সাংসদ হাজি সেলিম ও তাঁর ছেলে ইরফান সেলিম
সাংসদ হাজি সেলিম ও তাঁর ছেলে ইরফান সেলিমছবি: প্রথম আলো

১.

ছিরু মোল্লা মেম্বারের জোয়ান ছেলে বাদশা মোল্লার বিরাট দাপট। তার চোটপাটে পাবলিকের জান কাঁই। সে ‘আজ এরে ধরে, কাল তারে মারে’। ছিরু মোল্লার ম্যালা পয়সা। সেই পয়সা খালি বাড়ে। পয়সা যেহেতু গরম জিনিস, সেহেতু তাঁর ছেলে বাদশা মোল্লার এই শীতকালেও গরম লাগে। গরম যত বাড়ে বাদশার তত নিজেকে ‘বদ-শাহ’ মনে হতে থাকে।

একদা এর খোপের মুরগি, ওর গোয়ালের ছাগল ছিনতাই করার বিষয়ে ছিরু মোল্লার নাম-ডাক ছিল। পরে তাঁর প্রমোশন হলো। ওসব ছোটখাটো কাজে তাঁর পোষাল না। তিনি এসব ছ্যাঁছড়ামি ছেড়ে ছুড়ে জনপ্রতিনিধি হয়ে লোকজনের জমি দখলের পেশায় আত্মনিয়োগ করলেন। এই পেশায় আয় উন্নতি ভালো। তিনি একের পর এক জায়গা জমি দখল করতে লাগলেন। কারও জমির কাগজপত্রে ঘাপলা আছে টের পেলেই তিনি সেখানে খাবলা বসাতে থাকলেন। রাস্তার পাশে সরকারি ডোবা কিংবা অব্যবহৃত খাস জায়গা দেখলেই তিনি সেখানে ‘এই জায়গার প্রকৃত মালিক হাজি ছিরু মোল্লা গং’ শীর্ষক সুলিখিত সাইনবোর্ড পুঁতে দিতে লাগলেন। দখল পোক্ত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে তাঁর নিজের ‘সিকিউরিটি গার্ড’ বাহিনী মোতায়েন করা থাকল। পরে সেই অবৈধ জায়গায় হয় নিজের বৈধ কোম্পানির ফ্যাক্টরি বসালেন, নয়তো বৈধ বউ বা শালীর নামে অবৈধ মার্কেট ওঠালেন।

ছোট বেলা থেকে হাত মশকো করতে করতে বাপের প্রভূত অর্থকরী এই পেশা বাদশা মোল্লা ভালোই রপ্ত করেছেন। তিনিও এখন যথেষ্ট ভূ-সম্পত্তি কবজা করার এলেম হাছেল করে ফেলেছেন। কেউ জায়গা ছাড়তে না চাইলে বা কোনো রকম অ্যাঁওম্যাঁও করলেই তাঁকে পৈতৃক পাইপগানের নলটা এক নজর দেখিয়ে আসেন। তাতেই কাজ হয়। তবে তাঁর দশা হয়েছে ‘সূর্যের চাইতে বালি গরম, পুষ্কুরণির চাইতে প্যাঁক ঠান্ডা’র মতো। ছিরু মোল্লা যে কোনো গরম পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন। বাদশা মোল্লা সেটা পারেন না, তিনি যাকে তাঁকে চড় থাপ্পড় মেরে বসেন। এতে তাঁকে তেমন কোনো ফ্যাকড়ায় পড়তে হয় না।

কিন্তু সেই বাদশা মোল্লার আজ কাহিল অবস্থা। উঠোনে তিনি টান টান হয়ে পড়ে আছেন। দুই তিনজন তার সারা গা দলাইমলাই করছেন। ম্যাসাজ করার সময় ফাঁকেজোকে দু একটা কিল ঘুষিও তাঁকে মারা হচ্ছে। বাদশা খানিকক্ষণ পর পর ‘ওরে মা! ওরে মা!’ করছেন। তাঁর এই মুহুর্মুহু মাতৃ আবাহনের কারণ, কিছুক্ষণ আগে তাকে ‘কারেন্টে ধরেছে’। সে এ দফায় ফাইনালই হয়ে গিয়েছিল। কয়েকজন এসে উদ্ধার করায় তিনি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছেন। এখন তাঁকে ‘ম্যাসাজ’ থেরাপি দেওয়া হচ্ছে।

ঘটনা হলো, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন বাদশা মোল্লার সদ্য দখল করা জমির ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তার টেনেছিল। বাদশা মোল্লা খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে সরকারি লোকজনকে মারধর করেছেন। এই বিদ্যুতের তার যেন দুই মিনিটের মধ্যে তার জমি থেকে সরানো হয়, তিনি সেই হুকুম দিয়েছিলেন। কিন্তু হুকুম তামিল হওয়া পর্যন্ত তাঁর তর সয়নি। রাগের চোটে তিনি নিজেই বিরাট একটা কাঁচা বাঁশ নিয়ে বাড়ি দিয়ে সেই তার ছিঁড়তে গেছেন। বাঁশ ছিল ভেজা। বিদ্যুৎ সেই বাঁশ বেয়ে নেমে বাদশা মোল্লাকে একটা বৈদ্যুতিক বাড়ি মেরেছে। তারপর তার আর কিছু মনে নেই। পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন বিভাগের ওপর পাওয়ার খাটাতে গিয়ে এখন তার মরার দশা।

উঠোনে পড়ে থাকা ছেলের এই দশা দেখে ছিরু মেম্বার মহাবিরক্ত। তিনি বাদশা মোল্লার ক্রমাগত ‘মারে-বাবারে’ বলে গোঙানি দেওয়া শব্দবন্ধের মধ্যে এক রত্তি মাতৃভক্তি বা পিতৃবন্দনা দেখলেন না। তিনি ছেলেকে কড়া ধমক মারলেন,—‘মুস্তানি কইরে বাড়ি মারার আর জায়গা পাও নাই! বাড়ি মারতি গেছ গরমেন্টের মাথায়! হারামজাদা বেকুব কুনহানকার!’

বিজ্ঞাপন
default-image

২.

পুরান ঢাকার সাংসদ হাজি সেলিমের ছেলে ও ওয়ার্ড কমিশনার ইরফান সেলিমকে বহনকারী গাড়ি সম্প্রতি একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। মোটরসাইকেলটির আরোহী ছিলেন নৌ বাহিনীর একজন কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রী। গাড়িটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর ওই কর্মকর্তা মোটরসাইকেলটি চালিয়ে ধাক্কা দেওয়া গাড়িটি থামান। ড্রাইভারের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর ইরফান সেলিম বেরিয়ে এসে কর্মকর্তার সঙ্গে তর্কে জড়ান। ওই কর্মকর্তা নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও ইরফান সেলিম ও তাঁর লোকজন তাঁকে মেরে রক্তাক্ত করেন। এরপর র‍্যাব পুরান ঢাকার বড় কাটরায় হাজি সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় অস্ত্র, মাদক, দুরবিন, ওয়াকিটকি, ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি সেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। ইরফানের নামে মাদক রাখা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়। তিনি এখন কারাগারে। তাঁকে দুই দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে কাউন্সিলর পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এরপরই হাজী সেলিমের জায়গা দখলের কাহিনি বের হতে থাকে।

default-image

পুরান ঢাকায় হাজি সেলিম অগ্রণী ব্যাংকের যে জায়গা দখল করেছিলেন তা অগ্রণী ব্যাংক আবার ফেরত পেয়েছে। সোনারগাঁয়ে ১১ বিঘা সরকারি সম্পত্তি দখল করে তিনি যে মিল ফ্যাক্টরি গড়েছেন তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হল তিনি দখল করেছেন। এর মধ্যে তিব্বত হলটিকে তিনি স্ত্রীর নামে মার্কেট বানিয়েছেন। এসব সম্পত্তিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। হাজী সেলিমের পুরোনো মামলার ফাইলগুলো আবার খোলা হচ্ছে। একটা শনির দশা যেন তাঁকে ঘিরে ধরেছে।

[ বিশেষ দ্রষ্টব্য: ওপরের ১ এবং ২ নম্বর ঘটনার মধ্যে কেউ মিল খুঁজতে চাইলে নিজ দায়িত্বে খুঁজবেন। এই দুই ঘটনায় মিল থাকলে তা হবে কাক এসে বসার পর কাকতালীয়ভাবে তাল পড়ার মতো। ]

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

sarfuddin2003@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0