default-image

শুনতে অদ্ভুত মনে হবে। কিন্তু এটাই সত্য যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিদ্রোহ, সামরিক আইন এবং গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা আমেরিকানদের অতি সাধারণ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠার দিন খুব বেশি দূরে নয়। এসব শিগগিরই তাদের নিত্যদিনের আলোচনা হয়ে উঠবে। আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী রাজনীতি কত হিংসাত্মক দিকে যেতে পারে, তা মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারকে অপহরণের পরিকল্পনা করার অভিযোগে সেখানকার মিলিশিয়া নেতাদের গ্রেপ্তার করার এবং অঙ্গরাজ্যের সরকারকে উৎখাতে উসকানি ছড়ানোর ঘটনা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে।

আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে হানাহানির আশঙ্কা দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে। বেশির ভাগ নির্বাচনী জরিপে অনেক পিছিয়ে থাকা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে অঙ্গীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। উপরন্তু তিনি শ্বেতাঙ্গ মিলিশিয়া ও উগ্রপন্থীদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন এবং মেইল-ভোট থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন।

নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে যে সহিংসতা শুরু হতে পারে এবং কৃষ্ণাঙ্গ এবং অশ্বেতকায় আমেরিকানদের ওপর নির্বিশেষে হামলা হতে পারে, তার বিষয়ে ইতিমধ্যেই বহু প্রমাণ পাওয়া গেছে। ছয় কারণে আমেরিকানদের খুব খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

প্রথম কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভীষণ রকম অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। যে ধরনের অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হলে একটি ভূখণ্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধন ও গণহত্যা সংঘটিত হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি তা থেকে দূরে নয়। করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে, বেকারত্বের হার অনেক বেড়ে গেছে, ঘন ঘন আন্দোলন-বিক্ষোভ হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার আসছে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। এগুলো সহিংস পরিস্থিতি ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় কারণ হলো, দেশটির গণসহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

আদিবাসী আমেরিকানদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের গণহত্যা চালানো এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ক্রীতদাস বানানোর ইতিহাস তো আছেই। এর বাইরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিদের সঙ্গে এক হয়ে আমেরিকান সেনারা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। সর্বশেষ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে হত্যা ও নির্যাতন চালানোর বিষয়েও আমেরিকান সেনারা ভয়ংকর নজির রেখেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণে, বিশেষ করে অশ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের সাম্প্রতিক নিষ্ঠুর আচরণে ভোটারদের একটি বিরাট অংশ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। ট্রাম্প যদি হেরে যাওয়ার পরও ফল মানতে না চান তাহলে ব্যাপক বিক্ষোভ হবে। ট্রাম্পপন্থী উগ্র শ্বেতাঙ্গরাও তাদের মোকাবিলা করতে নামবে

অনেকেই মনে করেন, এসবের রেশ হিসেবেই ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করছেন, ছোট ছোট শিশুদের পর্যন্ত তাদের মা–বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আটক কেন্দ্র ও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে সেই নৃশংসতার রেশ এখনো রয়ে গেছে।

তৃতীয় কারণ হলো ট্রাম্প নিজে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ডানপন্থীদের বর্ণবাদী হিংসার দিকে যেতে উৎসাহিত করছেন। তিনি অশ্বেতকায় লোকদের প্রতি নানান সময় তাচ্ছিল্যপূর্ণ ও অপমানজনক কথা বলেন। তিনি মেক্সিকানদের ‘ধর্ষক’, মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী’ এবং লাতিনোদের ‘পশু’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি হাইতি এবং গোটা আফ্রিকার দেশগুলোকে ‘নোংরা রাজ্য’ বলেছেন। এখন তিনি নিয়মিতভাবে কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি চামড়ার আমেরিকানদের ‘দাঙ্গাকারী’ ও ‘বামপন্থী মৌলবাদী’ বলে গালি দিচ্ছেন। তাঁর এসব কথায় ঘৃণাসূচক অপরাধ বেড়ে চলেছে এবং শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে তীব্র অবিশ্বাসের জন্ম হচ্ছে।

চতুর্থ কারণ হলো, আমেরিকান সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে আইনি ভারসাম্য নষ্ট করে দেওয়া। ট্রাম্প গত চার বছরে একের পর এক প্রকাশ্যে আইনি বিধি নিয়ে ঠাট্টা–মশকরা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের মতো স্বাধীন ও নৈর্ব্যক্তিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রোগনিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা কেন্দ্রের মতো জনস্বাস্থ্য–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকীকরণ করেছেন। ভয়ংকর মানবতাবিরোধী অপরাধ করা অপরাধীদের তিনি বিশেষ ক্ষমতা খাটিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। উইসকনসিনে দুজন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে মেরে ফেলা একজন ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গ বন্দুকধারীকে সমর্থন করে তিনি বক্তৃতাও করেছেন। এগুলো উগ্রপন্থীদের সহিংস হয়ে ওঠার বিষয়ে উৎসাহ দেবে।

পঞ্চম কারণ হলো, ভোটের ফল মেনে না নেওয়ার আশঙ্কা। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, ফল যা-ই হোক তা মেনে নেবেন—এমন অঙ্গীকার তিনি এখনই করবেন না। অর্থাৎ তিনি হেরে গেলেও হোয়াইট হাউস ছাড়বেন এমন কথা তিনি দিতে নারাজ। এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর সমর্থকদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিলেন।

ষষ্ঠ কারণ হলো, পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহ। ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণে, বিশেষ করে অশ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের সাম্প্রতিক নিষ্ঠুর আচরণে ভোটারদের একটি বিরাট অংশ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। ট্রাম্প যদি হেরে যাওয়ার পরও ফল মানতে না চান, তাহলে ব্যাপক বিক্ষোভ হবে। ট্রাম্পপন্থী উগ্র শ্বেতাঙ্গরাও তাদের মোকাবিলা করতে নামবে। এ সংঘাত বেধে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

অ্যালেক্স হিন্টন: সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের পরিচালক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0