কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে মানুষের শহরে আসার মধ্য দিয়ে যদি নগরায়ণ শুরু হয়, তাহলে শহরের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে আবার গ্রামে প্রত্যাবর্তনের নাম কী হবে, সমাজবিজ্ঞানীদের তা খুঁজে বের করতে হবে। এই প্রসঙ্গ টেনে আনার কারণ হলো, এই লেখকের পরিচিত কয়েকজন মানুষ ঢাকা ত্যাগ করে নিজ গ্রামে খামার চালু করেছেন। ছেড়েছেন চাকরি। নাম যা-ই দেওয়া হোক না কেন, এটি বোধ হয় এই মুহূর্তে অনেক নাগরিকের মনের গহিনের ভাবনা। 

অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি একরকম ইতিবাচক। শহর থেকে গ্রামে পুঁজি ও সক্ষমতা যাচ্ছে। যাঁরা গেছেন, তাঁরা সবাই দেশের প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ভালো মাইনেও পেতেন। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নত রীতির সঙ্গে তাঁদের সম্যক পরিচয় আছে। অন্যদিকে দেশের গ্রামীণ অঞ্চলেও এখন নানাভাবে পুঁজি ঢুকছে। অকৃষি খাতের বিকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় বাজার গড়ে উঠেছে। এখন পণ্যের দামের ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের বিশেষ পার্থক্য নেই। তাই গ্রামে এখন কিছু করার সুবর্ণ সময়। 

গ্রামের মানুষের জীবনধারায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অনেক গ্রামেই পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। মুঠোফোনের কল্যাণে ইন্টারনেটের ব্যবহারও বাড়ছে। সবচেয়ে কাজে দিয়েছে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি। গ্রামের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে উপজেলা, উপজেলার সঙ্গে জেলার সংযোগ সড়ক তৈরি হয়েছে। সেদিন বাংলার পাঠশালা আয়োজিত অমর্ত্য সেন পাঠচক্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্কাইপে যুক্ত হয়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এই যোগাযোগব্যবস্থার প্রশংসা করেন। আমাদের অর্থনীতিবিদেরাও এই কথা অনেক দিন ধরে বলে আসছেন। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে গ্রামে উৎপাদিত ফসল সহজেই শহরে নিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে শহরে আসার হার বেড়ে গেছে মানুষের। এতে দেশের গ্রামাঞ্চল বিদ্যুচ্চালিত অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছেয়ে গেছে। শুধু এসব চালিয়েই অনেকে ভালো উপার্জন করছেন। আর এনজিওগুলোর তৎপরতা এবং রেমিট্যান্সের ব্যাপক প্রভাব তো আছেই। 

এত তথ্য দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা বলা যে আগের সেই নিভৃত বা বিচ্ছিন্ন গ্রাম আর নেই। প্রাণচাঞ্চল্য এসেছে। বেড়েছে মানুষের চলাচল। এমনকি আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে বাজার বা পেট্রলপাম্পে ডাব-শসা বিক্রি করেও অনেকে দিনে হাজার টাকার ওপরে উপার্জন করছেন। সরকার গত ১০ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বাড়িয়েছে। তাই গ্রামে এখন বিদ্যুৎ পাওয়াও বড় সমস্যা নয়—সব গ্রামে বিদ্যুৎ যায়নি, সে কথা মাথায় রেখেই বলছি। কিন্তু গ্রামের প্রধান সমস্যা হচ্ছে মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব। সঙ্গে গ্রামীণ রাজনীতির কুটিলতা তো আছেই। 

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আরও অনেকেই এ রকম পরিকল্পনা করছেন। বন্ধুস্থানীয়দের একজন যাবেন যাবেন করছেন। তাঁর পরিকল্পনাও সে রকম: গ্রামের পার্শ্ববর্তী আঞ্চলিক মহাসড়কের পেট্রলপাম্পে হোটেল দেবেন। পাশাপাশি চাষাবাদ করবেন। ভবিষ্যতে পুঁজি হলে গ্রামে মানসম্মত স্কুলও দেবেন। আর গ্রামে মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা গেলে এই হার আরও বাড়বে বলেই ধরে নেওয়া যায়। 

এসব মানুষের শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে অনিশ্চয়তা। বাস্তবতা আজ এমন জায়গায় গেছে যে রাজধানীতে লাখ টাকার ওপর উপার্জন করেও মানুষ নিশ্চয়তা ও স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরে কিছুই সহজ না। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরি করলে সন্তানের নিরাপত্তা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে স্কুলে আনা-নেওয়া, পড়ানো—এসবও বড় চিন্তার কারণ। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নগরে এখনো স্কুল বাসের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। মা–বাবাকে শত ব্যস্ততার মধ্যে সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়া করতে হয়। এই সন্তান লালনপালনের অনিশ্চয়তার কারণে এক সাংবাদিক ঢাকা ছেড়ে নিজ শহরে চলে গেছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে এই ফাঁপর তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। সেই চাপ নেওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। 

ব্যাপারটা হলো, এই অনিশ্চয়তা মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। গড় আয়ু বাড়লেও সুস্থতার বিচারে পিছিয়ে পড়ছি আমরা। আবার শহরের এই পরিবেশ শিশুদের প্রাক্-স্কুলশিক্ষার জন্য যথাযথ নয়। 

অন্যদিকে এই শহরে টাকা খরচ করেও সন্তানের নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। এটি আমাদের নগরায়ণের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বললে অত্যুক্তি হয় না। এই পরিস্থিতিতে নাতি-নাতনিদের দেখেশুনে রাখার জন্য গ্রাম থেকে অনেক দাদা-দাদি, নানা-নানি শহরে চলে আসছেন। কিন্তু সবার বেলায় তা ঘটবে না। তাতে সমস্যার সমাধানও হবে না। ব্যাপারটা হলো, পুরোনো সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়ে উঠছে। আগের সেই সামাজিক-পারিবারিক বন্ধন আর নেই, কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। দুয়ে মিলে নগরবাসীর জীবনটা এক ফাঁপর। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ, যানজট—এসব তো আছেই। ফলে রাজধানীতে যত টাকাই উপার্জন করুন না কেন, স্বস্তিতে থাকার উপায় নেই। 

রাজধানীর মতো বড় শহরে আরেক সংকট তৈরি হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি চাকরির পার্থক্য বেড়ে যাওয়ার কারণে। একসময় বেসরকারি চাকরির বেতন-ভাতা ও সুবিধাদি বেশি ছিল। কিন্তু সরকারের গত দুটি পে–স্কেলের পর ব্যাপারটা ঠিক উল্টো হয়ে গেছে। সরকারি চাকরিতে শ্রমশক্তির মাত্র ২ শতাংশের সংস্থান হয়। আর বাকি মানুষ কাজ করেন বেসরকারি খাতে, তাঁদের একটি বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত। বেসরকারি চাকুরেদের আয় না বাড়ার কারণে তাঁদের পক্ষে জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের মনেও ঢাকা ছাড়ার চিন্তা জাগছে। 

গ্রামে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁরা ভালোই আছেন। সতেজ খাবার খাচ্ছেন। নির্মল বায়ুতে নিশ্বাস নিচ্ছেন। প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করছেন। তবে এভাবে শহর ছেড়ে মানুষের গ্রামে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে, সে কথা বলা যায় না। সবাই শহর ছেড়ে যেতেও পারবেন না। আরেকটি কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার, গ্রামের উৎপাদিত পণ্য সহজে শহরে আসতে পারছে (যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির কারণে। আগেই যেটা বলেছি) বলেই কিন্তু গ্রামের মানুষের হাতে টাকা এসেছে। এই পরিস্থিতিতে শহরের বাসযোগ্যতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। 

প্রতীক বর্ধন প্রথম আলোর সহ-সম্পাদক
bardhanprotik@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন