default-image

জনগণের ভোটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিগত নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিল৷ সেনাবাহিনীর মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ‘বিস্তারিত’ প্রকাশের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের’ অভিযোগ করেছিলেন৷ তিনি অবশ্য ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও তা প্রকাশের দাবি জানিয়েছিলেন৷ এখন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রস্তুত৷ প্রকাশপর্ব বাকি৷ এটা বিস্ময়কর যে, এত বড় একটি ঘটনার বিচার সম্পন্ন করার কৃতিত্ব সম্পর্কে এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল নীরবতা পালন করছে৷ দুজন কর্মকর্তাকে বিনা বিচারে এক বছর এবং বিচারের পর আরও এক বছর সেনা হেফাজতে রাখা আইনবহির্ভূত ও অভাবনীয়৷ এ বিষয়ে দ্রুত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করা হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সশস্ত্র বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে৷ আর সেটা এমন একটি প্রেক্ষাপটে, যখন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা অর্থাৎ মানবাধিকার রক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী শীর্ষস্থানটি (সংখ্যাগত) পুনরায় করায়ত্ত করেছে৷

ইন্ডিয়া টুডে ২০ জানুয়ারি ২০১২ প্রতিবেদন করেছিল: ‘ভারতের সহায়তায়’ ইসলামি উগ্রপন্থীদের মদদপুষ্ট একটি অভ্যুত্থান-চেষ্টা ব্যর্থ করা সম্ভব হয়েছে। দিল্লি থেকে ‘টারব্যুলেন্ট হাউস’ শিরোনামে ২৮ জানুয়ারি দি ইকোনমিস্ট একটি প্রতিবেদন ছাপে। এতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী দাবি করেছিলেন, বিশিষ্ট নাগরিকদের হত্যা-তালিকা ও ক্যুতে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী ‘জেনারেলদের তালিকা’রও খোঁজ মিলেছে৷ এ বিষয়ে রায়ে, শুনািনতে কী এসেছে, সেটা জানতে জনমনে কৌতূহল থাকাটাই স্বাভাবিক৷

বিদেশে অবস্থানরত একজন সন্দেহভাজন ইশরাক আহমেদ৷ তিিন ইকোনমিস্টকে বলেছিলেন, কোনো সৈন্য চলাচল হয়নি। বন্দুক ফোটেনি। কোনো কিছুই তাঁরা প্রমাণ করতে পারবে না৷ বিশ্বের নামকরা প্রায় সব মিডিয়ায় কথিত ক্যুর খবর এসেছিল এবং এটা চোখে পড়েনি যে কেউ এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তখন তেমন করে প্রশ্ন তুলেছিল৷ তাই এ ঘটনার রায়গুলো জনসমক্ষে আনার বিরাট প্রয়োজন রয়েছে৷ জেনারেল জিয়া ও এরশাদ আমলের কোর্ট মার্শালকে অনেক ক্ষেত্রেই সমীহ করা হয় না৷ সরকার ও তার মিত্ররা নিশ্চয়ই এখন বিতর্কিত অতীতকে টানবেন না৷
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সভাপতি ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেছিলেন, এর সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া জড়িত৷ ভারতীয় ওয়েবসাইট রেডিফডটকম ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ লিখেছে, বাংলাদেশের মানুষ এই প্রথম এ রকমের একটি বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারল। এটা সরকারের পরিপক্বতা এবং তার নিজের ওপর আস্থার প্রতিফলন৷ ভারতের মিডিয়ায় সামরিক বাহিনীতে ‘ইসলামি উগ্রপন্থার’ বিস্তারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল৷ ২০ জানুয়ারি ২০১২ এনডিটিভি খবর দিয়েছিল, অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়ার এক দিন পর র্যাব নিষিদ্ধঘোষিত হিযবুত তাহ্রীরের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সজীব ওয়াজেদ জয় এবং কার্ল সিওভাকো ২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর হার্ভার্ড ইন্টারন্যাশনাল রিভিউতে লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ইসলািম চরমপন্থা বাড়ছে, কারণ সামরিক বাহিনীতে ইসলামপন্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৬ সালের শেষ দিকে সশস্ত্র বাহিনীতে প্রায় ৩৫ শতাংশ মাদ্রাসাপড়ুয়া নিয়োগ পেয়েছেন৷’ ওই নিবন্ধের কথায় বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনীতে ইসলামপন্থীদের ‘ব্যাপক বৃদ্ধি’ লক্ষ করা যাচ্ছে৷ সুতরাং বিএনপির নেত্রীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগই কেবল নয়, সশস্ত্র বাহিনীতে ধর্মীয় চরমপন্থা বিস্তারের স্বরূপ অনুধাবন এবং সে ব্যাপারে অধিকতর সতর্কতার জন্য এই ক্যু মামলার বিস্তারিত জানাটা নাগরিক অধিকারের মধ্যে পড়ে৷ এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেও এটা জনগণকে জানতে দিতে হবে৷ কোনোভাবেই অসংগত গোপনীয়তার আশ্রয় কাম্য নয়৷
২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় সেনাসদরে এক সংবাদ সম্মেলনে গণতািন্ত্রক সরকারকে উৎখাত এবং সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের চেষ্টার পরিকল্পনা প্রকাশের সময় বলা হয়েছিল, এ বিষয়ে ভবিষ্যতে বিস্তারিত

জানানো হবে৷ এই অঙ্গীকার রাজনৈতিক দল করেনি৷ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে করেছিল৷ বলা হয়েছিল, জড়িত ব্যক্তিদের সংখ্যা ১৪ থেকে ১৬ জনের বেশি নয়৷ এখন আমরা প্রত্যেক অভিযুক্তের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই৷
বহু ক্ষেত্রে প্রশাসন যেচে পড়ে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি মিডিয়ার কাছে সরবরাহ করে৷ সাম্প্রতিক সাত খুনে এক মেজরের জবানবন্দি আমরা জানি না৷ এই ক্যু মামলায় ২০১২ সালে বেসামরিক আদালতে দেওয়া ওই দুই দণ্ডিতের এবং অন্যদের জবানবন্দি অপ্রকাশিত থেকে গেছে৷ ১১টি তদন্ত আদালত, ৭৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত এবং ১৬ কর্মকর্তার (মেজর জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ারসহ)
বিচার-প্রক্রিয়ার সামগ্রিক চিত্র প্রকাশে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার৷ কিন্তু তার ঘাটতি থাকলে প্রচলিত আইনের দুয়ার খোলা আছে৷ এখন মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আদালতের দরজায় করাঘাত করতে হবে৷
জেল সুপারের কাছে সেনাসদরের পাঠানো চিঠি থেকে চার বছরের জন্য দণ্ডিত লে. কর্নেল এহসান ইউসুফ, যিনি গত বিএনপি আমলে চাকরিচ্যুত হয়ে গত আওয়ামী লীগ আমলে পুনরায় চাকরি ফিরে পেয়ে ঘটনার অব্যবহিত আগে আবার চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন, তার অপরাধ লঘু বলে প্রতীয়মান হয়৷ কারণ, তিনি ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে তাঁর কর্তব্য থেকে বিচ্যুত করতে উদ্যোগী’ হয়েছিলেন। প্ররোচিত করতে সক্ষম হননি, চেষ্টা চালিয়েছিলেন৷ দুই বছরের জন্য দণ্ডিত অপর মেজর এ কে এম জাকির হোসেন৷ তিনি এক-এগারোতে ঢাকায় দুদকের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান মনিটরিং সেলে কাজ করেছিলেন৷ এ ঘটনার আগে তিনিও বাধ্যতামূলক অবসরে ছিলেন৷ তাঁর বিরুদ্ধেও ওই একই অভিযোগ একই বাক্যে আনা হয়েছে৷ উভয়ে ‘সিভিল অফেন্স’ করেছেন৷
ভুক্তভোগীর পরিবারগুলো আপিলের কথা হয়তো সহজে ভাববে না৷ কারণ, আইনে আপিল বারণ৷ কর্নেল তাহেরের মামলা তাদের কাছে আলোকবর্তিকা হতে পারে৷ মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, যিিন ২০০৫ সালে আয়োজিত এক সেমিনারে ১৯৫২ সালের আপিল নিরোধক বিদ্যমান সেনা আইনের সংশোধন চেয়েছিলেন৷ তিনি বললেন, ‘আমরা আজও পাকিস্তানি মডেল অনুসরণ করছি৷ তদন্তের আদেশদাতা, তদন্ত আদালত গঠন এবং তার সুপরিশ গ্রহণ-বর্জন মাত্র এক ব্যক্তিরই ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন৷ তার চেয়েও বড় কথা, সেই অাইনের প্রয়োগটুকুও দেখার মতো কেউ নেই৷ আইন এ ব্যাপারে নীরব৷’
ভারত ও পাকিস্তানের নজির টানব৷ ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ড. হরিস উপানো দণ্ডিত হন৷ ২০০৫ সালে তিনি মার্জনা চেয়ে দরখাস্ত করলে তা নাকচ করা হয়৷ নাকচের কারণ জানাটা তাঁর অধিকার—এই যুক্তিতে তথ্য অধিকার আইনে তিনি দ্বিতীয়বার দরখাস্ত করেন৷ সেটা নাকচ হয়৷ যুক্তি হলো, এটা আইনগত ও নৈতিকতা দ্বারা বারিত৷ তাই এটা বলা যাবে না। এর বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন৷ ২০০৮ সালের ৩১ জুলাই ভারতের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ওয়াজাহাত হাবিবুল্লা যা বললেন, সেটাই আমাদের আলোচ্য ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷ মি. হাবিবুল্লাহ রায় দিলেন, কোর্ট মার্শালের রায় আধা বিচারিক৷ তাই ‘স্বচ্ছতার নীতি’ মানতে হবে৷
২০০০ সালে কাশ্মীরে এক ভুয়া বন্দুকযুদ্ধে আমাদের র৵াবের সাত খুনের মতো ভারতীয় পাঁচ সেনা কর্মকর্তা সিবিআইয়ের কথায় ঠান্ডা মাথায় পাঁচ খুন করেন৷ কোর্ট মার্শাল তাঁদের খালাস দেন৷ গত মার্চে শ্রীনগরের মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে আইজিপি ও ভুক্তভোগীর পরিবার কোর্ট মার্শালের রায় চেয়ে নির্দেশনা চেয়েছিল। আদালত নির্দেশনা দেননি৷ কিন্তু এটা বলেছেন, কোর্ট মার্শালের রায় পাবলিক ডকুমেন্ট৷ তাই দরখাস্ত করলে সেনাবাহিনী তা প্রকাশ করবে।
কোর্ট মার্শালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল প্রবর্তন করতে হবে৷ রাষ্ট্রকে উত্তরোত্তর সভ্য হতে হবে৷ ২০০৭ সালে ভারত সব ধরনের সামরিক রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে অাপিল শুনতে আর্মড ফোর্সেস ট্রাইব্যুনাল (এএফটি) চালু করে৷ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ও লে. জেনারেল পদধারীদের নিয়ে গঠিত। গত সপ্তাহে দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে দেখি, ভারত এএফটিতে থেমে নেই৷ আপিলের আরও একটি নতুন ফোরাম খুলেছে৷ এএফটির রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দ্বারও খোলা হয়েছে৷ হিন্দু লিখেছে, দেখা যাচ্ছে, হাইকোর্টে ৯০ শতাংশ রায় উল্টে যাচ্ছে৷ সুতরাং আমাদের দেশে অন্তত একটি আপিল ফোরাম লাগবে৷
পাকিস্তানেও পরিবর্তনের ঢেউ আছড়ে পড়ছে৷ তাই বলছি, ভারতকে অনুসরণে এই একটি ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চেয়ে আমরা এগিয়ে থাকি৷ সামরিক বাহিনীর জন্য সরকার অনেক কিছু করছে৷ এটা করুন অগ্রাধিকারের সঙ্গে৷ ২০১১ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন আসে যে ‘অাইন সংশোধন করে জে. পারভেজ হত্যাচেষ্টা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ দেওয়া হোক। ভারতের মতো এএফটি চাই৷ কারণ, ৫২-এর সেনা আইনে আপিলের বিধান নেই।’ এ কথা বাংলাদেশের ’৫২-এর ওই একই আইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ২০১২ সালের ১৩ নভেম্বরে ডন-এর একটি শিরোনাম ‘সুপ্রিম কোর্ট সেনা আইনে সংশোধন চান’। প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ বলেন, ‘কোর্ট মার্শাল রায়ের সার্টিফাইড কপি ও অন্যান্য নথির সরবরাহ সহজ করতে হবে৷ এসব না পাওয়ার কারণে আপিলে অসুবিধা হয়।’ তাঁরা আরও বলেন, দোষী ব্যক্তির দোষটা কী, তা জানার অধিকার আছে। আইন না বদলিয়েও পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত কী উচ্চারণ করছেন, তা আমাদের কান পেতে শুনতে হবে৷ বেলুচিস্তানের চাঞ্চল্যকর গুমের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আমির হানি মুসলিম বলেছেন, সামরিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আপিল সুপ্রিম কোর্ট শুনবেন৷ (ডন, ২৭ মার্চ ২০১৪)
প্রথম আলো পত্রিকায় দণ্ডিত দুই কর্মকর্তার বিলম্বিত বিচারের খবর বেরিয়েছে। আমরা আর একটি সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানতে ও শুনতে চাই৷ কারণ, জনগণের জানার আগ্রহ প্রচণ্ড৷ আরও আশা করি, সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান প্রশাসন ভুক্তভোগীদের আইনের আশ্রয় লাভ থেকে নিবৃত্ত করবে না; বরং উৎসাহিত করবে। যত দূর সম্ভব পৃষ্ঠপোষকতা দেবে। আইন বদলাতে উদ্যমী হবে৷ আমরা আশঙ্কা করি, যাঁরা ইতিমধ্যে দণ্ডিত হয়েছেন, তাঁদের রায় ও অন্যান্য দরকারি নথিপত্র সরবরাহ করা হয়নি। প্রচলিত অাইনেই তাঁরা এটা পেতে পারেন৷ ভুক্তভোগী ও তাঁদের স্বজনদের উচিত হবে রায়ের কপি চাওয়া। শুনেছি, অন্তত একটি ক্ষেত্রে রায়ের কপি চাওয়া হলে লিখিতভাবে দরখাস্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আমরা স্বাগত জানাই।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷

mrkhanbd@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন