বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুই

ফরহাদ খান ছিলেন রুচিশীল ব্যতিক্রমী লেখক। তাঁর লেখার বিষয় ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র। তথাকথিত সস্তা ও জনপ্রিয় ধারার লেখক ছিলেন না তিনি, তবে ওই ধারায় লিখলে যে অনেককেই তিনি অতিক্রম করে যেতেন, তা তাঁর রম্যরচনাগুলো পড়লে অনুধাবন করা যায়। ফরহাদ খানের রচনা প্রধানত গবেষণাধর্মী ও তাৎপর্যবাহী। তিনি লিখেছেন কম, তবে প্রতিটি রচনাই তাঁর গভীর জ্ঞান, একান্ত নিষ্ঠা এবং বিস্তৃত পঠন-পাঠনের পরিচয় বহন করছে। এই লেখকের গবেষণাধর্মী বইয়ের মধ্যে আছে প্রতীচ্য পুরাণ (১৯৮৪), শব্দের চালচিত্র (১৯৯৩), বাংলা শব্দের উৎস অভিধান (২০০০), এবং হারিয়ে যাওয়া হরফের কাহিনী (২০০৪)। ফরহাদ খানের প্রতীচ্য পুরাণ একটি বহুল পঠিত গ্রন্থ।

এই বইয়ে প্রতীচ্যের উল্লেখযোগ্য পৌরাণিক চরিত্র ও অনুষঙ্গসমূহ তিনি সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন। শিক্ষার্থীদের কাছে এই বই খুবই প্রয়োজনীয় বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভাষা-গবেষণায় ফরহাদ খানের নিষ্ঠা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। শব্দের চালচিত্র বাংলা শব্দের উৎস অভিধান—এ ধারার দুটি উল্লেখযোগ্য কাজ। অনেক শব্দের উৎস, অর্থগত পরিবর্তন কিংবা প্রয়োগবৈচিত্র্য তিনি এই বই দুটিতে নিপুণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর অনেক ব্যাখ্যা রীতিমতো কৌতূহলোদ্দীপক। যেমন ‘আটঘাট’ শব্দের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফরহাদ খান লিখেছেন:

‘মানুষ অনেক সময়ই আটঘাট বেঁধে কাজে নামে বা আটঘাট বেঁধে কাজ আরম্ভ করে। মানুষ কোমর বেঁধেও কাজে নামে। কিন্তু কোমর বাঁধা এবং আটঘাট বাঁধা এক কথা নয়।

‘মানুষ বেশ কিছু কাজের আগে সতি৵ সতি৵ই কোমর বাঁধে। গামছাটা বেশ কষে আঁটে কোমরে। কিন্তু কখনোই আটঘাট সতি৵ সতি৵ বাঁধে না। সবার পক্ষে আটঘাট বাঁধা সম্ভবও নয়। কারণ, প্রকৃত আটঘাট কেবল বাঁধতে হয় তবলাবাদককে।

‘তবলার এক একটি গুটির ওপর চামড়ার যে দুটি ফিতা বা চ্যাপটা দড়ি থাকে, তার মাঝের অংশকে বলে ঘাট। ঘাট আটটি। তবলা বাজানোর আগে গুটির ওপর হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ঘাট বেঁধে নিতে হয়, নইলে তবলার আওয়াজ ঠিক হয় না।

‘এই যে সাংগীতিক প্রস্তুতি, এটাই তবলার বোল পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে মুখের বুলিতে। যেকোনো কাজ আটঘাট বেঁধে শুরু করাটাই এখন দস্তুরি বা নিয়ম।’

এমনই বহু শব্দের কৌতূলোদ্দীপক ব্যাখ্যা পাঠককে যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি প্রসারিত করে তার জানার পরিধি।

ফরহাদ খানের হারিয়ে যাওয়া হরফের কাহিনী লিপি-বিষয়ক একটি উল্লেখযোগ্য বই। পৃথিবী থেকে যেসব লিপি চিরতরে হারিয়ে গেছে, সেসব লিপির অজানা অনেক তথ্য ও ইতিহাস এ বইয়ে লেখক চমৎকার ভাষায় তুলে ধরেছেন। এ বই ফরহাদ খানকে একজন উঁচু মানের গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ভাষা ও হরফ বিষয়ে যাঁরা উৎসাহী, এ বই তাঁদের কাছে অতিপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়েছে।

বাংলাদেশে রম্যলেখক হিসেবে ফরহাদ খানের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। এ ধারায় তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে একাডেমিক শিরঃপীড়া ব্যুরোপ্যাথি ও অন্যান্য (১৯৮৬), চিত্র-বিচিত্র (২০০০), বাঙালির বিবিধ বিলাস (২০০৭) প্রভৃতি। প্রাত্যহিক জীবনের নানা বিষয়কে এসব গ্রন্থে ফরহাদ খান চিন্তাকর্ষক ভাষায় সরস ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। অনুবাদক হিসেবেও ফরহাদ খান রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। নীল বিদ্রোহ (যৌথ, ১৯৯৫), ব্যরন মুনশাউজেনের রোমাঞ্চকর অভিযান (২০০০)—এসব বই অনুবাদক হিসেবে তাঁর নৈপুণ্যের পরিচয়বাহী। শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি লিখেছেন চমৎকার এক বই—গল্প শুধু গল্প নয় (২০০৭)। ছোটদের অভিধান (যৌথ, ১৯৮৪), সহজ বাংলা অভিধান (১৯৯৪), অমর একুশে বক্তৃতা (যৌথ, ১৯৯৪)—এসব বই সম্পাদক হিসেবে তাঁর নিষ্ঠার পরিচয় বহন করছে।

তিন

ফরহাদ খান গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাংলাদেশে সমধিক পরিচিত। তিনি জার্মানির ডয়চে ভেলেতে সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মোদের গরব মোদের ভাষা’, ‘আবহমান বাংলা’ ও ‘মাতৃভাষা’—এই তিনটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান তিনি উপস্থাপনা করেছেন। এসব অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিষয়ে যেসব কথা তিনি বলেছেন, তা শ্রোতৃমণ্ডলীকে বিশেষভাবে আকষ৴ণ করেছে। ‘মাতৃভাষা’ অনুষ্ঠানটি খুব জনপ্রিয়তা অজ৴ন করেছে। অনুষ্ঠানটি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ধারাবাহিকভাবে ৬০০ পবে৴র বেশি প্রচারিত হয়েছে। বর্তমানেও এটি প্রচারিত হচ্ছে।

ফরহাদ খানের কণ্ঠস্বর ছিল জলদগম্ভীর ও আকর্ষণীয়। বাংলা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ সব অনুষ্ঠান একসময় উপস্থাপন করেছেন। জার্মানি থেকে চলে আসার পরও ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন—কখনো কণ্ঠ দিয়েছেন, কখনো লেখা পাঠিয়েছেন। ফরহাদ খানের টেলিভিশন অনুষ্ঠানসমূহে নিষ্ঠা ও রুচির ছাপ ছিল সুস্পষ্ট। অনুষ্ঠান নিয়ে তিনি ভাবতেন এবং কীভাবে নিজেকে অতিক্রম করা যায়, সে বিষয়ে নিয়ত চিন্তা করতেন।

চার

ফরহাদ খানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৮৫ সালের কোনো এক শীত–সকালে বাংলা একাডেমিতে তিনি আমাকে দেখা করতে বললেন। ‘আবহমান বাংলা’ অনুষ্ঠানে ‘খেয়াঘাট’ বিষয়ে কথা বলতে হবে। টেলিভিশনে সেই আমার যাত্রা শুরু। নিদি৴ষ্ট দিনে হাজির হলাম স্টুডিওতে। অনেক তালিম দিলেন, কিন্তু যখন আরম্ভ হলো অনুষ্ঠান, তখন আমার মনে হলো এ তো শীতকাল নয়, ভরা গ্রীষ্ম। সারা শরীর ঘর্মাক্ত। ফরহাদ খান সাহস দিলেন, স্বাভাবিক করে তুললেন। ‘মাতৃভাষা’ অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ১৫ বছর প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমি কথা বলেছি। অনেক সময়েই ভাষা বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ কথা হতো—কোথাও ঠেকে গেলে তিনি কিংবা আমি পরস্পর কথা বলে নিতাম। শব্দ-ব্যবহারে ফরহাদ খান ছিলেন সতক৴ মানুষ। যথাযথ শব্দটি খুঁজে পেতে তিনি যে কত দিন আমায় ফোন করেছেন, তার কি কোনো হিসাব আছে! আমিও তাঁর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হতাম। ‘মাতৃভাষা’ অনুষ্ঠানে কে কে কথক হিসেবে থাকবেন, অবধারিতভাবে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলে তা নির্ধারণ করতেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিল অনুষ্ঠানটি একটু ভিন্নভাবে বিন্যাস করার। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না।

ফরহাদ খান চলে যাওয়ার দিন সাতেক আগে আমার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। বললেন, ‘এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে এসেছি। তবে আমি বুঝতে পারছি আমার দিন শেষ। ভালো থাকবেন। যদি পারেন “মাতৃভাষা” অনুষ্ঠানটা চালিয়ে যাবেন।’ আমি কোনো কথা বলতে পারিনি। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে যেন শুনতে পাচ্ছিলাম বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি, ‘মাতৃভাষা’কে ভালোবাসার আত্যন্তিক আহ্বান। ফরহাদ ভাই, যেখানেই যান, ভালো থাকবেন আপনি। খুব ভালো। বিদায় ফরহাদ ভাই, বিদায়।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন