বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আলু আর মঞ্জু নামের বড় গরু দুটি জজ মিয়ার হাতে ‘মানুষ’। মানুষই বললাম। সন্তানকে না খাইয়েও যারা গরুকে খাওয়ায়, জজ মিয়া তেমন ধরনের কৃষক। এ দুটিকে বাছুর অবস্থায় কিনেছিলেন, এখন মোটামুটি এঁড়ে থেকে ষাঁড় হয়ে গেছে। এ দুটির সঙ্গে নতুন আরেকটি বাছুরও তিনি পালেন। ওটাকে তাঁর কাছে পালতে দিয়েছে ওই গ্রামে জমি কিনে রাখা এক ঢাকাই ভদ্রলোক। পেলে বড় করলে তিনি থোক মজুরি পাবেন কোরবানির সময়।

জজ মিয়ার জমিজমা সামান্য। বাড়ির সামনের নিচু জমিতে সেবার বেগুন চাষ করেছিলেন। তারপর লাগাবেন রসুন। কিন্তু এ দিয়ে কী আর হয়? তাই গরু পালছিলেন, যাতে কোরবানির সময় হজরতপুরের পশুর হাটে বিক্রি করতে পারেন। ভালো দাম পেলে খরচ তো উঠবেই, তার ওপর বাড়তি টাকা দিয়ে চাষবাসের ব্যবস্থাও হয়ে যাবে।

গত রোজার সময়ের ঘটনা। আমরা গ্রাম দেখা লোক, নদী পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জজ মিয়ার বাড়িতে ঢুকে পড়ি। বাড়িতে কেবল একটি শীর্ণকায়া নারী। বললেন, ছেলেরা মাঠে খেলছে আর স্বামী গেছেন গরুর খাবার ‘টোকাইতে’। লকডাউন ইত্যাদির ধাক্কায় তখন বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি। তার মধ্যে গরুর জন্য ছোলা-ভুসি-খইল জোগাড় করা বিরাট পেরেশানি। সেসব সেরে ঠিক ইফতারের আগে জজ মিয়া এলেন। বছর পঞ্চাশের একটা ভাঙাচোরা মানুষ। চোয়াল বসা, চোখের মণি প্রায় নিভন্ত।

বাড়ি ফিরে কারও সঙ্গে কথা না বলে জজ মিয়া ঘরের পেছনে চলে গেলেন। সঙ্গে আনা ভুসি খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে গরুর চাড়িতে দিলেন। তারপর আমাদের দিকে তাকালেন। জজ মিয়ার বউয়ের নামটা সুন্দর—মঞ্জুরি। মঞ্জুরি বেগম বলছিলেন, পোলার বাপের কয়েক দিন ধরে জ্বর। হয়তো করোনাই হবে। আমরা সাবধান হয়ে গেলাম। তা ছাড়া সদ্য করোনা-উত্তীর্ণ হওয়ায় মনে সাহসও ছিল। যা হোক, জ্বরের কথায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘মহেশ’ গল্পটার কথা মনে পড়ল।

গরুকে খাবার দিতে পারে না গরিব চাষি গফুর। বাপ-মেয়ের সংসার। নিজের ঘরের চাল থেকে খড় চুরি করে খাওয়াতে গেলে মেয়ের কাছে ধরা পড়ে অসহায় বাবা। মেয়ে বকা দেয়: মহেশকে আবার চাল ফেড়ে খড় দিয়েচ বাবা?
শরৎচন্দ্র লিখছেন: ঠিক এই ভয়ই সে করিতেছিল, লজ্জিত হইয়া বলিল, পুরোণো পচা খড় মা আপনিই ঝরে যাচ্ছিল—
আমি যে ভেতর থেকে শুনতে পেলাম বাবা, তুমি টেনে বার করচ?
না মা, ঠিক টেনে নয় বটে
কিন্তু দেওয়াল্টা যে পড়ে যাবে বাবা—
গফুর চুপ করিয়া রহিল। একটিমাত্র ঘর ছাড়া যে আর সবই গিয়াছে এবং এমন করিলে আগামী বর্ষায় ইহাও টিকিবে না, এ কথা তাহার নিজের চেয়ে আর কে বেশি জানে? অথচ এ উপায়েই বা কটা দিন চলে।

এই গফুর জ্বরে মুখে অরুচি ধরার অজুহাতে নিজে না খেয়ে মহেশকে সেই ভাত খাওয়ায়। অথচ রাতের খাবার জুটবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। আমাদের জজ মিয়াকে দেখলাম, তাঁর স্ত্রী মঞ্জুরি বেগমকে দেখলাম। জ্বর বলে রোজা ছিলেন না জজ মিয়া। কিন্তু তাঁর বউ রোজা। আগের রাতে ভাত খেয়ে শুয়েছেন, ভোরবেলা উঠে রোজার নিয়তে একটু পানি খেয়েছেন। আর এখন ইফতার ভাঙলেন সেই পানি দিয়ে। রাতের বেলা ভাত খাবেন, ধলেশ্বরী নদী থেকে ধরা গুলশা মাছ দিয়ে ভাত। ইফতার নেই, সাহ্‌রি নেই। কিন্তু গরুর খাবারে কোনো কামাই নেই।

জজ মিয়ার ছেলে সেই সন্ধ্যায় আমাকে বলেছিল, খেলতে বেশি ভালো লাগে। কারণ, খেলার সময় ক্ষুধার কথা মনে থাকে না। বেশি ক্ষুধা লাগলে কারও জমি থেকে শসা বা মুলা কিংবা টমেটো তুলে খায়। স্কুল বন্ধ। বাবার দিনমজুরি বন্ধ। শুধু গরু তিনটিই তাদের আশার বাতিটা জ্বালিয়ে রেখেছে। আড়াই মাস পর কোরবানির ঈদ আসবে, তখন গরুগুলো বিক্রি হবে আর তারা আবার একটু ভালো করে খাওয়াদাওয়া করবে, বউ-বাচ্চার শাড়ি-জামা হবে।

সেই ঈদ তো এসে গেল। হাটভর্তি গরু ঠিকই আছে। প্রথম দিকে দামও ভালোই পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু ঈদের তিন দিন আগে দাম পড়তে শুরু করেছে। সিলেট মহাসড়কের ভুলতার কাঞ্চন ব্রিজের বাঁয়ে শিমুলিয়া ঘাটের পরে বিশাল হাট দেখলাম। নৌকায় করে যত গরু আসছে হাটে, তার ভগ্নাংশও বিক্রি হয়ে নৌকায় কিংবা ট্রাকে কিংবা ক্রেতার হাতে যাচ্ছে না। ক্রেতার অভিযোগ, দাম নাকি চড়া। দাম তো চড়াই হবে। করোনার সময়ে গরিব আরও গরিব হয়েছে। গরুর খাবার সব কিনতে হয়। সেসব বাবদ খরচও এবার বেশিই হয়েছে। অনেকে কিস্তির ঋণ নিয়ে লাভের আশায় গরু পেলেছেন। তারপর সারা বছর ধরে লালন-পালন করা, গরুর থাকার ঘরে সারা রাত ফ্যানের পাখা ঘোরানো, চিকিৎসা ইত্যাদির খরচ ধরলে দাম আরও বেশিই হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার কৃষক নিজের মেহনতের মূল্য বাদ দিয়েই লালিত ফসল কিংবা পালিত পশুর দাম ধরেন। সেটাও এবার পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ।

কোরবানির অর্থ হলো ত্যাগ। সত্যিকার ত্যাগ এই গরুপালকেরাই করেন। সন্তানের মতো আদরে তাঁরা বাছুরগুলোকে বড় করেন। কৃষকের কিশোরী কন্যা বা পুত্র তাদের মায়ায় আগলে রাখে। বিক্রির সময় কৃষকও কাঁদেন, তাঁদের সন্তানেরাও আহাজারি করে।

গরু ও গফুরের গলায় অভাবের রশি আলগা করার কেউ নেই। অথচ এবারে যে খাদ্যাভাব দেখা দিল না, তার কারণ কৃষক করোনার মধ্যেও ভালো ফসল ফলিয়েছেন। ২০১৯ সালের চেয়ে ২০২০ সালের কৃষির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশ বেশি। যে আড়াই কোটি নতুন দরিদ্র যোগ হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই শহরের, এটাও অর্থনীতিবিদেরা আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু মহামারির মধ্যে সবচেয়ে ভরসা যাঁরা হলেন, তাঁরা কী পেলেন? ধনী আরও ধনী হলেন, বড় ব্যবসায়ীরা সরকারি অনুদান পেলেন, পোশাক কারখানার মালিকেরা রপ্তানি চালু রাখার যুক্তিতে অনেক ছাড় আর অনেক সহায়তা পেলেন, কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা চালু রাখা এবং গবাদিপশুতে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা ছোট খামারিরা কী পেলেন?

কোরবানির অর্থ হলো ত্যাগ। সত্যিকার ত্যাগ এই গরুপালকেরাই করেন। সন্তানের মতো আদরে তাঁরা বাছুরগুলোকে বড় করেন। কৃষকের কিশোরী কন্যা বা পুত্র তাদের মায়ায় আগলে রাখে। বিক্রির সময় কৃষকও কাঁদেন, তাঁদের সন্তানেরাও আহাজারি করে। তবু পেটের দায় মেনে তাঁরা আদরের গরুটিকে বিক্রি করে দিয়ে চোখের জলে ভাসেন। আদরের প্রাণীটিরও চোখের কোনায় কান্নার কালো দাগ গভীর হয়। এই কান্নার কোনো দাম হয় না, কিন্তু প্রতিদান দিয়ে অন্তত মূল্যটা তো দিতে পারি, না?

সরকার চাইলে পারে। বিক্রি না হওয়া গরুপিছু ঋণ দিতে পারে। বড় বড় মাংস কোম্পানির সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে, যাতে ধারাবাহিকভাবে তারা অবিক্রীত গরু-ছাগল কিনে নিতে পারে। ফেসবুকে দেখেছি, অনেক প্রবাসী সজ্জন মানুষ গরিবদের সহায়তার জন্য গরু কোরবানি দিতে চান। তাঁরা এমন কোনো বিশ্বাসী সংস্থা খুঁজছেন, গরু কেনার টাকা পাঠালে যারা ধর্মীয় রীতি মেনে কোরবানির মাংস গরিবদের কাছে পৌঁছিয়ে দেবে। সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য গরু কোরবানি দিচ্ছে।

সেভাবে কি দরিদ্রদের জন্য, যারা গরুর মাংসের স্বাদ আর পুষ্টির জন্য কোরবানির সময়ের জন্য চাতকের মতো অপেক্ষা করে, তাদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় গরু কোরবানির ব্যবস্থা করতে পারে না? তাতে কৃষক ও খামারিরা অন্তত গরুর ন্যায্য দাম পাবেন আর অভাবীরাও করোনার সময়ে জরুরি প্রোটিনের ঘাটতি কিছুটা মেটাতে পারবে।

গ্রামের কৃষক কখনো বেইমানি করেন না বলেই সরকারি গুদামে এখনো ১৫ লাখ মেট্রিক টন চাল মজুত আছে। তাঁরা চ্যালেঞ্জ নেন বলেই ভারত গরু রপ্তানি বন্ধ করলেও কৃষকেরা এক বছরের মধ্যে গবাদিপশুর চাহিদা মিটিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদানের সময় আমরা ভদ্রলোকেরা, আমাদের সরকার, আমাদের নেতানেত্রীরা যেন তাঁদের বঞ্চনা না করেন।

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক।
[email protected]

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন