বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা ও সম্পাদনা সব মিলিয়ে রশীদ হায়দার ৭০টির অধিক বই রচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সমাজমনস্কতার জায়গাগুলো ধরে ধরে লিখে রশীদ হায়দার পরিণত হয়েছিলেন শিল্প-সাহিত্যের ভুবনে অন্যতম ব্যক্তিত্বে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সবকিছু মিলিয়ে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব পরিসর। যে পরিসর সমাজ বাস্তবতার প্রতিটি ক্ষেত্রকে আলোকিত করে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করে তিনি যে সাহিত্য রচনা করেছেন, সেগুলো মুক্তিযুদ্ধের অজানা ভুবনকে উন্মোচিত করেছে আমাদের সামনে।

১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পের বই ‘নানকুর বোধি’। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পরই তিনি লিখতে শুরু করেন ‘খাঁচায়’। এ সময় তিনি তাঁর স্ত্রী ঝরার বড় বোনের ২ ধানমন্ডির বাড়িতে বন্দী ছিলেন। পাশেই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানুষের দুরবস্থা, বন্দিজীবন, রাষ্ট্র ও সমাজের চালচিত্র, মুক্তিযুদ্ধের চিত্রমালা নানা অভিধায় ও নানা কথামালায় বর্ণিত এবং চিত্রিত হয়েছে ‘খাঁচায়’ উপন্যাসে। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় স্বাধীনতার পর। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি লিখেছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন: একাত্তর’, সম্পাদনা করেছেন ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ’, ‘স্মৃতি: ৭১ (১৩ খণ্ড )’, ‘১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা’, কিশোর উপন্যাস ‘শোভনের স্বাধীনতা’, ‘যুদ্ধ ও জীবন’ ইত্যাদি।

আত্মজীবনী কিংবা স্মৃতিকথা লেখেননি রশীদ হায়দার, তবে ‘এবেলা ওবেলা’, ‘স্মৃতির দখিন দুয়ার’ ও ‘আমার স্কুল’ বইয়ে মেলে ধরেছেন নিজের রূপ–ছবিময় শৈশব-কৈশোর।

কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দায় গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের পাশাপাশি সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের নাট্যাঙ্গনকেও। সদ্য স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে নাটকের ধারা সম্প্রসারণ করার জন্য তিনি রচনা করেছেন বহু নাটক। তাঁর রচিত নাটকে উঠে এসেছে মানুষ ও মানবতার কথা। তিনি নিজেও মঞ্চে অভিনয় করেছেন। ছাত্রজীবনের শেষে কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি নাট্যজগতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রত্যক্ষভাবে। জনপ্রিয় নাটক ‘তৈল সংকট’–এর নাট্যরূপ দিয়েছেন তিনি।

রশীদ হায়দার ফ্রানৎস কাফকার উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছেন। ২০১৩ সালে ভারত থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর গল্প সংকলন ‘বৃহন্নলা ও অন্যান্য গল্প’। সংকলনটি প্রথম পর্যায়ে ভারতের ৮টি ভাষায় প্রকাশিত এবং পরবর্তীকালে ১৬টি ভাষায় অনূদিত হয়। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০১৪), হুমায়ুন কাদির পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

এই লেখকের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা, কোনো এক বইমেলায়। তবে তিনি আমাকে চিনতেন ২০১০ সালে আমার প্রথম বই ‘আমার মেয়ে: আত্মজার সাথে কথোপকথন’ প্রকাশের পর। তিনি বলেছিলেন, প্রথমত নামের কারণেই বইটি খুলে দেখেন। প্রথম বইটি প্রকাশের পর আমার ইচ্ছা ছিল আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করার। আমার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার অনুপ্রেরণা ছিলেন রশীদ হায়দার। কেননা, তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘স্মৃতি: ১৯৭১’–এর প্রতিটি খণ্ডে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনন্য ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে।

রশীদ হায়দারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ফুলার রোডের বাসায়। তখন তিনি মাত্রই হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন। হুইল চেয়ারে বসে ছিলেন। সেদিন অনেক কথা হলো তাঁর সঙ্গে। তবে সেদিন তাঁর সেই পরিচিত হাসিটা ছিল না। চেহারাটা ছিল বিবর্ণ, চোখেমুখে ছিল ক্লান্তির ছাপ। শারীরিকভাবে তখনো তিনি খুব দুর্বল। এরপর দেশে এল করোনা। ফলে ঘরবন্দী হয়ে পড়লাম আমরা সবাই। এর মধ্যে গেল বছরের ১৩ অক্টোবর তিনিও চলে গেলেন। তাঁর মৃত্যুতে মমতাময় একটি আশ্রয় হারালাম আমি। যদিও তিনি চলে গেছেন, তবু তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের মধ্যে। জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন