স্টুডেন্ট ওয়েজ, লিয়াকতউল্লাহ ও স্মৃতি-মধুরিমা

একুশে বইমেলা ২০২১-এর চতুর্থদিনে চলে গেলেন বইয়ের মানুষ মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। দেশের অন্যতম প্রাচীন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান 'স্টুডেন্ট ওয়েজ'-এর প্রকাশক; সাহিত্য ও প্রকাশনা-জগতের সকলের প্রিয় 'লিয়াকত ভাই'। কিশোরবেলায় বেদূইন সামাদের 'বেলাশেষে', সৈয়দ মুজতবা আলীর 'দেশে বিদেশে' কিংবা আনোয়ার পাশার 'রাইফেল রোটি আওরাত' বইয়ের প্রিন্টার্স লাইনে তাঁর নামটা দেখেছি আর সামনাসামনি দেখা সে অনেক পরে। বলা চলে, তাঁর পুত্র মাশফিকউল্লাহ তন্ময়ের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে তাঁর সঙ্গে আলাপ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো রাশভারী বুঝি কিন্তু অন্তরাভায় শুধু সবুজের বিস্তার। পিতা মোহাম্মদ হাবিবউল্লাহর হাতে গড়া ১৯৫০ সালের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন তিনি বহুকাল কিন্তু বনেদিপনার অলীক গাম্ভীর্যের বদলে সবসময় তাঁকে দেখেছি শান্ত, সৌম্য, বিনয়ভূষিত। মোহাম্মদ হাবিবউল্লাহ সাহেবের নামে তাঁদের পারিবারিক বসতি লক্ষ্মীবাজারে একটা রাস্তা আছে আজও, শওকত ওসমানের 'পোর্ট্রেট গ্যালারি' বইয়ে তাঁকে নিয়ে একটা স্মৃতিগদ্য মনে করিয়ে দেয় লেখকের সঙ্গে প্রকাশকের প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক। এসব নিয়ে লিয়াকত আঙ্কেলের সঙ্গে কথা হয়েছে অনেক, বলেছিলাম 'স্টুডেন্ট ওয়েজ' ও তাঁর দেখা প্রকাশনা-জগতের একটি ইতিহাস লিখতে। তবে আত্মপ্রচারণার মহোৎসবের কালে এ বিষয়ে তিনি নিদারুণ অপারগ ছিলেন বলে আগ্রহী কোনো শ্রোতা পেলে শুধু বলে যেতেন প্রকাশনা-জগতের সোনালি সময়ের গল্পগাথা। বাংলাবাজারে 'স্টুডেন্ট ওয়েজ-এর ত্রিতল কার্যালয়ে বসে কত শুনেছি তাঁর কাছে-শহীদ আনোয়ার পাশা, মুহাম্মদ আবদুল হাই, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ শামসুল হক, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আহমেদের কথা। গতবছর 'স্টুডেন্ট ওয়েজ'-এর সত্তর বছর পূর্তির কালে অনেক বলেকয়ে আমি তাঁকে দিয়ে একটি ছোট্ট স্মৃতিকথা লেখাতে সমর্থ হই, যাতে ধরা আছে হারানো দিনের লেখক-প্রকাশক সম্পর্কের অনুপম আখ্যান:

বিজ্ঞাপন

"সেই সময় স্টুডেন্ট ওয়েজ লেখক আসা-যাওয়া করতেন তারা হলেন ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ,মুহাম্মদ আবদুল হাই, আনিসুজ্জামান, শওকত ওসমান,আকবর উদ্দিন,মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, মযহারুল ইসলাম, নীলিমা ইব্রাহিম মোবাশ্বের আলী, সৈয়দ শামসুল হক,হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, সাবের,অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, সেলিনা হোসেন, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শামস রশিদ, বেদুইন সামাদ, ড.মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বেদুইন সামাদ, আহমদ ছফা,শামসুদ্দীন আবুল কালাম, শহীদ আখন্দ,কবি জসীমউদদীন,আকবর হোসেন,মোহাম্মদ নাসির আলী, মইনুল আহসান সাবের, লুৎফর রহমান রিটনসহ আরো অনেকে।

আমার আজও মনে পড়ে আগে যখন হুমায়ূন আহমেদ বাংলাবাজার আসতেন তখন আমাদের এখানেই এসে বসতেন, নানান গল্প করতেন সবচেয়ে। মজার কথা হুমায়ূন আহমেদ আমাকে 'লিয়াকত সাহেব' বলে কথা বলতেন। আমি তাকে বারবার বলেছি আমাকে 'লিয়াকত ভাই' বলবেন কিন্তু তিনি কখনো আমাকে ভাই বলতেন না। শেষের দিকে যখন আসলেন তখন তার সাথে থাকতো সালেহ চৌধুরী বা অন্য কেউ। এসেই বলতেন 'আলমগীরকে খবর দেন। হামিদুল ইসলাম, মনিরুল হক- এদের আসতে বলেন। ' আমাদের এখানে বসেই সবার সাথে গল্প করে কাজের কথা বলতেন। "

'স্টুডেন্ট ওয়েজ' একদিকে যেমন বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী বইয়ের সুনির্বাচিত সংগ্রহ প্রকাশ করেছে তেমনি ১৯৬৮ সালে বৈরী পাকিস্তানি পরিবেশে আনিসুজ্জামান সম্পাদিত 'রবীন্দ্রনাথ' শিরোনামের ঐতিহাসিক সংকলন প্রকাশ করে বাঙালি সংস্কৃতি সুরক্ষার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা পালন করে। সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনাবলি থেকে মুহাম্মদ আবদুল হাইয়ের 'বিলাতে সাড়ে সাতশ দিন', আনোয়ার পাশার 'রাইফেল রোটি আওরাত', আহমদ ছফার 'ওঙ্কার'-এর মতো কালজয়ী বইয়ের প্রকাশক ছিলেন লিয়াকতউল্লাহ কিন্তু একসময় দেখা গেছে প্রকাশনা-জগতের দ্রুত ধাবমান পরিবর্তনের তোড়ে এই প্রকাশনীর বহু বিখ্যাত বই অন্য প্রকাশনীতে স্থানান্তরিত হয়েছে। লিয়াকত আঙ্কেলকে এই নিয়ে কখনও ক্ষুব্ধ বা বিচলিত হতে দেখিনি। মনে হয় তিনি কালের প্রবাহে নিজেকে একজন দ্রষ্টা ছাড়া আর কিছুই ভাবতেন না। তাই বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের সার্বিক উন্নতিতেই আনন্দ পেতেন, 'স্টুডেন্ট ওয়জ'-কে ঘিরে কোনো আত্মপর ভাবনায় তাড়িত ছিলেন না তিনি। তাঁর অকস্মাৎ চলে যাওয়ার পর 'বিদ্যাপ্রকাশ'-এর অগ্রজপ্রতিম প্রকাশক মজিবর রহমান খোকা থেকে তরুণ কবি রাব্বী আহমেদ পর্যন্ত সবার ফেসবুক পোস্টগুলো পড়লেও একই কথা ওঠে এসেছে- এমন হৃদয়বান, সজ্জন, পরহিতব্রতী মানুষ এসময়ে দুর্লভ। পেশাগত কোনো কদর্য প্রতিযোগিতা বা কুৎসায় তাঁকে বিন্দুমাত্র যোগ দিত দেখিনি বরং তিনি লেখকদের ভালমন্দের খোঁজখবর রাখাতে আনন্দ পেতেন। শহীদ আনোয়ার পাশা মরণোত্তর 'স্বাধীনতা পুরস্কার' পেলে তিনি নিজে পুরস্কৃত বোধ করেছেন যেন, মনিরউদ্দীন ইউসুফ বা মোবাশ্বের আলীর বই যেমন প্রকাশ করেছেন তেমনি তাঁদের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করতেও তাঁকে ব্যাকুল দেখেছি, সৈয়দ শামসুল হক চলে গেলে বলেছেন 'লক্ষ্মীবাজারে প্রতিবেশী হিসেবে তাঁর বিয়েতে আমরাও নিমন্ত্রিত ছিলাম', আহমদ ছফাকে নিয়ে যেকোনো জায়গা থেকে নতুন কোনো বই বেরুলে তিনি সংগ্রহ করতেন ও বলতেন 'ছফা ভাইয়ের আরও কতকিছু দেওয়ার ছিল'। ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর নিজের মতো করে বহমানতার সংযোগ সাধন করতে চেয়েছেন তিনি। তাই মোহাম্মদ হাননানের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে আহমাদ মাযহারের অনুবাদে হেমিংওয়ের 'ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী' প্রকাশ করেছেন। প্রকাশনা-জগতে বৈচিত্র্যেও বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। আজকাল তো তারকাদের বই প্রকাশ করে অনেকে তারকা বনে যায়। লিয়াকতউল্লাহ এদের বহু আগেই হানিফ সংকেত, তারানা হালিম, শান্তা ইসলাম-সহ এমন অনেকের বই করেছেন কিন্তু এ নিয়ে কোনো সুযোগ হাসিল করতে চাননি। মনে আছে, একদুপুরে তার সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছি। কেউ এসে বলল, তাঁর প্রকাশনী থেকে বহু আগে বই প্রকাশিত হয়েছিল এমন একজ তারকা এখন প্রভাবশালী মন্ত্রী। লিয়াকত সাহেব যেন যোগাযোগ করেন, তাহলে সুবিধা হতে পারে কোনো। স্মিত হেসে তিনি মৃদুকণ্ঠে বলেলন 'আমি তো একজন লেখকের বই করেছিলাম। মন্ত্রীর নয়।

বিজ্ঞাপন

কী দরকার এইসব যোগাযোগ!'

মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ প্রকাশনা-জগতের কোনো পদপদবীর প্রতি আগ্রহী ছিলেননা। তিনি বরং অলস দুপুরে হাশেম সূফীর মতো গবেষক বন্ধুর সঙ্গে হাকিম হাবিবুর রহমান ও 'ঢাকা পচাশ বরাস পেহলে' নিয়ে আড্ডা দিতে ভালবাসতেন। কয়েকদিন আগেই বললেন জহির রায়হানের কোনো বই প্রকাশ করতে পারেননি কিন্তু তাঁর তৃপ্তি জহিরপুত্র অনল রায়হানের প্রথম বই 'অন্ধকারের কুশীলব'-এর প্রকাশক তিনি। আনিস সিদ্দিকীর অনুবাদে ইরানের সাবেক রাণি সুরাইয়ার আত্মকথা নিয়ে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে এই সেদিন; এইসব আলাপে তাঁকে যতটা উৎসাহী দেখেছি ব্যবসায়িক চিন্তা বা আলোচনায় কখনই তেমনটা দেখিনি। কারণ তাঁর ধাঁতটাই ছিল আলাদা, তিনি মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ।

আমার জন্য ভীষণ কষ্টের বিষয় হল গত ২১ ডিসেম্বর ২০২০ 'স্টুডেন্ট ওয়েজ' প্রকাশিত আমার কবিতাবই 'ধর্মসাগর শহর'-এর প্রকাশনা উৎসব তিনি তাঁর বাংলাবাজার কার্যালয়ে আয়োজন করেছিলেন। সে বিকেলে 'চারুলিপি'-র প্রকাশক হুমায়ুন কবীর, 'অন্বেষা'-এর প্রকাশক শাহাদাত হোসেন, লেখক ও 'অন্বয় প্রকাশ'-এর প্রকাশক হুমায়ুন কবীর ঢালী, 'অক্ষর'-এর প্রকাশক মোহাম্মদ আমিন, 'স্বরবৃত্ত'-এর প্রকাশক রহমতউল্লাহসহ আরও কত লেখক ও প্রকাশকের উপস্থিতিতে তিনি আমাকে অভিনন্দিত করলেন আর এর ঠিক তিন মাস পর ২১শে মার্চ ২০২১ তিনি অনন্তের পথে পাড়ি জমালেন।

১৮ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে 'স্টুডেন্ট ওয়েজ' প্রকাশিত এম আবদুল আলীমের জীবনীগ্রন্থ 'আনিসুজ্জামান'-এর প্রকাশনা উৎসব হল পাঠক সমাবেশ কেন্দ্রে। আনিস স্যারের পুরো পরিবার যোগ দিয়েছিলেন সে উৎসবে। আমিও যোগ দিয়েছিলাম একজন আলোচক হিসেবে। সেদিনও তাঁর বক্তৃতায় লিয়াকতউল্লাহ বলছিলেন,ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ আবদুল হাই, আহমদ শরীফ, সৈয়দ আলী আহসান, আনিসুজ্জামানের মতো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নিবিষ্ট গবেষকদের তিনি কাছ থেকে দেখেছেন, এটা তাঁর সৌভাগ্য।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, হঠাৎ অসুস্থতার অল্পদিনের মাথায় চলেই গেলেন তিনি। 'স্টুডেন্ট ওয়েজ' সত্তর বছর বয়সী প্রতিষ্ঠান, তাঁর বয়সও ছিল তাই। বলতে গেলে, বাবার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান দেখতে দেখতেই বড় হয়েছেন তিনি। একসময় নিজে হাল ধরেছেন, তারপর পুত্র মাশফিকউল্লাহকে অনুপ্রেরণা দিয়ে গড়ে দিয়েছেন ' বর্ষাদুপুর' নামের তারুণ্যদীপ্ত আর একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।

কাল লক্ষ্মীবাজারে শেষযাত্রার হিমগাড়ির সামনে আমাদের বন্ধু মাশফিকউল্লাহ তন্ময়ের হাত ধরে আমি, বন্ধু আনোয়ার, রাজীব মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহর সেই শান্ত, সৌম্য, বিনয়ভূষিত মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকাশনা-ভুবনের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের ইতি ঘটল। অমরলোকে ভাল থাকবেন মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ, আমাদের স্মৃতিতে আপনার আসন শাশ্বত।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন