কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন দেশের যশস্বী সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত। ‘গণসাহিত্য’, ‘সংবাদ সাময়িকী’ এবং ‘কালি ও কলম’—মিলিয়ে সাহিত্য সম্পাদনার নিজস্ব এক ধারা তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রকাশিত হলো এই লেখা।

শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী ‘কালের ধুলোয় লেখা’ থেকে অংশবিশেষ পড়া যাক:
‘আবুল হাসনাতের অন্য একটি নাম মাহমুদ আল জামান। দ্বিতীয় নামটির আড়ালে রয়েছে একটি কবিসত্তা, যে তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে কিছু কবিতা। তিনি সম্ভবত নিজেকে জোর গলায় একজন কবি বলে দাবি করেন না। তবে আমি তার লেখা যে কটি কবিতা পড়েছি, সেগুলো বলে দেয় মাহমুদ আল জামান প্রকৃত কবি-মনের অধিকারী।’

মাহমুদ আল জামানের কবিতার বই ‘জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক’, ‘কোনো একদিন ভুবনডাঙায়’, ‘ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল’ কিংবা ‘নির্বাচিত কবিতা’র পাতায় চোখ বোলালে শামসুর রাহমানের কথার সত্যতা টের পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে ‘ভুবনডাঙা’ আর ‘সবিতা হালদার’-এর প্রায়শ উপস্থিতি তাঁর দ্বন্দ্বরক্তিম কবিতাজগতের ঘরবারান্দার ইশারাবাহক, যেখানে উষা ও গোধূলি হারিয়েছে তাদের ভেদরেখা। অবসন্ন আলোর ম্রিয়মাণ আভায় কবির কাজ যেন কেবল সংকলন করা সেই সব দৃশ্য, বিনয় মজুমদারের মতে, ‘যারা চিত্রায়িত হতে পারত’। এখানে বলা দরকার, কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে কবিতার অনুবাদও করেছেন মাহমুদ আল জামান। তাঁর অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে পশতু গণমুখী কবিতা।

কবি মাহমুদ আল জামানের সৃজনীসত্তার শক্তিমান প্রকাশ ঘটেছে তাঁর শিশু-কিশোর সাহিত্যেও। ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’, ‘যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুর’, ‘টুকু ও সমুদ্রের গল্প’—এই বইগুলো তো কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের প্রিয় পাঠ্য। ছোটদের জন্য লেখা জীবনী ‘চার্লি চ্যাপলিন’, ‘জসীমউদ্দীন’ বা ‘সূর্য সেন’-এর কথাও বলতে হয় এ প্রসঙ্গে। শিশু-কিশোর সাহিত্যে শেষ পর্যন্ত সক্রিয় থাকলে আমরা তাঁর কাছ থেকে নিঃসন্দেহে পেতে পারতাম আরও উজ্জ্বল শস্যাবলি।

বিজ্ঞাপন

চিত্রসমালোচনা ছিল তাঁর লেখালেখির প্রিয় এলাকা। দুই বাংলার সেরা শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় নৈকট্যের কথা তো সুবিদিত। আবার সে নৈকট্যকে নৈর্ব্যক্তিকতা দিতে তিনি কতটা পারঙ্গম, তা তাঁর লেখা কামরুল হাসান কিংবা কাজী আবদুল বাসেতের শিল্পজীবনী আর ‘জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীন ও অন্যান্য’ বইটির পাঠেই আমরা বুঝতে পারি। চিত্রকলার গভীর পর্যালোচনা আর চিত্র প্রদর্শনীর তাৎক্ষণিক আলোচনা—দুই জায়গাতেই তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ্য।

আবুল হাসনাতের প্রয়াণের পর অনেকেই বলছেন ২০১৯ ও ২০২০ সালে প্রকাশিত বই ‘প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য’ এবং ‘হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে’র মধ্য দিয়ে তাঁর স্মৃতিগদ্য ও আত্মজৈবনিক কথকতার সূত্রপাত, কিন্তু তাঁর ‘সোভিয়েত ভ্রমণ: প্রত্যয়ী নতুন জীবন’ নামের বহু আগে লেখা বইটির কথাও এ ক্ষেত্রে উল্লেখ বাঞ্ছনীয়। ভ্রমণের ভূগোলের সঙ্গে যখন এসে মেশে সাহিত্যের সন্দর্শন, তখন স্মৃতিপাখির ওড়াউড়ি পাঠকের কাছে লেখকের মতোই হয়ে ওঠে সমান উপভোগ্য।

default-image

‘প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য’তে সেকালের শম্ভু মিত্রের চেতনাঢেউ এসে মেশে একালের সন্জীদা খাতুনের সৃজনসৈকতে। এখানে খালেদ চৌধুরীকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আবুল হাসনাত জানাতে ভোলেন না কামরুল হাসানের চিত্রকাজে কী করে মর্মরিত হয়ে উঠেছিল খালেদের কলকাতার বাসগৃহ। আবার মাহমুদুল হক ও হাসান আজিজুল হকের কথাভুবন নিয়ে যেমন তিনি বিস্তার করেন কথামালা, তেমনি সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার জগতেও পড়ে লেখকের অনুসন্ধানী আলো। নৃত্যঝংকারের বুলবুল চৌধুরী, বৃক্ষসখ্যের দ্বিজেন শর্মা, জীবনানন্দ-চর্চার ভূমেন্দ্র গুহ, সাংবাদিকতার হামদি বে, বুদ্ধিবৃত্তিকতার অশোক মিত্র, রেহমান সোবহান ও আহমদ রফিক থেকে ‘ওই দেখা যায় বাড়ি আমার’ নামের স্মৃতিবইয়ের মন্দিরা নন্দী কিংবা ভিন্নতর নন্দনবই ‘আকাশভরা সূর্যতারা’র মতিউর রহমানকে বিশ্লেষণ-সংশ্লেষণে এই বইয়ে পাঠকের সামনে নতুনভাবে হাজির করেন আবুল হাসনাত।

‘হারানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে’ তাঁর অনাম্নী আত্মজীবনী এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সাহিত্যের প্রামাণ্যপঞ্জি। এই বইয়ের সর্বত্র সমষ্টিচেতনার এমন টিপছাপ লক্ষ করব আমরা, যেখানে বৃহৎ মানুষের একটি অনিন্দ্য প্রভাতের তরে নিদারুণ নিশি পার হয়ে আসতে হয়েছে লেখক ও তাঁর সতীর্থদের। একাত্তরে একুশের উত্তাপ, পঁচিশে মার্চের কালরাত, পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতির ভূমিকা, ওয়ারী-যুগিনগর-বনগ্রাম লেনের স্মৃতিঝুরঝুর ধুলাবালু, ক্রিকেটের মাঠ থেকে ছাত্র আন্দোলনের রাজপথ, সংস্কৃতি সংসদের দিনরাত, রুশ বিপ্লবের ৫০ বছর, ‘সংবাদ’-এর বার্তা ও সাহিত্য বিভাগ, লায়লা সামাদ ও নারী সাংবাদিকতা, কাইয়ুম চৌধুরীর অন্তিম মুহূর্ত, সৈয়দ হাসান ইমাম ও ‘রক্তকরবী’ প্রযোজনার ইতিবৃত্ত তাঁর আলোচ্য বইয়ে এসেছে তথ্যপূর্ণ ভাষ্যে, স্মৃতিস্বাদু ভাষায়।

মাহমুদ আল জামানের কবিতার বই ‘জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক’, ‘কোনো একদিন ভুবনডাঙায়’, ‘ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল’ কিংবা ‘নির্বাচিত কবিতা’র পাতায় চোখ বোলালে শামসুর রাহমানের কথার সত্যতা টের পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে ‘ভুবনডাঙা’ আর ‘সবিতা হালদার’-এর প্রায়শ উপস্থিতি তাঁর দ্বন্দ্বরক্তিম কবিতাজগতের ঘরবারান্দার ইশারাবাহক, যেখানে উষা ও গোধূলি হারিয়েছে তাদের ভেদরেখা। অবসন্ন আলোর ম্রিয়মাণ আভায় কবির কাজ যেন কেবল সংকলন করা সেই সব দৃশ্য, বিনয় মজুমদারের মতে, ‘যারা চিত্রায়িত হতে পারত’।

নিজেকে নেপথ্যে রেখে যাপিত শ্রেষ্ঠ সময়কে নিয়ে এসেছেন সামনে; স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ‘আমিবাদী’ সংস্কৃতির উৎপাতের কথা:
‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লক্ষ করি “আমি”র প্রাধান্য। সবই আমি করেছি, আমরা নয়।’

বিজ্ঞাপন

‘সতীনাথ, মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য’ বোধ করি আবুল হাসনাতের একমাত্র সাহিত্যসমালোচনার বই। ‘গণসাহিত্য’, ‘সংবাদ সাময়িকী’ কিংবা সর্বশেষ ‘কালি ও কলম’ সম্পাদনায় তাঁর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য তো বটেই, একই সঙ্গে আলোচনার দাবিদার তাঁর একক ও যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত পঞ্চাশাধিক বই। এর ভেতরে উল্লেখযোগ্য: ‘হৃদয়ে আমার প্যালেস্টাইন’, ‘নানা রবীন্দ্রনাথের মালা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, ‘ঢাকা ১৯৭১’, ‘নারীর কথা’, ‘নভেরা আহমেদ’ ও সর্বশেষ বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘শামসুর রাহমান রচনাবলি’।

তাঁর লেখা ও শারমিন হাসান পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নৃত্যনাট্য ‘লাল গোলাপের জন্য’ ঢাকা ও কলকাতায় পেয়েছে সমান প্রিয়তা। ১৯৭২ সালে এটি কলকাতায় ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী মেলায় পরিবেশিত হয়ে অর্জন করে সেখানকার সুধীজনের আন্তরিক শংসাবচন।

সম্পাদক আবুল হাসনাতের কীর্তিগাথা অনেক তো হলো; এবার একটু না হয় আলোচিত হোন কবি ও বিরল বহুমাত্রিক মাহমুদ আল জামান।

মন্তব্য পড়ুন 0