গত ২৪ জানুয়ারি প্রথম আলোয় একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ‘আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা: মূলধারায়ণের কৌশল’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের ওপর। উদ্যোক্তাদের সাধুবাদ জানাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে সে আলোচনা জনসমক্ষে নিয়ে আসার জন্য।

তবে আলোচনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ক্রোড়পত্রে যে আকারে পরিবেশিত হয়েছে, তাতে অংশগ্রহণকারীদের একজন হিসেবে আমি দুটি কথা বলার তাগিদ বোধ করছি। কারণ, আমার বক্তব্য যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে আমার কিছু কথার প্রেক্ষিত ও অর্থ বদলে গেছে, অন্যদিকে আমার ওঠানো কিছু প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ একেবারে বাদ পড়ে গেছে। যেমন ক্রোড়পত্রে আমার বক্তব্য হিসেবে যা লেখা হয়েছে, তার শুরুর কথাটা ‘শব্দের রাজনীতিতে আদিবাসীরা পিছিয়ে আছে’ আদৌ বলেছিলাম বলে মনে পড়ে না।

আবার যেসব কথা বলেছিলাম, কিন্তু ক্রোড়পত্রে আসেনি, সেগুলোর মধ্যে একটির মূল বক্তব্য ছিল এ রকম: যেভাবে ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা’র ধারণা বাস্তবায়নের কথা সরকারিভাবে ভাবা হচ্ছে (যেমন প্রথম দফায় কার্যক্রমের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা পাঁচ থেকে ছয়টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে), তাতে প্রান্তিকতম জনগোষ্ঠীগুলো যথারীতি অগ্রাধিকারবঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। অথচ ‘আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা’র ধারণাকে দেখা হচ্ছে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষেত্রে ভাষাগত ও আর্থসামাজিক প্রান্তিকতার কারণে বাদ পড়া শিশুদের মূলধারার কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসার একটি পন্থা হিসেবে।

এমন পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন সামনে চলে আসে। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে এখানে সংক্ষেপে এটুকুই বলব যে আদিবাসী শিশুদের জন্য যখন আমরা ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা’র কথা বলি, সেখানে মূল লক্ষ্য কী, তা অর্জনের কার্যকর পন্থা কী হতে পারে, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার স্বচ্ছ ধারণা থাকা অত্যাবশ্যক। এই মুহূর্তে তা যে নেই, তার একটা বড় প্রমাণ হলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিরাজমান কিছু শূন্যতা ও অসংগতি যেমন বাংলা ছাড়া অন্যান্য ভাষার অস্তিত্ব সম্পর্কে সংবিধানের নীরবতা; জাতীয় শিক্ষানীতিতে আদিবাসী শিশুদের জন্য ‘মাতৃভাষা শেখা’র ব্যবস্থা করা হবে, এমন কথা থাকা। আমার বক্তব্যে আমি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এসব সমস্যার প্রতিই বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এ প্রসঙ্গে ক্রোড়পত্রে আমার কথা হিসেবে যা লেখা হয়েছে, তা কিছুটা খণ্ডিত ও বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে। যেমন, আমি নাকি বলেছিলাম, ‘শিক্ষানীতিতে আদিবাসী শব্দটি ছিল। কিন্তু সংবিধানে যেহেতু নেই, তাই শব্দটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীতে পরিণত হলো। মৌলিক এ জায়গা ঠিক না করে আমরা যত কিছু করি, তার যোগফল হবে শূন্য।’ এই উদ্ধৃতি পড়লে মনে হবে, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দের থাকা না-থাকার ওপরই আমি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলাম। আসলে আমার বক্তব্য মোটেও তা ছিল না। বরং যে বিষয়টার প্রতি আমি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলাম, তা হলো, আদিবাসী শিশুদের জন্য ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা’র ব্যবস্থা জাতীয় শিক্ষানীতিতে রাখা হয়েছে, এমনটা অনেকে ধরে নিলেও এ অনুমানের ভিত্তি মোটেও সুদৃঢ় নয়।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে একাধিক জায়গায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, আদিবাসী শিশুদের জন্য ‘মাতৃভাষা শিক্ষা’র ব্যবস্থা করা হবে। কথাটা একটু খেয়াল করে পড়ুন, ‘মাতৃভাষা শিক্ষা’, ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা’ নয়।

আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন, এমন অনেকে ‘আদিবাসী’ শব্দটির উপস্থিতি দেখেই জাতীয় শিক্ষানীতিকে স্বাগত জানালেও এই সূক্ষ্ম বিষয়টি খেয়াল করেননি, বা খেয়াল করলেও এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। অনেকেই অন্তস্থ-য়’র অনুপস্থিতিকে স্রেফ ছাপার ভুল বলেই ধরে নিয়েছিলেন হয়তো বা, যে ধরনের কথা ডিসেম্বর ২১-এর গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত একাধিক অংশগ্রহণকারীও বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টা যে তা নয়, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হয়েছি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে। আর ২০১২ সালে যে খসড়া শিক্ষা আইন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতেও ‘মাতৃভাষা শিক্ষা’ কথাটাই বলা হয়েছে।

অন্যদিকে মাঝখানে যেহেতু ‘আদিবাসী’ শব্দটা সরকারি মহলে অপাঙেক্তয় হয়ে পড়েছিল, যা বিভিন্ন পর্যায়ের প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ২০১১ সালের সংশোধিত সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি শেষ পর্যন্ত, ২০১১ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ‘আদিবাসী’ শব্দটি থাকলেও তার আদলে প্রণীত শিক্ষা আইনে এটি আর জায়গা পায়নি। সেভ দ্য চিলড্রেনের সহযোগিতায় প্রথম আলো যে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছিল, সেটির শিরোনামে ‘আদিবাসী’ শব্দ বা ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা’ কথাগুলো ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সংবিধান ও জাতীয় নীতির মতো মৌলিক জায়গায়
যে গলদ রয়ে গেছে, তা আমাদের বিস্মৃত হলে চলবে না। তা ছাড়া বৈদেশিক সহায়তানির্ভর বিভিন্ন জাতীয় শিক্ষা প্রকল্পে ‘আদিবাসী’সহ বিভিন্ন বর্গের প্রান্তিক শিশুদের প্রতি কাগজে-কলমে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়ে আসছে বহু আগে থেকেই, কিন্তু তা করা হয়েছে মূলত দাতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য, জাতীয়ভাবে উৎসারিত কোনো স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদ থেকে নয়। তাই এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি খুব একটা দেখা যায়নি এযাবৎ।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার বক্তব্যে আমি এ কথাও যোগ করেছিলাম যে দাতাদের অর্থায়নে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ না হয়ে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার উদ্যোগ সাংবিধানিকভাবেই হওয়া উচিত। আশা করি, এমন মৌলিক বিষয়ের প্রতি সংশ্লিষ্ট সবাই যথাযথ মনোযোগ দেবেন।

প্রশান্ত ত্রিপুরা: মুক্ত গবেষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন