাত শিশুর পাশেই শুয়ে থাকতেন ছোট্ট আফি, ভাবিরা ছিলেন মাতৃতুল্যা।

আমেনার সঙ্গে সেই ছোট কাকা ডুয়েট গাইতেন, ‘তুমি কি কেবলি ছবি’। গলা ছিল প্রায় পঙ্কজ মল্লিকের মতো, ভাইঝিদের শোনাতেন কাননদেবীর ‘যদি আপনার মনে মাধুরী মিশায়ে এঁকে থাকো কোনো ছবি’। মুলুকচাঁদ ছিলেন অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ, ভোলাভালা, গানপাগল মানুষ। ভুলে একদিন ছোট ভাইয়ের নামে আসা লেফাফা কদিন পরে বের করে দিলেন, ছোট ভাই আফি দেখলেন ফৌজে যোগ দেওয়ার চিঠি—জীবনের অমন সুযোগ হারালেন, এদিকে স্নেহান্ধ ভাইয়ের ওপর রাগও চলে না, কাঁদলেন রাগ করে।

বিজ্ঞাপন

বয়সের তফাত অত্যন্ত বেশি ছিল বলে আমার আম্মা কিংবা খালাদের সঙ্গে তুতো বোনসুলভ তেমন কোনো সখ্য রাবেয়া খালার গড়ে ওঠেনি, বরং রাবেয়া খালার মেয়েরা ছিল আমার খালাদের বন্ধুস্থানীয়। মুলুকচাঁদ জেঠার বাড়িতে আম্মার একাত্তর কেটেছে, পরে ঠাটারীবাজারেও ওঁরা একসঙ্গে থাকতেন। বিয়েতে দেখা হতো ঘুরেফিরে, আমার ঘেটি ধরে সজাগ করে দিয়ে আম্মা দেখাত—ওই দ্যাখ আমার রাবেয়া আপা আসছেন।

বিয়েবাড়ির অসংখ্য আলোর চুমকির ভেতর রিনিঝিনি করে ঢুকে যাওয়া সুসজ্জিতা-সুরভিতা, শৌখিন, মৃদুভাষী রাবেয়া খালাকে দেখতাম। তত দিনে তিনি বাংলাভাষীর কাছে অতিপরিচিত নাম, রাবেয়া খালার ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়ার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিল তাঁর আফি কাকা, কিন্তু আমরা ছোটরা সামনে এলেই পারিবারিক আলাপ বন্ধ হয়ে যেত—যেন আমরা একেকটি চলমান সজনীকান্ত। কিন্তু যতটুকু সংগ্রহ করতে পারতাম, তাতে মনে হতো, এ যেন সিনেমার গল্প, তেমনই স্বয়ম্ভূ একটি মানুষ, তেমনই সক্রিয় তাঁর মন, তেমনই স্বনির্মিত তাঁর শিল্পযাত্রা। ওঁর প্রথম উপন্যাসের নাম ছিল ‘নিরাশ্রয়া’, কিন্তু ‘নিরাশ্রয়া’ বা ‘ভাগ্যবিড়ম্বিতা’র মতো বাজে শব্দ তিনি জীবন থেকে মুছে ফেলেছিলেন। তবে সেসব পরের কথা।

তত দিনে তিনি বাংলাভাষীর কাছে অতিপরিচিত নাম, রাবেয়া খালার ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়ার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিল তাঁর আফি কাকা, কিন্তু আমরা ছোটরা সামনে এলেই পারিবারিক আলাপ বন্ধ হয়ে যেত—যেন আমরা একেকটি চলমান সজনীকান্ত। কিন্তু যতটুকু সংগ্রহ করতে পারতাম, তাতে মনে হতো এ যেন সিনেমার গল্প, তেমনই স্বয়ম্ভূ একটি মানুষ, তেমনই সক্রিয় তাঁর মন, তেমনই স্বনির্মিত তাঁর শিল্পযাত্রা। ওঁর প্রথম উপন্যাসের নাম ছিল ‘নিরাশ্রয়া’, কিন্তু ‘নিরাশ্রয়া’ বা ‘ভাগ্যবিড়ম্বিতা’র মতো বাজে শব্দ তিনি জীবন থেকে মুছে ফেলেছিলেন।

মনে আছে, ইটের রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে মায়াকাননের কাছাকাছি কোথাও মায়ের চাচাতো বোন রাবেয়া খাতুনের বাড়ি, ছোট খালার সঙ্গে রিকশায় করে চলে গেলাম সেই বাড়িতে। সেকালে রাবেয়া খাতুন আমাকে আলোড়িত করেননি, করেছিল তাঁর মেয়েদের নাম—কেকা আর কাকলী। আমি মনে মনে ভাবলাম, নির্ঘাত সত্যেন্দ্রনাথ থেকে নেওয়া, এরপর আরেক ব্যাচ ছেলেমেয়ে হলে নাম হবে ‘বেনু ও বীণা’? আর যদি যমজ ছেলে হয়, তাহলে নাম হবে ‘অভ্র ও আবীর’? অবশ্য কাকলী না হয়ে নামটা হওয়া উচিত ছিল কুহু। যাহোক, এই কাকলী ছিল ছোট খালার প্রিয় সখী, অকুতোভয় মায়ের ভীরু কন্যা…পরীক্ষা দিতে ভয় করে বলে সে নাকি পরীক্ষা দিত না। আমি মুগ্ধ হয়ে তার এই সব যুক্তি শুনলাম, মনে ভাবলাম, এমন হলে তো মন্দ হয় না। আহা! যদি এমন ভয় পাওয়ার ব্যারাম আমারও হতো।

একবার রাবেয়া খালার একটা বই চুরি করে পড়লাম, নামটা আমার মনে নেই। বইটার গল্প এ রকম—নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ে উচ্চবিত্ত একটি মানুষের প্রমোদসঙ্গিনী হয় পয়সার বিনিময়ে, আদরটাদর করবার পর লোকটা মেয়েটাকে শংকর মাছের চাবুক দিয়ে একবার পেটাতেও যায়। পরে মেয়েটি সেই ট্রিপ থেকে ফিরে এসে হারিয়ে যায়। লোকটা তাকে আর খুঁজে পায় না। অনেক বছর পর যখন পায়, তখন মেয়েটি একটা রেস্তোরাঁর মালিক, সেই রেস্তোরাঁর খুব নামডাক। মেয়েটির অন্য ভাইবোনেরাও আর কেউ দৈন্যদশায় পড়ে নেই, সবাই প্রতিষ্ঠিত। সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার, মেয়েটি সেই ট্রিপের পর গর্ভবতী হয়েছিল, সেই সন্তানকে সে আপন পরিচয়ে বড় করছে। এই বই পড়েছি, সেটা ধরা পড়ার পর আমি আম্মার খুব কানমলা খেলাম।

করপোরাল পানিশমেন্ট পেয়ে খেপে গিয়ে বললাম, ‘আহা! তোমার বোন যা লেখে! যে দেশে বিবাহবিচ্ছেদ লুকায়, সেই দেশে কিনা নায়িকা বিবাহবহির্ভূত সন্তান বড় করছে।’ আম্মা দ্বিগুণ বিরক্ত হয়ে তাড়ন করল আমাকে, ‘যাও যাও, নিজে কিছু লিখ্যা দেখাও গিয়া, আমার বইন তো তাও লিখছে!’

বলে রাখা ভালো, আমাদের স্কুলজীবনের শেষ দু-এক বছর বাদে পুরোটাই কেটেছে স্বৈরশাসকদের আমলে। তখন বিটিভিতে বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধুর নাম না নেওয়াটা যে রাজরোগের উপসর্গ, তা হচ্ছে ইতিহাস অস্বীকার করার চেষ্টা। এই রাজরোগে রেডিও-টেলিভিশন সবই আক্রান্ত ছিল। ফলে রাবেয়া খাতুনের যেসব নাটক স্বাধীনতা দিবসে বা বিজয় দিবসে সম্প্রচারিত হতো, তাতে পাকিস্তানি মিলিটারিকে রেফার করা হতো ‘হানাদার বাহিনী’ বা ‘ওরা’ বলে, ২৫ মার্চের রাতে কেউ না কেউ প্রতিবেশীকে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলত, ‘ওরা আমাদের আক্রমণ করেছে!’ রাবেয়া খালাই এমন করে লিখতেন, নাকি বিটিভিতে এসে সেটা বদলে যেত, তা বিচার করার বয়স আমার হয়নি, আমি গিয়ে আম্মাকে আবার খোঁচাতাম—‘বুঝলা, তোমার বইনের নাটকে পাকিস্তানিরা হইল “ওরা”।’ আম্মা পাত্তাই দিত না, আবারও বলত, ‘ভালো ইশকুলে না গিয়া এমন লেইখা দেখাও দেখি!’

বিজ্ঞাপন

রাবেয়া খালার সঙ্গে এই সব কল্পিত আদর্শিক সংঘাত নিয়ে আমি বড় হচ্ছিলাম। বেজার মুখে গভীর অসূয়া নিয়ে দেখছিলাম—আম্মার রাবেয়া আপা বইয়ের দুনিয়ার সব হিরোকে চেনেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-গৌরকিশোর ঘোষ-আলাউদ্দিন আল আজাদ-আহসান হাবীব-সুফিয়া কামাল-শামসুর রাহমান-জহির রায়হান-খান আতা—কে নয়!

default-image

দেখি একাত্তরের জার্নাল যে কজন মানুষ লিখে গেছেন, পুরান ঢাকার আঁতিপাঁতি লিখে গেছেন, তাঁদের ভেতর আম্মার রাবেয়া আপা অন্যতমা, কিংবা অনন্য। যে দেশের মানুষ দাদির গয়না হাতে পেয়ে প্রথমেই ভাঙায়, প্রিয়জনের নিশানাও রাখে না, সেই দেশে তিনি অপূর্ব কনজারভেশনের কাজ করে গেছেন এই লিখে লিখে, সময়ের সাক্ষ্য রেখে রেখে। ব্রিটিশ ঢাকার ‘আন্ধার ঘরের ময়দান’ থেকে রাজার দেউড়ি জিন্দাবাহার লেন হয়ে রায়সাহেব বাজারের হাসনাহেনার জঙ্গল...খটখটে ধোলাইখালের অদূরে মেথরপট্টি...সেটেলমেন্টের মাঠে পুকুরপাড়ের একমাত্র বরফকল...ত্রিশ ভরি সোনার বিছে পরা সরদারদের বাড়ির বউ...ফুলবাড়িয়া রেললাইন আর পল্টনের মেলা...একাত্তরের লেখক সংগ্রাম শিবিরের বিক্ষোভ মিছিল, কোথায় ছিলেন না তিনি?

যে জীবনে তিনি অজ্ঞাতনামা অজস্র ভাগ্যাহত মা-মাসি-মামি-কাকি-বোনদের নামহীনতার ভিড়ে মিশে থাকতে পারতেন, সেখান থেকে উঠে তিনি কেবল সম্মুখের দিকে গেছেন। তখন তো আমি কেবল পরিচিত হচ্ছিলাম যাজ্ঞবল্ক্যের বিদুষী স্ত্রী মৈত্রেয়ীর সঙ্গে, যিনি অনায়াসে বলতে পেরেছিলেন—যা আমাকে অমৃত দেবে না, তাতে আমার কী-বা কাজ? সেই ব্রহ্মবাদিনীর প্রশ্নের আলোতে আমি ভাস্বর হতে দেখেছি তাঁকে, যাঁর কথা কেবল শুনেছি এই বলে—এক হাতে খাস্তা কচুরি বেলতেন, আরেক হাতে বই। মেয়েজন্ম আর তার তাবৎ আগল ভেঙে কেউ যে নিজের জ্যোতিতে জ্বলতে পারে, দশকের পর দশক জ্বলেই থাকতে পারে, সেই তো আমার দেখা।

রাবেয়া খালার পরমপ্রিয় লেখক ছিলেন আশাপূর্ণা দেবী, তাঁর সম্পর্কে তিনি নিজেই লিখেছিলেন, ‘তিনি অশিক্ষিত লেখিকা। বিধিদত্ত প্রতিভা কিছু আছে। আছে বিধাতার দেওয়া সৌভাগ্য। নইলে যেখানে হাত দেন তাতেই সোনা ফলে। কি বড়দের কি শিশুসাহিত্য, সবার ওপরে রয়েছে তাঁর গল্পের দারুণ চলচ্চিত্র সাফল্য।’ আশাপূর্ণা দেবী ওঁকে বলেছিলেন—সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্য উভয়েতেই তিনি অবিচল থাকার চেষ্টা করেছেন, আর দেবতার কাছে প্রার্থনা করেছেন যেন জীবনের শেষ দিনটি অবধি লিখে যেতে পারেন, সৈনিকের মৃত্যু যেমন যুদ্ধাস্ত্র ধরে, তাঁর মৃত্যুও যেন তেমন কলম ধরে হয়! কে জানে আশাপূর্ণা দেবীর মুখে এমন শুনবার সময় রাবেয়া খালাও তেমনি করে ভেবেছিলেন কি না।

আম্মা এক সন্ধ্যায় রাবেয়া খালার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। ঘর ভরে আছে কিউরিও আর পুতুলে। রাবেয়া খালার পুরান ঢাকার স্মৃতিতে তো আছে পুতুলপ্রীতির কথা। তখনো রাবেয়া খালার তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ, টিকলো নাক, ডিম্বাকার মুখ, ওষ্ঠ বরাবরই কত অব্যক্তকে জানাবে বলে ঈষৎ স্ফুরিত, নিজ গৃহে সুসজ্জিতা তিনি। মৃদুভাষী, গলার আওয়াজ বরাবরই সামান্য কাঁপে। মুখে মুচকি হাসি, চোখেও হাসি। আমার নানাদের মানে ওঁর বাপ-চাচাদের চাউনিই ছিল এমন ধারা। লেখালেখি করি শুনে আবার সেই হাসি, হাসি স্তিমিত হয়ে এলে মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, ‘এই পথে এলে কেন? এর চেয়ে খারাপ আর কোনো পেশা হতে পারে না!’ প্রফেশন না ভোকেশন এই সব নিয়ে সামান্য কথা হওয়ার পর আবার বললেন, ‘এই পথের চেয়ে খারাপ আর কোনো পথ হতে পারে না!’ রাগ? বিরাগ? অভিমান? ওঁর মতো সংযত মানুষের এর বেশি বলার উপায় ছিল না, সেকালের মানুষ তো, সৌজন্যবোধ তাঁদের অস্তিত্বের শর্তমতন ছিল।

লেখালেখি করি শুনে আবার সেই হাসি, হাসি স্তিমিত হয়ে এলে মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে কাঁপা গলায় বললেন,‘এই পথে এলে কেন? এর চেয়ে খারাপ আর কোনো পেশা হতে পারে না!’ প্রফেশন না ভোকেশন—এই সব নিয়ে সামান্য কথা হওয়ার পর আবার বললেন, ‘এই পথের চেয়ে খারাপ আর কোনো পথ হতে পারে না!’ রাগ? বিরাগ? অভিমান? ওঁর মতো সংযত মানুষের এর বেশি বলার উপায় ছিল না, সেকালের মানুষ তো, সৌজন্যবোধ তাঁদের অস্তিত্বের শর্তমতন ছিল।

লাইত মটিফের মতন বারবার করে ওঁর লেখায় এসেছে দুপুর, ঠা ঠা দুপুর, ফেরিওয়ালার পিছু পিছু কলতাবাজারে যাওয়ার দুপুর, বাকল্যান্ড বাঁধ ধরে গিয়ে রূপমহল হলের সামনে দুপুরবেলায় গিয়ে দেখা সায়গল অভিনীত ‘দেশের মাটি’র ব্যানার, কাকডাকা দুপুরের নির্জলা নিঃসঙ্গতা, নভেলপড়ুয়া বউ-মেয়েদের দুপুর। গৃহকর্মের অবকাশে ভরা সেই সব দুপুরের প্ররোচনাতেই তিনি পড়তে শুরু করেছিলেন বলে? লিখতে শুরু করেছিলেন বলে? কে জানে!

ওঁর আফি কাকা-কাকির (আমার নানা-নানি) মৃত্যুসংবাদ ওঁকে দেওয়া হয়নি শুনেছি, আমেনা খালার মৃত্যুর কথাও জানানো হয়নি, বড় চোট পাবেন মনে—এ বয়সে অত প্রিয় মানুষদের নেই হয়ে যাওয়াটা মানতে কষ্ট হবে বলে ওঁকে বলা হয়নি। রাবেয়া খালার উৎসর্গ করা অজস্র বইসহ সেই দেরাজের সমস্ত বই নানি মারা যাওয়ার আগেই চুরি হয়ে গেছে, সেই ক্ষতির তুলনা নেই। তা রাবেয়া খাতুনের জীবদ্দশাতেই হাসনাহেনার জঙ্গল উজাড় হয়েছে রায়সাহেব বাজারে, কাঁচা গলিগুলো পাকা হয়েছে, নদী পোস্তাবাঁধাই হয়েছে, গুয়ের গাড়ি বিদায় নিয়েছে ঠাটারীবাজার থেকে, দেশভাগ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, সবকিছু নষ্টদের অধিকারেও গেছে। কিন্তু ওই তো বললাম, সংরক্ষণের অভাবে ভরা এই দেশে অতশত অজ্ঞাতনামার ভিড়ে না হারিয়ে গিয়ে একটি প্রগাঢ় নাম হয়ে থাকবার জীবন কাটিয়েছেন রাবেয়া খাতুন, বড় গর্বে সে কথা আজ স্মরণ করছি।
আপনাকে অভিবাদন।


অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

বিজ্ঞাপন
নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন