বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জেনিফার এবারহার্ড তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবচেতন পক্ষপাতের ওপর গবেষণা করছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, সামাজিক অবস্থা মস্তিষ্কের কাজের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে অন্যদের প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করে। আমরা যদি সব সময় রিসেপশনিস্ট হিসেবে নারীদের এবং প্রকৌশলী হিসেবে পুরুষদের দেখি, তাহলে নারী ও পুরুষের এ ভূমিকাতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠব।

অবচেতন পক্ষপাতের একটি সাধারণ প্রকাশ হলো ‘অ্যাফিনিটি বায়াস’, যার কারণে আমরা নিজের মতো কাউকে বেশি পছন্দ করি। সাধারণত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মানুষ বিচার করে যে কেউ তাদের মতো কি না। নিজের ‘দলের’ মানুষকে পছন্দ করা স্বাভাবিক প্রবণতা। এ জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষেরা পুরুষদের এবং নারীরা নারীদের পক্ষ নেন। আবার কখনো মানুষ নিজের দল ছেড়ে শক্তিশালী দলের অংশ হতে চান। এ কারণে যে কেউ নারী বা পুরুষের পক্ষে থাকতে পারে। কর্মী নিয়োগ এবং পদোন্নতির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের কারণে কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, বৈচিত্র্য, সৃজনশীলতা ইত্যাদি কমে যায়।

বাংলাদেশের সমাজে বিভিন্ন ধরনের অবচেতন পক্ষপাত প্রতিনিয়ত দেখা যায়। মানুষকে তাদের বয়স, লিঙ্গ, গায়ের রং, উচ্চতা, ওজন, ধর্ম, বৈবাহিক অবস্থা ইত্যাদি দিয়ে বিচার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের অসংবেদনশীল কৌতুক ও মন্তব্য খুবই সাধারণ।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেউ এ ধরনের আচরণের শিকার হলে বুঝতে পারেন, কিন্তু অবচেতনে তিনি নিজেই অন্য কারও সঙ্গে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে ফেলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন নারী হয়তো লিঙ্গবিদ্বেষী মন্তব্যে খুব বিরক্ত হন, কিন্তু তিনি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। অবচেতন পক্ষপাতের কারণে অসংখ্য মানুষ বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। যাঁরা এর শিকার হচ্ছেন তাঁদের মানসিক চাপ বাড়ে, নানা ধরনের ক্ষতি হয়। গায়ের রং বা অন্য কোনো কারণে শৈশবে নেতিবাচক মন্তব্যের জন্য আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে, যার প্রভাব পরিণত বয়সেও থেকে যেতে পারে। যে ভঙ্গিতে কথা বললে কর্মক্ষেত্রে নারীদের ‘আক্রমণাত্মক’ বলে মনে করা হয়, ঠিক সেই একই কারণে পুরুষ কর্মীরা নেতৃত্বের গুণাবলির জন্য প্রশংসিত হন। এর ফলে নারীদের পেশাগত সাফল্য অর্জনে বাধার মুখোমুখি হতে হয়। এমন অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়।

বাংলাদেশের সমাজে বিভিন্ন ধরনের অবচেতন পক্ষপাত প্রতিনিয়ত দেখা যায়। মানুষকে তাদের বয়স, লিঙ্গ, গায়ের রং, উচ্চতা, ওজন, ধর্ম, বৈবাহিক অবস্থা ইত্যাদি দিয়ে বিচার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের অসংবেদনশীল কৌতুক ও মন্তব্য খুবই সাধারণ।

যদি আমরা দ্রুত সচেতন হয়ে পদক্ষেপ না নিই, তাহলে অবচেতন পক্ষপাত ভবিষ্যতেও নানা ধরনের বৈষম্য বাড়িয়ে দেবে। অধ্যাপক জিনা নেফ (অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে পক্ষপাত এবং শক্তির ভারসাম্য নিয়ে কাজ করছেন। ‘অ্যালেক্সা—ডাস এ আই হ্যাভ জেন্ডার’-এ তিনি বলেন, অ্যালেক্সা-আমাজনের শব্দনিয়ন্ত্রিত ঘরের কাজে সাহায্যকারী একজন নারী। যখন শিশু এবং বড়রা অ্যালেক্সাকে চিৎকার করে নির্দেশ দেয়, তখন কোন বার্তা আমরা দিচ্ছি? আমরা কি মনে মনে নারীদের সঙ্গে এমন আচরণই করতে চাই?

আইন বা ফিন্যান্সের ক্ষেত্রে সহকারীকে পুরুষ হিসেবে কোট করা হয়; এতে কর্তৃত্ব ও পেশাদারত্বের বিষয়টি জড়িত। আসলে যাঁরা এসব উদ্ভাবন করছেন, তাঁদের পক্ষপাত যত দিন থাকবে, তত দিন এ ধরনের বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। এ জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ সব ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের একটি দল থাকতে হবে, যারা পরিকল্পনার সময় থেকেই পক্ষপাতহীন হওয়া নিশ্চিত করবে। পক্ষপাত নির্মূলে আন্তরিক না হলে মানুষ মঙ্গল গ্রহে গিয়েও বর্তমান বিশ্বের মতোই অন্যায্য এবং বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

অবচেতন পক্ষপাত মোকাবিলায় প্রথম ধাপটি হলো আমাদের নিজেদের পক্ষপাতিত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া। আমরা ধরে নিই যে বেশি বয়সের কর্মী মাত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহারে অদক্ষ, অথবা সব কিশোর-কিশোরী অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। যখন কেউ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন, তখন কি আমরা হাসাহাসি করি? এ মানসিকতা, আচরণসহ সব ধরনের পক্ষপাত নিয়ে নিজেদের চ্যালেঞ্জ করতে হবে।

প্রার্থীদের সাক্ষাৎকারের সময় প্যানেলের সদস্যরা পরস্পরের গৎবাঁধা ধারণা নিয়ে প্রশ্ন করলে এবং অবচেতন পক্ষপাতের জন্য একে অপরকে সতর্ক করে দিলে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য কিছুটা কমবে। আমরা নিজ পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক জীবনে অবমাননাকর কৌতুক, মন্তব্য এবং আচরণের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি। সমাজের সবার অধিকার অর্জনের জন্য কাজ করা প্রয়োজন। তার পাশাপাশি প্রত্যেকের অবচেতন পক্ষপাত এবং বৈষম্যমূলক আচরণ বদলানোও জরুরি। তাহলে হয়তো আমাদের সমাজ একদিন সবার জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।

লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন