কর্মপরিবেশ

আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে

বিজ্ঞাপন
default-image

এক বছর আগে এই দিনে এ জাতি এবং বিশ্বের ওপর এক ভয়ংকর আঘাত এসেছিল। এক বছর আগে এ দিনে, রানা প্লাজা ভেঙে পড়েছিল এবং সে সঙ্গে হাজারেরও বেশি সুন্দর জীবন ও পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সুনাম এতে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; বিশ্ব দেখেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা-ঝুঁকির বিনিময়ে শুধু মুনাফা অর্জন করে তখন কী ঘটে।
আমার মা বলেন, ‘জীবনের অন্ধকারতম দুঃসময়েরও রুপোলি রেখা থাকে।’ আমি বিশ্বাস করি, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা এমনই একটি ধ্বংসযজ্ঞ, যা থেকে উঠে এসেছে পরিবর্তনের জ্বলন্ত অঙ্গীকার। বাস্তবিকই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে রূপান্তর, এর অগ্নিনিরাপত্তা, কারখানার কাঠামোগত মান উন্নয়ন ও শক্তিশালী করা এবং শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে যোগাযোগ ও সংগঠনের অধিকারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ, তবে এই মানসমূহ অর্জনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
আজকে আমরা গভীর হূদয়ে এক বছর আগের কালো দিবসটিকে স্মরণ করছি, যেদিনটি ১১৩৫ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ভয়াবহভাবে জখম ও আহত হয়েছেন আরও কয়েক শতাধিক, এ ঘটনায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অনেক পরিবার। আজকে, এ ধরনের দুর্ঘটনা যেন আবার না ঘটে সে ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে আসুন আমরা এসব ভুক্তভোগীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে গভীর ও মৌলিক পরিবর্তনের জন্য রানা প্লাজা দুর্ঘটনা একটি অত্যন্ত জোরালো ডাক। এই পরিবর্তনের ডাকের প্রতিক্রিয়ায় গত বছর অনেক কিছুই ঘটেছে। এই পরিবর্তন হচ্ছে বাংলাদেশের সঠিক পথে চলা, যার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, গতিশীল ও লাভজনক তৈরি পোশাকশিল্প গড়ে তোলা। যেখানে শ্রমিকেরা প্রাপ্য মজুরি ও যথার্থ সুযোগ-সুবিধা পাবেন এবং কর্মস্থলে দুর্ঘটনা রোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে কথা বলতে পারবেন।
কারখানার মালিক, শ্রমিক, ব্র্যান্ড, সরকার, ক্রেতা, নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বন্ধুরা—আমরা সবাই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অংশীদার। আমরা সবাই মিলে তৈরি পোশাকশিল্পের রূপান্তরে সহায়তা করতে পারি। আমেরিকাসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের রূপান্তরের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের জিএসপি-সুবিধা স্থগিত হওয়ার পর আমেরিকা বাংলাদেশকে একটি রোডম্যাপ দিয়েছে, যাতে সুবিধাগুলো পুনরুদ্ধার করা যায়, যার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের রূপান্তর অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ এবং এর দুই বৃহৎ পোশাক বাজার আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘সাস্টেইন্যাবিলিটি কমপ্যাক্ট’ গ্রহণ করেছে, যা শ্রমিক অধিকার, অগ্নিনিরাপত্তা এবং কারখানার কাঠামোগত দৃঢ়তার মূল পদক্ষেপগুলো চিহ্নিত করবে। জিএসপি-সুবিধা পুনরুদ্ধারে ‘কমপ্যাক্ট’ নিবিড়ভাবে রোডম্যাপ অনুসরণ করে। আমেরিকা ও বাংলাদেশের আরও অনেক বন্ধু কানাডা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য এবং অন্যরা পোশাকশিল্পের সত্যিকারের রূপান্তরে বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সম্পদ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে চেয়েছে।
প্রথমবারের মতো অনেক পশ্চিমা ব্র্যান্ড এবং ক্রেতা অ্যালায়েন্স ও অ্যাকর্ড নিরাপত্তার ঝুঁকি চিহ্নিত করতে উৎস কারখানাগুলোতে সর্বাত্মক নিরাপত্তা পরিদর্শনের জন্য বেসরকারি খাতের উদ্যোগে একত্র হয়েছে। এ ছাড়া ক্রেতারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে সহজলভ্য তহবিল গঠনে অথবা সহজ কিস্তিতে ঋণ প্রদানে, যাতে পোশাক প্রস্তুতকারীরা সংশোধনমূলক কাজের মাধ্যমে তাঁদের কারখানাকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানে উন্নীত করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সেসব কারখানায় পরিদর্শন-সহায়তা দিচ্ছে যেগুলো অ্যালায়েন্স অথবা অ্যাকর্ড পরিদর্শন করছে না। এসব পরিদর্শনের ফল নতুনভাবে শুরু হওয়া জনগণের কাছে উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে প্রকাশ করা হবে। আইএলও জরুরি কারিগরি উপদেশ প্রদান এবং সমন্বয় সাধন করছে, যাতে সব অংশীদারের অংশগ্রহণে সংগতিপূর্ণ প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন আনা যায়। শত শত কারখানার নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকারের

মান অর্জনে সহায়তা করতে আইএলও ইতিহাসে বৃহত্তম ‘বেটার ওয়ার্ক’ কর্মসূচিও শুরু করেছে। কিছু কারখানার মালিক গঠনমূলকভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে কীভাবে তাঁদের কারখানাগুলোকে মানসম্পন্ন করা যায় সে ব্যাপারে পথ দেখাচ্ছে; দুর্ভাগ্যজনকভাবে অন্য মালিকেরা মনে হচ্ছে এই দায়িত্ব এড়াতে বদ্ধপরিকর।
শ্রমিকেরা স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করছেন নিশ্চিত করতে, অর্থাৎ শ্রমিকেরা যেন এই খাতের বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের মতামত রাখতে পারেন। শ্রমিকদের অবশ্যই তাঁদের মৌলিক অধিকার স্বাধীন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, ইউনিয়ন গঠন, সম্মিলিত দর-কষাকষির চর্চা করার অধিকার থাকতে হবে। সত্যিকারের শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন ও আইনি শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব অপরিহার্য, যাতে শ্রমিকেরা শক্তিশালীভাবে সোচ্চার হয়ে অনিরাপদ কর্মপরিবেশকে পরিহার নিশ্চিত করতে পারেন। রানা প্লাজার শ্রমিকদের এমন জোরালো কণ্ঠস্বর থাকলে তাঁরা আজকে জীবিত থাকতেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্ব প্রদান করেছে, যা এরই মধ্যে পোশাক খাতে পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আজকে আমরা রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ভুক্তভোগীদের সম্মানার্থে আবার সংকল্প করছি সাহায্য করতে এবং নিশ্চিত করতে যাতে আর একটি রানা প্লাজা আর কখনোই না হয়।
আমরা চেষ্টা করছি রূপান্তরিত তৈরি পোশাক খাত রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে আসবে। আমরা সমর্থন করছি এই খাতের রূপান্তরে, যাতে কারখানাগুলো অগ্নিনিরাপত্তা, কারখানার কাঠামোগত দৃঢ়তা ও শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠন করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে পারে। এটিই একমাত্র পথ, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে যে ব্র্যান্ড বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে একটি মানসম্মত ব্র্যান্ড, একটি পছন্দের ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত হবে। এটিই বাংলাদেশের জন্য বিশ্বের এক নম্বর তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক হওয়ার স্বপ্নপূরণে একমাত্র পথ।

ড্যান মজীনা: বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন