বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মোটামুটি সাজানো-গোছানো একটা পরিবেশ। পাহাড়ের ঢালে বসার জন্য বেঞ্চি, ফুটপাতের পাশের রেলিংঘেরা ওয়াকওয়ে, আর আছে একটি মুক্তমঞ্চ।

পয়লা বৈশাখ, পয়লা ফাল্গুন বা রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তীর মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এই মঞ্চ সরব ও প্রাণবন্ত করে তোলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। ২০১২ সালে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিআরবি এলাকাকে আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। না দেখুক, তাতে আমাদের কোনো ক্ষোভ-দুঃখ নেই। বরং আমাদের অবস্থা এখন ‘ভিক্ষা চাই না কুত্তা সামলা’র মতো।

পাহাড় কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানা পরিশোধ করে এই শহরে কী পরিমাণ বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, তা আমরা অসহায়ের মতো প্রত্যক্ষ করেছি। সিআরবি এলাকাতেও যেকোনো অবকাঠামো গড়ে তুলতে হলে কয়েক শ প্রাচীন বৃক্ষ যে ধুলায় লুটাবে, এটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।

সম্প্রতি এই সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে এখানে পাঁচ শ শয্যার হাসপাতাল ও এক শ আসনের মেডিকেল কলেজ নির্মাণের সব আয়োজন ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ ইউনাইটেড হাসপাতালের সঙ্গে রেলওয়ের সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এখন চলছে নির্মাণযজ্ঞের প্রস্তুতি। চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক, পরিবেশবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীরা এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে নানা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এমনকি রেলওয়ের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও চান না এখানে হাসপাতালটি হোক। প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ব্যবস্থাপক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে শ্রমিক লীগসহ রেলসংশ্লিষ্ট অন্য সংগঠনগুলো। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গোঁ ধরেই আছে।

এই হাসপাতাল প্রকল্পের পরিচালক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী পত্রিকান্তরে জানিয়েছেন, ‘হাসপাতাল নির্মাণ হলে পরিবেশের কী ক্ষতি হতে পারে এই বিষয়টি যাচাই করার জন্য পরামর্শক নিয়োগ করেছে ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ।’ অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানকে জমি লিজ দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানই দায়িত্ব পেয়েছে পরামর্শক নিয়োগের। ‘পরামর্শ’ কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা তো সহজেই অনুমেয়।

পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। পাহাড় কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানা পরিশোধ করে এই শহরে কী পরিমাণ বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, তা আমরা অসহায়ের মতো প্রত্যক্ষ করেছি। সিআরবি এলাকাতেও যেকোনো অবকাঠামো গড়ে তুলতে হলে কয়েক শ প্রাচীন বৃক্ষ যে ধুলায় লুটাবে, এটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।

default-image

বেশ কিছুকাল ধরেই দেখছি, চট্টগ্রাম শহরের কোথাও কোনো ফাঁকা জায়গা দেখলেই কোনো না কোনো কর্তৃপক্ষের (সিটি করপোরেশন, সিডিএ, জেলা প্রশাসন, রেলওয়ে, সেনাবাহিনী) তৎপরতা শুরু হয়ে যায় সেটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার উপায় সন্ধানে। অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক, কিন্তু সেটা কি মানুষের নিশ্বাসের চেয়েও মূল্যবান?

নগরবাসীর সুখ ও স্বস্তি কীভাবে হরণ করেছে আমাদের বিভিন্ন সেবা সংস্থা, তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না। সার্কিট হাউসের পাশে খোলা উদ্যানটিতে আগে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে বসে অবকাশ যাপন করত সাধারণ মানুষ, সেখানে অত্যন্ত নিম্নমানের একটি শিশুপার্ক তৈরি করে বন্ধ করা হয়েছে মানুষের যাতায়াত। ষোলশহর বিপ্লব উদ্যানে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে তৈরি করা হয়েছে দোকানপাটের জঞ্জাল, আউটার স্টেডিয়ামের প্রায় অর্ধেক অংশজুড়ে সুইমিংপুল তৈরি করে সংকুচিত করা হয়েছে নান্নু-আকরাম-তামিম ইকবালের মতো খেলোয়াড়দের শৈশবের খেলার মাঠটি, সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত বিভাগের টানাপোড়েনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে জাতিসংঘ পার্ক, ডিসি হিল পার্কে এখনো লোকজন প্রবেশ করতে পারেন বটে, কিন্তু সেখানেও ডিসি সাহেবের ‘নিরাপত্তা’র স্বার্থে পদে পদে বাধা।

চট্টগ্রাম শহরের অদূরে কুমিরায় রেলওয়ের একটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। হাসপাতাল ও এর আশপাশে আছে প্রায় ১০ একর জমি। ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রকল্পটি সেখানে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

এই শহরের মানুষ একটু নিশ্বাস নিতে কোথায় যেতে পারেন, তার উত্তর দেবে কোন কর্তৃপক্ষ? এই হাহাকারের মধ্যেই যখন নতুন করে প্রকৃতি নিধন আর ইট-কাঠ-পাথরের স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ-আয়োজন শুরু হয়, তখন মানুষ তো উদ্বিগ্ন হবেই।

হাসপাতালের প্রয়োজন অস্বীকার করি না। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিত্সা ব্যয় সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব কি না, এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না খুঁজে যদি ধরে নিই, এতে অন্তত সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে, তাহলেও ইউনাইটেড হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কিন্তু স্থান নির্ধারণ নিয়ে আমাদের আপত্তি। কারণ, তথাকথিত ব্যবসাবান্ধব ও উন্নয়নকবলিত এই শহরে আমরা নিশ্বাস নিতে পারছি না।

সিআরবিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আপত্তি শুধু নয়, এর বিকল্পের সন্ধানও দিয়েছেন রেলওয়ে শ্রমিক লীগসহ স্মারকলিপি প্রদানকারী সংগঠনের নেতারা। তাঁরা বলেছেন, চট্টগ্রাম শহরের অদূরে কুমিরায় রেলওয়ের একটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। হাসপাতাল ও এর আশপাশে আছে প্রায় ১০ একর জমি। ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রকল্পটি সেখানে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিকের আপত্তি উপেক্ষা করে সিআরবিতেই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অনড় থাকলে খুব স্বাভাবিকভাবে এ সংশয় জাগবে যে শহরের কেন্দ্রস্থলে নামমাত্র মূল্যে ছয় একর জমি ৫০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা মহলের আর্থিক লাভালাভের বিষয়টি সম্পর্কিত কি না।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক, কবি ও সাহিত্যিক

[email protected]

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন