আর কত রেশমার মৃত্যুর পর সাইকেল লেন হবে?

বিজ্ঞাপন
default-image

চন্দ্রিমা উদ্যানে ঢোকার রাস্তাটায় উল্টে পড়ে আছে সাদা–গোলাপি রঙের একটা সাইকেল। পেছনের চাকা দুমড়ানো। সামনের ঝুড়িতে এক জোড়া কেডস জুতা। পাশেই ছোপ ছোপ কালো রক্তের দাগ। গতকাল শুক্রবার সকালেই একটি স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে এখানে। যে স্বপ্ন দৌড়ে বের হতো হাতিরঝিলের রাস্তায়, যে স্বপ্ন মুখর হতো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইয়ের আড্ডায়, যে স্বপ্ন দুই চাকায় ঘুরে বেড়াত গোটা শহর। সেই স্বপ্ন ঘুরে বেড়াত পাহাড় থেকে পাহাড়ে, স্বপ্ন ছুঁতে চাইত এভারেস্ট, সেই স্বপ্ন আজ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে চন্দ্রিমার কালো কুচকুচে পিচের ওপর। মাইক্রোবাসের ধাক্কায় মুহূর্তে নিভে গেল টগবগে তরুণ একটি প্রাণ, একটি সম্ভাবনা।

রেশমা নাহার রত্না ছিলেন একজন সাইক্লিস্ট, দৌড়বিদ, পর্বতারোহী এবং একজন শিক্ষক। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রের নিয়মিত মুখ ছিলেন। নিয়ম করে ভোরে যেতেন রমনায় শরীরচর্চার আসরে। দেশ–বিদেশের গুটিকয় পাহাড়েও চড়েছেন। ইচ্ছা ছিল এভারেস্ট ছোঁয়ার। পাহাড়টা তাঁর কাছে ছিল নেশার মতো। দারুণ স্বপ্নবাজ ছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের মৃত্যু হলো অকালেই। বাইরে বের হলে সাইকেল ছিল তাঁর সঙ্গী। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার মিছিলে শামিল হতে হলো তাঁকেও।

ঢাকার রাস্তায় সাইক্লিস্টদের মৃত্যু নতুন নয়। ২০১৩ সালে ১৩ নম্বর বাসের চাপায় মারা গিয়েছিলেন শিশির। পরের বছর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের রাস্তায় প্রাণ গেল আরেক সাইকেল আরোহীর। ২০১৬–তে এয়ারপোর্ট রোডে রিয়াদ হোসেন, ২০১৮–তে উত্তর বাড্ডায় রফিকুল ইসলাম প্রাণ হারান বেপরোয়া যানবাহনের ধাক্কায়। খুঁজলে সাইক্লিস্টদের মৃত্যুর এই তালিকা হয়তো আরও লম্বা হবে।

চলতি দশকের গোড়ার দিকে দুই চাকার এই যান নীরব এক বিপ্লব ঘটিয়ে দেয় ঢাকায়। কয়েকজন তরুণ মিলে হাল ফ্যাশনের সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলেন রাস্তায়। তাঁদের দেখাদেখি আরও অনেকে। বিডিসাইক্লিস্টস নামে ‘সাইকেল আন্দোলনের’ গোড়াপত্তন ঘটে সেখান থেকেই। হাজারো তরুণ, যুবক, পেশাজীবী সাইকেলে চড়ে রোজকার কাজ সারেন এখন। নিয়মিত কমিউট করেন অন্তত কয়েক হাজার সাইক্লিস্ট।

default-image

ইউরোপ–আমেরিকা এমনকি আমাদের পাশের দেশেও পরিবেশবান্ধব, ধীরগতির এই বাহনের জন্য রয়েছে আলাদা লেন। কিন্তু আমাদের দেশে আজও সেটি হলো না। অথচ দিন দিন সাইকেল আরোহীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। নিরাপদ বলে এই করোনাকালে সাইকেলে মানুষের চলাচল আরও বেড়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরে একটি সাইকেল লেন হলো না আজও। অথচ বছর বছর সাইকেল আরোহীরা বেপরোয়া সব যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছেন।

যানজটের এই শহরে গাড়ির চেয়ে সাইকেলের গতি বেশি। অফিস টু বাসা, আর বাসা টু অফিসে যাতায়াতে গাড়ি ছেড়ে সাইকেল ধরেছেন এমন অনেককে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। আরও অনেকেই চান গাড়ি ছেড়ে সাইকেলে যেতে। কিন্তু ভরসা পান না ঢাকার অনিরাপদ সড়কের কথা ভেবে। পৃথক একটি সাইকেল লেন হলে, সাইক্লিস্টদের প্রতি সরকার একটু সুদৃষ্টি দিলে, রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ অনেক কমবে।

বেসরকারি উদ্যোক্তাদের চেষ্টা আছে। অ্যাপভিত্তিক সাইকেল সেবা বাংলাদেশেও চালু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কক্সবাজারে জো বাইক চলছে সমানে। শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে সাইকেলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করে দিলে এসব উদ্যোগ আরও প্রাণ পাবে।

default-image

রেশমা তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, ‘পর্বতারোহণ একটি শৈল্পিক কষ্ট।’ প্রতিটা প্রাপ্তির পেছনেই থাকে কষ্ট আর ত্যাগ–তিতিক্ষার গল্প। রেশমা তাঁর প্রাপ্তির পেছনে ছুটেছেন শুধু। আমরাও সবাই নিজ নিজ চাওয়া–পাওয়ার পেছনে ছুটছি নিরন্তর। এই ছুটে চলা যেন মুখ থুবড়ে না পড়ে। চলার সেই পথটা যেন মসৃণ হয়। আমরা চাই, সড়ক দুর্ঘটনার এই মিছিল থামুক।

এ জন্য জনপ্রতিনিধি, আমলা, মন্ত্রী আপনারা চাইলেই পারেন ঢাকায় একটি সাইকেল লেনের ব্যবস্থা করতে। আপনার ছোট্ট শিশুটিও হয়তো ট্রাইসাইকেল, বাইসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ঘরময়। তার আকাশটাও উন্মুক্ত আর অবারিত হতে পারে পৃথক লেনের ব্যবস্থা করে দিলে। তখন অনেকেই সাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামবে।

কোনো এক সকালে হয়তো দেখব, শত শত গাড়ির বদলে শত শত সাইকেল আরোহী ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই সুন্দর সকালের অপেক্ষায় রইলাম।

আবুল হাসনাত: প্রথম আলোর সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন