default-image

বিএনপির জন্মদিনে দেশের প্রায় সব পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। কোনো রচনার লিখিত শব্দের বাইরেও রিড বিটুইন দ্য লাইনস বলে একটা বিষয় আছে, যা দ্বারা একজন পাঠক লেখকের দেওয়া তথ্যের বাইরেও আরও কিছু বিষয় বুঝতে পারেন। পাঠক বুঝতে পারেন ওই রচনার পেছনে লেখকের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় কী। অদ্ভুতভাবে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আসলেই একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর লেখার ‘অভিপ্রায়’ দেখে মনে হয়, সমালোচনার নামে তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করেন বিএনপিকে খাটো, অযোগ্য প্রমাণ করে হতোদ্যম করে ফেলতে।

সম্প্রতি প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘বিএনপি কি রাজনীতি করছে?’ শিরোনামের কলামে লেখক মারুফ মল্লিক এর একটা চমৎকার উদাহরণ। কলামটির প্রথম অনুচ্ছেদ এমন, ‘প্রতিষ্ঠার ৪২ বছরের মাথায় কেমন আছে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি? সার্বিক বিষয়াদি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দিশাহীন, এলোমেলো সময় পার করছে দলটি। অগোছালো রাজনীতির ভারে ডুবে গেছে বিএনপি। কখন কী করবে, দলটির কে কী বলবে, বোঝা মুশকিল। বুদ্ধিদীপ্ত, গঠনমূলক রাজনীতি থেকে বিএনপির অবস্থান যোজন যোজন দূরে।’

অথচ বাংলাদেশে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এ দেশে ‘রাজনীতি’ আদৌ আছে কি নেই। এ রকম একটি টালমাটাল সময়ে সব বিরোধী রাজনৈতিক দলই দিশাহীন, এলোমেলো, অগোছালো সময় পার করবে, সেটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে সেই রাজনৈতিক দলটি যদি সরকারের ক্ষমতায় থাকার প্রধান বাধা হয় এবং এক যুগ ধরে দলটিকে সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ করে রাজনীতির মাঠ থেকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চললে দলটির টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। এই পরিস্থিতিতে বিএনপিকে আলাদা করা কিংবা বিএনপির কাছ থেকে ‘পিকচার পারফেক্ট’ রাজনীতি আশা করা ইউটোপিয়ান চিন্তা নয়কি?

বিজ্ঞাপন

রাজনীতিহীনতার এই কালে ক্ষমতাসীন দলটিও কিন্তু রাজনীতিহীন হয়ে পড়েছে। কীভাবে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে জায়গা করে আর সেটা ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া যায়; এর বাইরে দলটির কর্মীদের আর কোনো কাজ আছে বলে তো দেখি না। ক্ষমতায় আছে বলে আপাতদৃষ্টিতে তাদের এলোমেলো-অগোছালো মনে হয় না, কিন্তু ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলটির কাঠামো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে; এই আশঙ্কা দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারাই করেন।

লেখক অবশ্য স্বীকার করেছেন, শুরুতে বিএনপির রাজনীতি ছিল ‘ক্ষিপ্র, দ্রুতগামী, চমকে ভরপুর’। কিন্তু সযত্নে এড়িয়ে গেছেন সেই সময় এবং অব্যবহিত আগের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট। যে দলের চেয়ারপারসন ব্যক্তিগতভাবে নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে ৭৪ বছর বয়সে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জেলে, দ্বিতীয় প্রধান দেশে ফিরতে পারছেন না, সেখানে ক্ষিপ্র গতিতে দল সিদ্ধান্ত নেবে—তা কি খুব বাস্তবসম্মত?

লেখক বিএনপির সংসদে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু তিনি এড়িয়ে গেছেন এই সত্য যে কেবল বিএনপি সংসদে যাওয়ার কারণেই বিএনপির নারী সাংসদ সংসদে দাঁড়িয়ে সংসদের বৈধতা নিয়ে তীব্র ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন। সব সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিষ্ক্রিয় করে সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছেন।

বাংলাদেশে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এ দেশে ‘রাজনীতি’ আদৌ আছে কি নেই। এ রকম একটি টালমাটাল সময়ে সব বিরোধী রাজনৈতিক দলই দিশাহীন, এলোমেলো, অগোছালো সময় পার করবে, সেটাই স্বাভাবিক।

লেখক বলেছেন, বিএনপির এক সাংসদ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে লেখক বলেননি বিএনপির এক সাংসদ সংসদে দাঁড়িয়ে সাংসদদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্ররোচনার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। দৈনিক প্রথম আলো এর শিরোনাম করেছিল ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্ভবত বৈধ হতে যাচ্ছে’। শুধু তা-ই নয়, বিএনপির সাংসদেরা দুর্নীতি, বাজেট, পররাষ্ট্রনীতি, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন—সবকিছু নিয়েই কথা বলেছেন। একেবারেই নগণ্যসংখ্যক সদস্য নিয়েও সংসদের ‘ডি ফ্যাক্টো’ বিরোধী দল যে বিএনপি, সেটা সংসদ চলাকালে একটু খেয়াল করলেই লেখক দেখতে পেতেন।

লেখক বলেছেন, বিএনপি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে থাকছে না। শুধু আজ নয়, ২০১৪ সালের পর থেকে এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কথা বাদই দিই, সামাজিক সংগঠনগুলোর এখন কী অবস্থা; সেটা কি লেখক জানেন না? বাংলাদেশ আজ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটা বোঝার জন্য খুব সাম্প্রতিক একটা ঘটনার দিকে তাকানো যাক। অতি আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া সিফাতের বাড়ি বরগুনার বামনায় তাঁর মুক্তির জন্য একটি মানববন্ধন আয়োজিত হয়েছিল। সেই মানববন্ধনে বামনা থানার ওসি তাঁর এক অধীন কর্মকর্তাকে চড় দিয়ে এবং মানববন্ধনে আসা বহু মানুষকে‌ বেধড়ক পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেন। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন নিচের কথাগুলো:
‘আমাদের কারও অনুমতি না নিয়ে তারা হুট করে মানববন্ধন করেছে, আমাদের কাছে কোনো ইনফরমেশন দেয়নি। আমাদের কাউকে এ ব্যাপারে আগে জানায়নি। এটি সরকারের পক্ষে, নাকি বিপক্ষে, সেটিও তো আমাদের বোঝার ব্যাপার আছে। কিছু কুচক্রী মহল আছে, যারা বর্তমান সরকারের বিপক্ষে কাজ করছে। তারা কি চোর, ডাকাত, নাকি ছিনতাইকারী, সেটি তো আমরা জানি না।’ সূত্র: বিবিসি অনলাইন

দেশের প্রায় সব জায়গায় অবস্থা কমবেশি একই। বিগত বছরগুলোতে কয়েকটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, যেমন কোটা সংস্কার এবং বিশেষ করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে‌ শিশুদের ওপর গুন্ডা বাহিনী হেলমেট পরে কী বীভৎস তাণ্ডব চালিয়েছিল, তার স্মৃতি তো মিলিয়ে যায়নি। তারও আগে রামপালবিরোধী আন্দোলনে খুব অল্প কিছু মানুষের রাজপথে থাকাও এই সরকার মেনে নিতে পারেনি—পিটিয়ে ও টিয়ার গ্যাসে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সনাতন মাঠ ও রাজপথের যখন এই অবস্থা, তখন রাজনৈতিক দলের কর্মী এবং অনলাইন অ্যাকটিভিস্টরা রাজনীতির নতুন ক্ষেত্র ডিজিটাল মাঠে কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেখানেও আছে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের বীভৎস নিপীড়ন। এই করোনাকালে শুধু সরকারের সমালোচনা করার কারণে নির্দলীয় অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, সাংবাদিক, এমনকি কার্টুনিস্টকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের যত মামলা আমিসহ বিএনপির নেতা-কর্মীর ওপর ঝুলে আছে, সেই সংখ্যা অকল্পনীয়।

এই দেশের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দল বিএনপি। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার এবং প্রয়োজনে সেটা গ্রহণ করার মানসিকতা রাখে দলটি। তবে সমালোচনার ছলে বিএনপিকে হতোদ্যম ও ধ্বংস করার একটা চেষ্টাও জারি আছে। বিএনপি দুর্বলতর হতে থাকলে বর্তমান বিশ্বের পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির (আইডেনটিটি পলিটিকস) চরম ডামাডোলে দেশে কোন রাজনীতির উত্থান হতে পারে এবং তাতে দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে যেতে পারে, সেটা বোঝার মতো প্রজ্ঞা লেখকের আছে বলে বিশ্বাস করি।

সেই বিশ্বাস থেকেই আশা করি ভবিষ্যতে তাঁদের সমালোচনার উদ্দেশ্য থাকবে বিএনপিকে আরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দল হয়ে উঠতে সাহায্য করা। যাতে দলটি বাংলাদেশকে একটি সত্যিকার উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারে।

রুমিন ফারহানা: বিএনপির সাংসদ

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন