ঈদের পোশাকের নাম কেন ‘পুষ্পা–কাঁচা বাদাম’ হবে

প্রতিবছরের মতো এ বছরও ঈদের কেনাকাটায় দেখা যাচ্ছে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব
ফাইল ছবি

ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সব মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সেই উৎসবকেই দ্বিগুণ করতে মানুষ ব্যস্ত হয়েছে ঈদের কেনাকাটায়। ঈদ উপলক্ষে সেই কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে কাপড় ব্যবসায়ীরা বেশ কিছু বছর ধরে তৈরি করেছেন ব্যবসার নতুন একটি ধরন। প্রতিবছর ঈদ মৌসুমে কাপড় ব্যবসায়ীরা সেই বছরের ট্রেন্ডিং কোনো নাম বা ভাইরাল কোনো গানের নাম বা আলোচিত কোনো সিনেমার চরিত্রের নামে পোশাকের নামকরণ করছেন।

এসব জামাকাপড় বা পণ্য বছরের অন্যান্য সময় একই দামে বেচাকেনা হলেও ঈদ মৌসুমে এসে সেগুলোর উদ্ভট কিছু নাম দেওয়ার মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় বিভিন্ন সিরিয়ালের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চরিত্রের নামে নিম্নমানের পোশাক আনা হচ্ছে। প্রতিবছর ভারতীয় সিরিয়ালের মূল চরিত্রের অনুকরণে তৈরি করা পোশাক দেশে ঢুকছে। সীমান্ত এলাকার বিভাগীয় শহরের বড় বড় বিপণিবিতানে এসব পোশাক বেশি বিক্রি হচ্ছে। গত বছর ‘বাহুবলী টু’, ‘দিল নাশি’, ‘বাজিরাও মাস্তানি’, ‘হুররম’, ‘করন-অর্জুন টু’, ‘সেলফি’—এমন সব বাহারি নামের পোশাক বিক্রি হয়েছে।

প্রতিবছরের মতো এ বছরও ঈদের কেনাকাটায় দেখা যাচ্ছে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব। এ বছর মার্কেটে দেখা যাচ্ছে, পোশাকের নাম ‘পুষ্পা’, ‘কাঁচা বাদাম’ ইত্যাদি। সেসব পোশাক বিক্রি হচ্ছে চড়া দামেও।

ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাকের নাম কেন বিদেশি সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, সেসব দেখার কেউ নেই। একটি পোশাক বিক্রির জন্য বিক্রেতারা বিদেশি সংস্কৃতি থেকে ধার করা উদ্ভট কিছু নাম ব্যবহার করে ক্রেতাদের যে ঠকাচ্ছেন, সে বিষয়ে কথা বলার কেউ নেই। এ বছর ভাইরাল নামের সঙ্গে মিল রেখে যে পুষ্পা বা কাঁচা বাদাম নামে জামা বিক্রি হচ্ছে, সেসব নামের সঙ্গে জামার কোনো সম্পৃক্ততাই নেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, কাঁচা বাদাম শব্দটি জনপ্রিয় হয়েছে ভারতের একজন বাদাম বিক্রেতার গাওয়া লোকাল গান থেকে, আবার পুষ্পা নামটিও একটি সিনেমা থেকে নেওয়া। শুধু নামটি পরিচিত, তাই বিক্রেতারা বিক্রি বাড়ানোর জন্য এসব নাম ব্যবহার করছেন।

স্বীকার করতে হবে যে, এসব নামের প্রভাব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের ওপর পড়ছে। তারা নিজেদের সংস্কৃতি থেকে ছিটকে গিয়ে বিদেশি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটগুলোতেও দেখা যায়, ভারতীয়-পাকিস্তানি কাপড়ের সমারোহ। মানুষের ভারতীয় বা পাকিস্তানি কাপড়ের প্রতি আগ্রহ দেশের বুটিকশিল্পকে হুমকির মুখে ফেলছে। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদকে কেন্দ্র করে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকার বিদেশি পোশাক আমদানি হয়। এসব পোশাকের দামও হাঁকাচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে শুরু করে মানভেদে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

মানুষ পরিচিত কোনো কিছুর নামে পোশাক দেখলে আগ্রহ নিয়ে দেখে এবং সাধারণত না কিনে যায় না, ব্যবসায়ীরা এ পলিসি ব্যবহার করেই ঈদ মৌসুমে ব্যবসা বৃদ্ধি করে থাকেন। আমরা দেখেছি, অনেক শিশু-কিশোর বা অল্প বয়সী ছেলেমেয়ে বাহারি নামে এসব পোশাক কিনতে না পেরে কান্নাকাটি করে, না খেয়ে থাকে। কোনো এক বছর ‘পাখি’ জামা কিনে না দেওয়ায় আত্মহত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে।

সরকারের উচিত প্রতিবছর ঈদ মৌসুমে প্রতিটি মার্কেট ব্যবস্থাপনাকে মনিটরিংয়ে রাখা। কেননা, দেশে প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক হলেও ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর অভিজাত বিপণিবিতান থেকে শুরু করে ছোট-বড় শপিং মলে পোশাকের দোকানগুলোতে থাকে ভারত, পাকিস্তান, চীন আর থাইল্যান্ডের পণ্যের দখলে। সরকারের উচিত দেশীয় বস্ত্রশিল্প রক্ষায় বিদেশে বস্ত্রের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা ও কোনো উৎসব উপলক্ষে কত টাকার পোশাক আমদানি করা হয়, তার সঠিক তথ্য সরবরাহ করা। তরুণ প্রজন্মকে এই বিদেশি সংস্কৃতির গ্রাস থেকে রক্ষা করতে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ছাড়া গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সাহায্যে বর্তমান প্রজন্মকে সচেতন করার প্রচেষ্টা করা যেতে পারে।

সামিহা খাতুন
শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়