বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

শাহিদ আনোয়ার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র হোসেনের মতো যেন একটা নতুন দ্বীপের স্বপ্ন দেখেছিল সব সময়। এই স্বপ্নে কোনো খাদ ছিল না। আমরা অনেকই কর্তব্য ও বিবেচনাবোধ থেকে মানুষে মানুষে সমতার কথা ভাবি, ভাবি অসাম্প্রদায়িকতার কথা। কিন্তু শাহিদ আনোয়ারের এই বোধগুলো ছিল সহজাত, অকৃত্রিম এবং অনেকটা প্রকৃতির মতোই। বানানোর কায়দাকৌশল তার জানা ছিল না। এই সব স্বতঃস্ফূর্ত অনুভব থেকে, জীবনের কষ্টদায়ক যাপন থেকে, চারপাশের ঘটনা থেকে, পরিবেশ–প্রতিবেশ থেকে একের পর এক কবিতা উঠে এসেছে তার কলমে। আশির দশকের কোলাহলের ভেতর বঙ্গোপসাগরের তীর থেকে সে অন্য রকম একটা সুর তুলেছিল কবিতায়। সেই সুর সৃষ্টির মুহূর্তগুলোয় খুব কাছাকাছি ছিলাম আমরা।

শৈশবের বন্ধু বলেই তার জীবনের প্রায় প্রতিটি বাঁকে আমার উপস্থিতি ছিল আশ্চর্য নিয়তির মতো। বন্ধুতা আসলে এ রকমই হয়। গাড়ির চাকার মতো, একসঙ্গে সব কটি চলে। আবার একটা অচল হলে অন্য সবও অচল হয়ে যায়। আমরা একজন আরেকজনকে ছাড়া দিনযাপনের কথা কখনো ভাবিনি। একদিন বন্ধুকে না দেখে থাকতে পারতাম না। বিশেষ করে বিশু (বিশ্বজিৎ চৌধুরী) শাহিদ, অজয় (অজয় দাশ গুপ্ত) আর মুসার (আবু মুসা চৌধুরী), উত্তম সেন, সনজীব বড়ুয়া, খালিদ আহসানের সঙ্গে দেখা হতেই হতো।

শাহিদ স্বপ্ন দেখত, একদিন এই পৃথিবীতে সাম্যবাদের বিপ্লব এসে পুঁজিবাদের সব ষড়যন্ত্র, কৌশলকে নস্যাৎ করে দেবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার যুক্তি তার মুখ থেকে উচ্চারিত হতো প্রিয় সব কবিতার মতো, সে মানুষটা নির্বাক হয়ে প্রায় দুবছর পড়ে ছিল হাসপাতালের শয্যায়। মুখ দিয়ে কথা বলতে পারত না। চলচ্ছক্তিহীন নিঃসাড় পড়ে ছিল অভিধানে পড়ে থাকা শব্দের মতো। তার জীবনসঙ্গিনী কবি সেলিনা শেলী সর্বক্ষণ তাকে আগলে রেখেছিল। অসুস্থ কবির পাশে দিনের পর দিন তার রাতজাগা, তার আকুতি, কবিকে সুস্থ করতে তার আপ্রাণ চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাতে চোখ দুটো শাহিদ মুদে ফেলল চিরদিনের মতো। দুই বছর আগে যখন হাসপাতালে গিয়েছিল, ভেবেছিলাম নিশ্চয় ফিরে আসবে সুস্থ হয়ে। এর আগেও তাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে, ফিরে এসে লিখেছিল বুক বিদীর্ণকরা পঙ্‌ক্তি।
‘সিরিঞ্জভরা দুঃখ দিলে হাসপাতালের শুভ্র নার্স
দুঃখ দেওয়ার ভঙ্গিমা তোর
ভুলতে তবু পারব না।
.....
বাঁচতে চাওয়ার প্রার্থনাকে উপড়ে নিলে শুভ্র নার্স
উপড়ে নেওয়ার ভঙ্গিমা তোর
ভুলতে তবু পারব না।’
(নার্স )
শাহিদ কবিতা আর জীবনকে সে সমার্থক করে তুলেছিল। ভাবনার প্রতিটি মুহূর্ত, জীবনের সব ঘটনা তার কবিতায় প্রতিফলিত হতে হতো। বিশেষ করে ‘কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে’র প্রায় সব কবিতা হয়ে উঠেছে তারই জীবনের এক শৈল্পিক ধারাবর্ণনা। তার শৈশব কেটেছে ফিরিঙ্গিবাজারের শতবর্ষী জীর্ণ কবিরাজ ভবনে। কবিরাজ ভবন এখন নেই কিন্তু সেটি বাংলা কবিতার ঐতিহ্য হয়ে ফিরে এসেছে তার কলমে।

শাহিদ স্বপ্ন দেখত, একদিন এই পৃথিবীতে সাম্যবাদের বিপ্লব এসে পুঁজিবাদের সব ষড়যন্ত্র, কৌশলকে নস্যাৎ করে দেবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার যুক্তি তার মুখ থেকে উচ্চারিত হতো প্রিয় সব কবিতার মতো, সে মানুষটা নির্বাক হয়ে প্রায় দুবছর পড়ে ছিল হাসপাতালের শয্যায়। মুখ দিয়ে কথা বলতে পারত না। চলচ্ছক্তিহীন নিঃসাড় পড়ে ছিল অভিধানে পড়ে থাকা শব্দের মতো।
default-image

‘খসে পড়ে পুরোনো পাথর চুন, লোহিত মরিচা
রান্নাঘরে জাগ, থালাবাটি পুরোনো কড়াই
এবড়ো খেবড়ো হয়।
স্থূল ভোঁতা কিছু পাথরের পতন শব্দ শুনে জেগে উঠি শেষ রাত্তিরে
কোন অভাগার মস্তক ফেটে ফের রক্ত গড়ালো
ভাবতে ভাবতে পাশ ফিরে শুই।’
(শ্রী শ্যামাচরণ কবিরাজ ভবন–১)
কবিতার পুরোটাজুড়ে জীর্ণ কবিরাজ ভবনের ছবি। চলচ্চিত্রের মতো এমন অনুপুঙ্খ বর্ণনা অনেক গদ্যের মধ্যেও সচরাচর দেখতে পাই না। নির্লিপ্ত নিরপেক্ষ বর্ণনা পড়তে পড়তে পুরোনো ভবনটির জন্য আমাদের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।
শুধু এই কবিরাজ ভবন নয়, এই ভবনের মানুষগুলোও কবিতায় জায়গা করে নিয়েছে। যে কয়টি বাংলা কবিতা আমার খুব প্রিয়, সেগুলোর মধ্যে শাহিদের ‘প্রতিবেশিনীর জন্য এলিজি’ কবিতাটি অন্যতম।
যখন বাসায় গেলাম
তুমি হাসপাতালে
যখন সমস্ত কেবিন খুঁজে কর্তব্যরত ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করি—
তুমি পরলোকে।
ফের বাসায় গেলাম
তুমি চিতায়
এবং যখন চিতায় গেলাম
তুমি পুড়তে পুড়তে অঙ্গার।
শুধু দুটি পোড়া পায়ের পাতা
দেখতে পেয়েছি
পরক্ষণে
তুমি পা গুটিয়ে নিয়েছ।’
(প্রতিবেশিনীর জন্য এলিজি)
শ্মশানের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন শাহিদের প্রতিবেশী আঁখি দাশগুপ্ত। কিন্তু তিনি বাংলা কবিতায় বেঁচে থাকলেন একজন প্রতিবেশী কবির কল্যাণে। আঁখির সঙ্গে শাহিদ আনোয়ারের কী সম্পর্ক ছিল? সেটার উত্তর আসলে সে নিজেও জানত না।
‘ভালোবাসা বলতে যা বোঝেন বিজ্ঞ লোকেরা
ও রকম কিছুই ছিল না
তবে—
কি যে ছিল
দাঁড়াও আঁখি
আজকের মেঘলা রাতের সাথে
পরামর্শ করি!’
(প্রতিবেশিনীর জন্য এলিজি)
শিক্ষার্থী হিসেবে সে ছিল কৃতী ছাত্র। মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসিতে কুমিল্লা বোর্ডে সে তৃতীয় স্থানে ছিল, এইচএসসি ছিল পঞ্চম স্থানে। আমরা একসঙ্গে চট্টগ্রাম কলেজে পড়েছি। সেই উচ্চমাধ্যমিকের সময় থেকেই শাহিদের লেখালেখি শুরু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ এমএ পাস করেছে, সাংবাদিকতা করেছে, অধ্যাপনা করেছে।

default-image

শাহিদ আনোয়ার মনে করত, নতুন শতাব্দীর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় বিপ্লব হবে। সমাজতন্ত্র কায়েম হবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে। কিন্তু তার আগে আশির দশকের শেষের দিকে আমরা পেরেস্ত্রইকার কথা শুনতে শুরু করি। নব্বই দশকের শুরুর দিকে ১৯৯১ সালে গর্বাচেভ, ইয়েলৎসিনদের হাত ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়। এই ভেঙে পড়াটা আমাদের অনেকের মনকে ভেঙে দিয়েছে। বেশি ভেঙে পড়েছিল বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা কবি শাহিদ আনোয়ার। সেই ভেঙে পড়া মনকে প্রণোদনা দিতে আমি তার কবিতার বই প্রকাশের উদ্যোগ নিই। তার প্রথম কবিতার বই ‘কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে’ আমার সম্পাদিত কবিতার কাগজ ‘মধ্যাহ্ন’র পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়। শাহিদের কবিতার বই চারটি—‘শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে’, ‘কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে’, ‘দাঁড়াও আমার ক্ষতি’ ও ‘বৈদেহী এক ওষ্ঠ পোড়ে’।
‘শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে’ পড়ার পর মনে হয় একটি দীর্ঘ স্বরবৃত্তে লেখা একটি সুদীর্ঘ কবিতা শেষ করলাম। এখানে শিরোনামহীন প্রায় ৫০টি পদ্য আছে। প্রতিটি পদ্যের শুরু ‘শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে’ দিয়ে। স্বরবৃত্তে নৃত্যরত ছন্দের লাগাম ধরতে গভীর ভাববাহী ভারী শব্দের ব্যবহার কবিতাগুলোকে নিয়ে গেছে আমাদের এক অপার্থিব জগতে। সেখানে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা যুবকটি নেই। এ যেন আরেকজন, শুঁড়িখানার নেশার ভেতর প্রেমমগ্ন এক মানুষ।
‘শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে
একটি গোলাপ ফোটে
একটি রেণু গর্ভে আমার
একটি রেণু ঠোঁটে।

একটি রেণু যাচ্ছে উড়ে
কালের বাড়ি পার
পানপাত্রে বাচ্চা বিয়োয়
মাতাল অন্ধকার।’
(শুঁড়িখানার নুড়ির মধ্যে)
শাহিদের কবিতায় বিষয়–বৈচিত্র্য ছিল। বিপ্লবের চেতনার পাশাপাশি প্রেম, চারপাশের মানুষ, প্রকৃতি—কিছুই বাদ যায়নি। তবে সেগুলো ছিল নান্দনিকতার সব শর্ত মেনেই। ছন্দের বন্ধনের ভেতর থেকে তার সীমাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার দারুণ ক্ষমতা তার কবিত্বে। সব রকমের ছন্দের ছকে শব্দ নিয়ে খেলেছে তুখোড় শাহিদ আনোয়ার। আর পদে পদে অন্ত্যমিলের চমক সে সব সময় দিয়েছে। আবার গদ্যেও কবিতাকে নিয়ে গেছে সাবলীলভাবে। কখনো কখনো ছন্দকে ভাঙার সাহসও করেছে। তার ভাবনার সঙ্গে কেউ একমত হোক না হোক, কিন্তু কবিতা হিসেবে সেগুলো শৈল্পিক উৎকর্ষের শীর্ষে উঠে পাঠক অন্য রকম এক অনুভূতির অভিজ্ঞতা পায়।
সে যা বিশ্বাস করে, যা চিন্তা করে, যা ভাবে, তা–ই তার কবিতা। আগেই বলেছি, শাহিদের কবিতা পাহাড়ের বুক চিরে অনায়াসে বেরিয়ে আসা স্বতঃস্ফূর্ত ঝরনার মতো। কারও আদেশে, পরামর্শে, অনুরোধে সে বানিয়ে কবিতা লেখেনি। অকৃত্রিমতা, মৌলিকত্ব তার কবিতার প্রধানতম গুণ। ‘দাঁড়াও আমার ক্ষতি’তে আমরা দেখি ব্যক্তি শাহিদ আনোয়ার যে পিতা হয়ে উঠেছে, তার অপূর্ব বর্ণনা।
‘স্যালাং ট্যানেলের নিকষ অন্ধকারে তাকিয়ে আছি
আমি ও আমার বউ
আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে
ট্যাংকে চড়ে আমাদের শিশু।
গুচ্ছ গুচ্ছ কৃষ্ণচূড়া আমার চারপাশে
উড়ে বেড়াচ্ছে একদল প্রজাপতি ও ঈশ্বরের দূত
তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে আমাদের শিশু।’
(আত্মজ)
শাহিদের সব কবিতার বইয়ের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ‘কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে’। এই বইয়ের কবিতাগুলোর বেশির ভাগ আশির দশকে লেখা। প্রায় সব কটি কবিতার পটভূমির সঙ্গে বন্ধুতার কারণে আমাদের মানসিক সংযোগ ছিল। এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ কবিতাটির শিরোনাম ‘ধাত্রী’। এটি শুধু এই বইয়ের নয়, আশি দশকে রচিত সেরা বাংলা কবিতাগুলোর একটি। এই কবিতায় জন্মের আকাঙ্ক্ষায় আকুল এক শিশুর প্রার্থনা শুনতে পাই, যে কিনা শুনেছিল সূর্য, রাত্রি, বিশ্ব দারুণ সুন্দর। সেই সুন্দর পৃথিবীর আলো সে দেখতে চায়, উৎস থেকে উঠে আসতে চায়, মিথ্যা থেকে উঠে আসতে চায়। মানুষের বেঁচে থাকার যে শাশ্বত আবেদন, মুক্তির যে অনাবিল আনন্দ, তা এই কবিতা পড়ে অনুভব করি আমরা। মানুষের জীবন যে কত প্রেরণার, পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই যে কত সুখের, তা এই কবিতায় এক মানুষের জন্ম নেওয়ার কাতরতা থেকেই আমরা বুঝতে পারি। জীবনকে মাতৃগর্ভ থেকে প্রত্যক্ষ করার এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা শাহিদ আনোয়ার বাংলা কবিতার পাঠকদের দিয়েছে। আসুন, আবার সেই অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করি।
‘কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে
ধাত্রী আমার মুক্ত কখন করবে?
শুনেছিলাম সূর্য দারুণ সুন্দর
শুনেছিলাম রাত্রি দারুণ সুন্দর
শুনেছিলাম তোমার ও–মুখ সুন্দর
বন্ধ চোখের রন্ধ্রে আলো ঝরবে
ধাত্রী আমায় মুক্ত কখন করবে?

জড়িয়ে আছি গর্ভে ফুলে ফুলে
মনোটোনাস রাত্রি ওঠে দুলে
উৎস থেকে আমায় লহো তুলে
স্বপ্ন ছিঁড়ে দোলনা কাছে আনো
ধাত্রী আমার দুহাত ধরে টানো।
(ধাত্রী)
জন্ম নেওয়ার আগে থেকে জীবনকে দেখার এই অপূর্ব কৌশলের কারণে শাহিদ আনোয়ারের কবিতা হয়ে উঠেছে অনন্য। বিষয়ের অভিনবত্ব, ছন্দ, অন্ত্যমিল, শব্দের যথার্থ ও অবিকল্প উচ্চারণ তাঁকে সমসাময়িক অন্য কবিদের তুলনায় অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
শাহিদ আনোয়ার আর কবিতা লিখবে না। সে চলে গেছে জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু এই স্বাভাবিকতা আমরা মেনে নিতে পারছি না। এই স্বাভাবিকতার প্রতিকূলে দাঁড়িয়ে তাঁর কবিতা দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে—আমি ঘৃণা করি...করি...করি এই স্বাভাবিক জীবনাবস্থা।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন