এমাজউদ্দীন আহমদ: রাজনীতি ছাপিয়ে আদর্শ শিক্ষকের মুখ

বিজ্ঞাপন
default-image

সাতচল্লিশের দেশভাগের মাস ছয়েক আগের কথা। এমাজউদ্দীন আহমদের বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। পৈতৃক নিবাস অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহে। বর্তমান বাংলাদেশের সীমান্তের শূন্যরেখার কাছেপিঠে হবে কোথাও। তখন হঠাৎ অস্বাভাবিক একটা কিছু ঘটেছিল। কী সেটা জানি না। তাঁর অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে হয়তো এর বিশদ বিবরণ জানা যাবে। এমাজউদ্দীন আহমদ রীতিমতো তল্পিতল্পা নিয়ে চলে এসেছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে, সেটা ছিল তাঁর ফুফুর বাড়ি। এরপর তাঁর বাবা-কাকারাও চলে আসেন। পুরো পরিবার আসেনি। এখনো স্যারের দুই বোন মালদহে, ভারতীয় নাগরিক।

তো, যেতে তো হবেই, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ পরিণত বয়সেই চলে গেলেন। কিন্তু লক্ষ্য করি, তাঁর মৃত্যুর পর কিছু আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, তিনি বিএনপি করতেন। কিন্তু তাঁর জন্য বিএনপির বাইরের মহলে শ্রদ্ধার একটা জায়গা ছিল। কিন্তু কতটা ছিল? সেটা যাচাইযোগ্য। তবে এটা সুলক্ষণ। তার মানে প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতাবলম্বীর জন্য একটা স্পেস, কিছু আসন দরকার।

এমাজউদ্দীন স্যারের চলে যাওয়ার পর অনেকগুলো কৌতূহলোদ্দীপক ফেসবুক পোস্ট চোখে পড়ল। এর মধ্যে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদের একটি পোস্ট অনবদ্য। এমাজউদ্দীন স্যার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার কথা। মানে গণতন্ত্রের রেশ বাতাসে মিলিয়ে যায়নি। ভাসছে। সেই অবস্থায় তিনি বিএনপির ‘খাস লোক’ হয়েও বিব্রত হয়েছিলেন। বিআইডিএসের একটি শূন্য পদে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদকে যোগ্য ভেবেছিলেন তিনি। তাই বিএনপির কাছে কথাটা পেড়েছিলেন তিনি। কিন্তু ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদ বিএনপির সংশ্লিষ্টদের চোখে একজন ‘সমালোচক’। সোজা কথায়, আমাদের লোক নয়। তাই তাঁকে নাকচ করা হলো।

ঠিক কবে ‘আমাদের লোক’ খোঁজা শুরু হলো তা কারও জানা নেই। তবে দেখতে দেখতে সবই ‘আমাদেরময়’ হয়ে উঠেছে।

সব মৃত্যুই শূন্যতা তৈরি করে। স্যারের প্রস্থানের শূন্যতা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বিএনপিপন্থী ছিলেন, কিন্তু দলান্ধ ছিলেন না। ইতিহাস, ভূগোল বা নিরেট পদার্থবিদ্যা—সবকিছুকেই দলীয় আয়নায় দেখার লোক তিনি ছিলেন না। সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর মূল পরিচয়, তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন অর রশীদ তাঁর অন্যতম কৃতী ছাত্র। বললেন, ‘তিনি আমার দেখা একজন আদর্শ শিক্ষক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর ক্লাস করেছি। তাঁকে কেউ কখনো রাগতে দেখেনি।’

আমি গত এক বা দেড় দশক প্রায় নিয়মিতভাবে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তাঁকে সর্বদা বিনম্র ও মৃদুভাষী দেখেছি। অবশ্যই তাঁর সঙ্গে চিন্তাগত অমিল ছিল, কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনে তা বাধা হয়নি। এটা পীড়াদায়ক ছিল যখন মনে হয়েছে, বিএনপির কিছু বিতর্কিত রাজনীতিকে তিনি সমর্থন দিচ্ছেন। আবার তার মধ্যে যতটা সম্ভব, তিনি নিজেকে দলবাজির বাইরে রেখেছেন। দলচিন্তায় নিজের স্বাধীন চিন্তাকে আচ্ছন্ন হতে দেননি। তাঁর সঙ্গে বিরুদ্ধ বা ভিন্নমত নিয়ে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করা যেত। যে মত তিনি পছন্দ করেন না, সেটা শুনতে তাঁর কখনো ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি।

বিএনপির জন্মের তিক্ত ইতিহাস নিয়ে আলোচনার সময় সংগত কারণেই তাঁকে সতর্ক দেখতাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মূল্যায়নে তিনি কখনো ভ্রান্ত ছিলেন না। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে জেনারেল জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সার্কসহ বিদেশনীতিতে তাঁর চিন্তার প্রভাব ছিল। আবার ‘তারেক রহমান: অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক বইয়ের লেখক হতে হয় তাঁকেই। তদুপরি সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সমীহ করা চলে, এ রকম একজনকে হারাল বাংলাদেশ।

স্যার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে দুই বড় দলের ন্যূনতম ঐক্যই জাতি গঠনের বৃহৎ শক্তি হতে পারে। তখন চীন, ভারত বা অন্য বিদেশি শক্তি—তারা বাংলাদেশকে শ্রদ্ধার চোখে দেখবে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় কেউ কাউকে শেষ করতে পারবে না।

জেনারেল জিয়ার আমলের অগ্রাধিকারে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর আমলে চাকমাদের বাঙালি হতে বলায় সংকট তৈরি হয়েছিল। সুতরাং দরকার ছিল নতুন একটা সংজ্ঞা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ আবেগের জায়গায় থাক, নাগরিকত্বে বাংলাদেশি কথাটি ধারণ করলেই হলো। যেটা ২০১১ সালের সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে গ্রহণ করা হলো। স্যার বুঝতেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দৌড় হলো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের ধারণ করা পর্যন্তই।

জীবনসায়াহ্নে যতটা সম্ভব, অপ্রিয় সত্য বলার চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর দল সম্পর্কেও স্বাধীন চিন্তা প্রকাশে কিছু আপস তাঁকে করতে হয়েছে। অবশ্য এটা বাংলাদেশি বাক্‌স্বাধীনতার একটা কালজয়ী অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা। বিএনপির ভেতর থেকে কোনো হিংসাশ্রয়ী বা অস্বস্তিকর প্রতিবাদের মুখোমুখি তিনি হতে চাননি। তবে তিনি সার্বিক বিচারে হতাশ ছিলেন।

এমাজউদ্দীন আহমদ রাজনীতিবিদ হননি। একজন শিক্ষাবিদের পরিচয়কেই তিনি বড় রাখতে চেয়েছেন। তাঁর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা থাকা ছিল মৌখিক। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির কোনো পদই কখনো তিনি নেননি। এখানে তাঁর একটা মূল্যবোধ ছিল, বর্তমান রাজনীতিতে যা নির্বাসিত।

শেষ দিকে তারেক রহমানের প্রতি তাঁকে কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করতেই দেখেছি। তারেক রহমান হয়তো তাঁকে ফোন করাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আমাকে বলেছিলেন, যদি সময়–সুযোগ আসে, তাহলে তিনি তারেক রহমানকে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ বা শিক্ষণ দেবেন। এমন কথা প্রকাশ্যে বলার মতো লোক বিএনপিতে আর থাকল না।

বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর গর্বের কোনো সীমা ছিল না। বিশেষ করে, একটি তথ্য তিনি বলতে বলতে সর্বদা উজ্জ্বল হয়ে উঠতেন। সেটা হলো ব্রিটিশ ভারতে বিশ্বের এই অংশের জিডিপি ছিল ইউরোপের চেয়ে বেশি। এই অংশ মানে আজকের বাংলাদেশ, যার ঐশ্বর্য টেনেছিল অবশিষ্ট বিশ্বকে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রায়ন ও সুশাসনের জন্য বহুত্ববাদিতা ও বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। এটা পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন তিনি।

গত ডিসেম্বরে তাঁর বাসায় আমার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হলো। দেখলাম, ‘ডাইয়িং ডেমোক্রেসি’ বইটা পড়ছেন। নির্বাহী ক্ষমতা শুধু প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকার বিপদ নিয়ে বলপেনে লিখছেন নিবন্ধ।

এমাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের শক্তিশালীকরণে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বুঝে নিয়েছিলেন, এই দলই লম্বা সময় শাসন করবে। তাই তারা দুর্বল থাকলে, বহিঃশক্তি দ্বারা দেশের স্বার্থের হানি ঘটবে। সে জন্য তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি তাই বলতেন, ক্ষমতাসীন দল থেকে দেশের প্রকৃত প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে দিতে নেই। বিরোধী দলকে খুব বেশি পর্যুদস্ত বা শতচ্ছিন্ন রাখাটা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে সমূহ বিপদ। তিনি বলতেন, বর্তমান সরকার উল্লিখিত ক্ষেত্রে কিছুটা অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ নিলে জাতি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

২০০৮ সালের নির্বাচনী ফল তাঁর কাছে ‘সাজানো’। ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কটকে সমর্থন করেছেন। আবার ২০১৮ সালে তিনি শেখ হাসিনার অধীন ভোট ও তাঁর নির্বাচনী কেবিনেটে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন।

রাজনীতির প্রশ্নে মত–দ্বিমত স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা তাঁকে এমন সময়ে হারালাম, যখন ভিন্নমত অবলম্বন, সমালোচকের ভূমিকা পালন করা বড়ই দরকারি। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে স্বকীয়তা ধরে রেখেছিলেন, তেমন উদাহরণের সংখ্যা রাজনীতির অঙ্গনে খুব কম।

সরকারের সমালোচক হিসেবে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ভাবমূর্তি এক রকম, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদর অন্য রকম। কিন্তু ভিন্নমতের একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা আদর্শ শিক্ষকের পরিবারের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। একদিন তিনি তাঁর এক যুগ্ম সচিব পুত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ছয়–সাত বছর আগে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় তাঁকে অকারণে ওএসডি করেছিল। আজও তিনি ওএসডি। পরিবারটি সম্ভবত বিশ্বাস করে, স্যারের সরকারবিরোধী ভূমিকার কারণেই এ মাশুল দিতে হচ্ছে।

এমাজউদ্দিন আহমদ যখন সহ–উপাচার্য ও উপাচার্য, সেই আমলে নিয়োগ পাওয়াদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য, সহ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষও আছেন। অধ্যাপক হারুন অর রশীদও স্মরণ করেছেন, মেধা ও যোগ্যতার নিরিখে যাচাই করেছেন তিনি। একবার নিহত বিএনপিপন্থী অধ্যাপক আফতাব আহমেদ ও অধ্যাপক হারুনর রশীদকে প্রণোদনা দেওয়ার প্রশ্ন এল। এমাজউদ্দিন আহমদ তখন উপাচার্য ও বোর্ড সদস্য। হারুনর রশীদ দেখলেন, তাঁকেই একটি ইনক্রিমেন্ট দিয়ে এগিয়ে রাখা হলো। এটা ছিল তাঁর মেধার স্বীকৃতি। আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিবেশ ভাবা কঠিন।

দেশভাগের ডামাডোলে এক পলাতক কিশোর এমাজউদ্দিন আহমদ, যিনি সর্বশেষ চুয়াডাঙ্গা কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। মানুষ তাঁকে বহুকাল মনে রাখবে।

মিজানুর রহমান খান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন