default-image

চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া নতুন করোনাভাইরাস এখন গোটা বিশ্বকে চোখ রাঙাচ্ছে। শুধু চোখই রাঙাচ্ছে না, অজস্র মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে এই ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে কোভিড-১৯ নামের এ রোগের সংক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারি বা প্যানডেমিক ঘোষণা করেছে। শঙ্কার দিন গুনতে গুনতে শেষ পর্যন্ত এটি বাংলাদেশেও হানা দিয়েছে। ছড়িয়ে দিচ্ছে আতঙ্ক। কিন্তু করোনাভাইরাস শুধু নিজেই সংক্রমিত হচ্ছে না বা শুধু আতঙ্ক ছড়াচ্ছে না, এটি গুজবও ছড়াচ্ছে দেদার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে গুজবের হাত–পায়ের প্রয়োজন হয় না। অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এটি ছড়িয়ে পড়ে। নিরুপদ্রব কিছু গুজবকে নিরীহ মনে করে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু এই মহা-আপৎকালে কোনো কিছুই কি আসলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়? কোনো কিছুকেই কি আদতে ‘ইগনোর’ করা চলে? না, চলে না। চলাটা উচিত নয়। কারণ, এর সঙ্গে মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত।

যেকোনো দুর্যোগই মানুষের মধ্যে একধরনের অসহায়বোধ জন্ম দেয়। এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। আর এই অসহায়বোধ থেকে মানুষের পক্ষে এমন অনেক কিছুকে আঁকড়ে ধরা সম্ভব, যা হয়তো সে স্বাভাবিক অবস্থায় বিশ্বাসই করত না। আর এই মানসিক অবস্থার সুযোগটিই নেয় আরেক দল মানুষ। মানুষের ভয় ও সংশয়ই তাদের পুঁজি। এই যেমন, ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা জানাচ্ছে, হিন্দু মহাসভা করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির উদ্দেশে ‘গোমূত্র’ পার্টি আহ্বান করেছে দিল্লিতে। শুধু তা-ই নয়, মহাসভার সভাপতি চক্রপাণি মহারাজের ভাষ্যমতে, জীব হত্যা মহাপাপ, আর এই পাপের কারণেই নতুন এ ভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে। যারা নিরামিষাশী, তাদের নাকি কোনো ভয় নেই। এ নিয়ে দেশটিতে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

এদিক থেকে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। হালে ইউটিউবের কল্যাণে ‘ওয়াজ’ করে জনপ্রিয়তা পাওয়া অনেকেই যে ভুলভাল তথ্য ছড়াচ্ছেন, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করছেন, তা একরকম সবার জানা। করোনাভাইরাস নিয়েও এমন হাস্যকর নানা তথ্য উপস্থাপন করছেন তথাকথিত ‘ওয়াজের’ মাধ্যমে। উদাহরণ দেওয়া যাক। নতুন করোনাভাইরাস চীনে ছড়িয়ে পড়ার খবরের পর বলা হলো, এটা উইঘুর মুসলিমদের ওপর অত্যাচারের ফল। সরাসরি কেউ কেউ একে ‘আল্লাহর গজব’ বলেও আখ্যা দিলেন। অনেকে বিষয়টি হয়তো বিশ্বাসও করল। ফলে কথাটি জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ জাতি-ধর্মনির্বিশেষে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে এ ধরনের বক্তব্য কিছুটা থিতিয়ে আসে।

এমন নয় যে নতুন এ বৈশ্বিক মহামারির সময়েই শুধু এমন গুজব ছড়াচ্ছে। মহামারি বা রোগ নিয়ে আগেও এমন গুজব ছড়িয়েছে। বরাবরই দেখা গেছে, যেকোনো রোগ বা দুর্যোগের সময় এক দল মানুষ থাকে, যারা দুর্যোগ থেকে বাঁচতে নানা ধরনের উদ্যোগ নেন, করেন গবেষণা। আবার আরেক দল মানুষ থাকেন, যারা কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণের পরিবর্তে রোগটিকেই, দুর্যোগটিকেই পাপের ফল হিসেবে দেখাতে তৎপর থাকেন। একসময় শোনা যেত যে ‘যার হয় যক্ষ্মা, তার নাই রক্ষা।’ বলা হতো, পাপের কারণেই যক্ষ্মা হয়। গল্প, উপন্যাস, গাথাসহ নানা মাধ্যমে মহাপাপীদের পরিণতি হিসেবে কুষ্ঠ রোগে ভোগা তো অবধারিতই ছিল।

মধ্যযুগে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া প্লেগ, যা দ্য গ্রেট প্লেগ নামে পরিচিত, তা নিয়েও ছিল এমন প্রচার। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এ প্লেগে বিশ্বের তখনকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশই মারা পড়েছিল। শুধু ইউরোপই হারিয়েছিল তার ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ। ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া এ বৈশ্বিক মহামারি প্রাচীন সিল্ক রোড ধরে ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপে। ভয়াবহ সংক্রমণ ঘটেছিল লেবানন, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তখনকার ধর্মযাজকদের একাংশ একে ‘স্রষ্টার পাঠানো শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এক ধর্ম আরেক ধর্মকে দোষারোপ করার ঘটনাও দেখা দেয় সে সময়। এমনও ঘটনা ঘটেছিল যে রোগীদের বাঁচাতে চেষ্টা চালানো মুসলিম চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারও করেছিলেন তৎকালীন কিছু ইসলামি চিন্তক। কারণ, এমন চেষ্টা নাকি স্রষ্টার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু আজকের বিজ্ঞান জানিয়ে দিয়েছে যে এসব প্রচারই ছিল তখনকার মানুষের ভয়কে পুঁজি করে চালানো এবং অজ্ঞানতাপ্রসূত এক মহামিথ্যা।

সর্বশেষ ২০১৪ সালে যখন গিনি থেকে ইবোলাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে, তখনো এমন ভুল ব্যাখ্যা ও গুজবের উদ্ভব হয়েছিল। ইবোলা গিনি থেকে লাইবেরিয়ায় সংক্রমিত হতেই সেখানকার ধর্মীয় নেতারা একে ‘মানুষের অনৈতিক কাজের জন্য ঈশ্বরপ্রদত্ত শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করতে শুরু করেন। খোদ লাইবেরিয়ান কাউন্সিল অব চার্চেস এমন ঘোষণা দিয়েছিল সে সময়। তারা ইবোলাকে ‘একধরনের প্লেগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। তারা এর দাওয়াই হিসেবে টানা তিন দিন ঘরে আবদ্ধ থেকে উপবাস ও প্রার্থনার কথা বলেছিল। কিন্তু সবাই জানে যে ইবোলাভাইরাস কোনো শাস্তি হিসেবে আসেনি। এর বৈশ্বিক মহামারি হওয়া ঠেকিয়েছিল সতর্কতা। পরে এ নিয়ে পরিচালিত গবেষণা মানুষকে এ রোগের চোখে চোখ রাখতে সাহায্য করে। একই কথা কুষ্ঠ, যক্ষ্মা, প্লেগ, সার্স, মার্স—এই সবকিছুর ক্ষেত্রেই সত্য।

এমনকি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রেও এই ‘পাপ ও পাপের ফল’ তত্ত্বটি হাজির করা হয়। যে যার ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী দুর্যোগের সময় স্রষ্টার শরণ নেবে—এটাই স্বাভাবিক। এতে কোনো সংকট নেই। এই যে বাংলাদেশে বলা হচ্ছে, ‘আতঙ্কিত হবেন না, স্রষ্টার ওপর ভরসা রাখুন’—এটি কিন্তু মানুষকে শান্ত থাকতে সহায়তা করছে, আশ্বস্ত করছে। কিন্তু যখনই কোনো রোগ বা দুর্যোগকে কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর পাপের ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়, তখনই এক বড় ধরনের সংকটের জন্ম দেওয়া হয়। এ ধরনের প্রচার সংকট সমাধানকে কঠিন করে তোলে দুভাবে। প্রথমত, এমন প্রচারের ফলে সংকট মোকাবিলায় অনুসরণীয় সতর্কতা মেনে না চলতে উৎসাহ দেয় সাধারণ মানুষকে। দ্বিতীয়ত, এটি রোগাক্রান্ত বা দুর্যোগগ্রস্ত মানুষকে সমাজের সামনে ‘অপরাধী বা পাপী’ হিসেবে উপস্থাপন করে। এতে সংকটগ্রস্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আরেকবার ভিকটিমে পরিণত হয়।

যখনই কোনো রোগকে ‘শাস্তি’ হিসেবে দেখা হয়, তখনই অসুস্থ ব্যক্তিকে ‘অপরাধী’ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। এটি সমাজে একটি ভয়াবহ ভুল বার্তা দেয়, যা সংকটগ্রস্তকে আরও গভীর সংকটে ফেলে। এটি একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় যারা সচেষ্ট, তাদের কাজকেও কঠিন করে তোলে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রশাসন বর্তমানে নতুন বৈশ্বিক মহামারি থেকে মানুষকে রক্ষায় কাজ করছে। নানা দেশের বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণের পথ বের করতে। চেষ্টা করছেন এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের। এই অবস্থায় অজ্ঞতাপ্রসূত নানা ‘পাপতত্ত্ব’, কাল্পনিক দাওয়াই, অন্য গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা উৎপাদনকারী বক্তব্য ইতিবাচক চেষ্টাগুলোকে কঠিন করে তুলছে। ভয়ানক ভাইরাস কোভিড-১৯ ছড়ানোর এই কালে এ গুজবের সংক্রমণ কিন্তু কম ভয়াবহ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে এমন গুজব ঠেকাতে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বড় বেশি দেরি হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষেরও কর্তব্য কম নয়। প্রতিটি দেশের প্রশাসন সংকট মোকাবিলায় নিয়মিতভাবে বার্তা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি গাইডলাইন প্রকাশ করেছে, যা সময়ের সঙ্গে হালনাগাদ করা হচ্ছে। এগুলোই অনুসরণ করা উচিত। নিজেকে শুধু ভাইরাসটি থেকেই নয়, গুজব থেকেও সুরক্ষিত রাখুন।

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন