ঘরে-বাইরে খেলছেন ইরানের শাসকেরা

বিজ্ঞাপন
default-image

বিশ্ব রাজনীতির এখন কেন্দ্রীয় চরিত্র ইরান। মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানির হত্যা, ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা, মিসাইলের আঘাতে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস, ভুল স্বীকার করে ইরানের দায় মেনে নেওয়া, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির তেহরান সফর—এসবের মধ্য দিয়েই গত কয়েক দিন ইরানকেন্দ্রিক রাজনীতি অতিবাহিত হয়েছে। রোববারেই ইরাকে আরও দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে রকেট হামলা হয়েছে। ইউক্রেনীয় বিমান ধ্বংস বিষয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হচ্ছে তেহরানে। বিক্ষোভে সমর্থন দেওয়ায় যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতকে আটক করেছিল ইরান। আবার যুক্তরাজ্যবিরোধী বিক্ষোভও হয়েছে। ঘেরাও হয়েছিল যুক্তরাজ্যের দূতাবাস। পতাকাও পোড়ানো হয়েছে যুক্তরাজ্যের। সব মিলিয়ে দ্রুতই নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এবং পরিস্থিতি এতটাই অননুমেয় যে যুদ্ধ-যুদ্ধংদেহী মনোভাবের মধ্যেই হুট করেই আলোচনা শুরু হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় তেহরানে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর। আগেও একইভাবে বিমান ধ্বংস হয়েছে। আল–জাজিরার তথ্যানুসারে ২০০১ সালে ইউক্রেনের মিসাইলের আঘাতে রাশিয়ার একটি বিমান ধ্বংস হয়। নিহত ৭৮ জনের অধিকাংশই ছিলেন ইসরায়েলে নাগরিক। ২০১৪ সালে এই ইউক্রেনেই মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বিমান রুশ মিসাইলের আঘাতে ধ্বংস হয়। এই ঘটনায় ২৯৮ জন যাত্রী নিহত হন।

১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরান এয়ারের এয়ারবাস বোয়িং ধ্বংস করে ২৯০ জন যাত্রীকে হত্যা করে। যুক্তরাষ্ট্র এর দায়দায়িত্ব বা ভুল স্বীকার করেনি। বরং হামলাকারী কমান্ডার উইল সি রজার্সকে পুরস্কৃত করে। তবে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ১০১ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়। ১৯৮৩ সালে রাশিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিমান ধ্বংস করে। এই ঘটনায় ২৬৯ নিহত হন। ধ্বংসের পাঁচ দিন পর সোভিয়েত ইউনিয়ন হামলার কথা স্বীকার করে। ১৯৮৭ সালে ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান লিবিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করে সিনাই মরুভূমিতে। এতে ১০৮ জন নিহত হন।

আল–জাজিরার হিসাবমতে, ১৯৭৩ সাল থেকে ৭টি যাত্রীবাহী বিমানে হামলা করে ধ্বংস করা হয়েছে। হামলার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন দেশ দায় স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দায় স্বীকার বা দুঃখ প্রকাশ করেনি; বরং হামলার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। এ ছাড়া মালয়েশীয় বিমান ধ্বংস করার বিষয়েও ইউক্রেনের বিদ্রোহীরা দায় স্বীকার করেনি। ইউক্রেন দাবি করছে, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর দুই সাবেক সদস্য এই হামলার সঙ্গে জড়িত রয়েছে।

ইরান কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা করেছে?
মিসাইল আঘাতের সঠিক তথ্য কখনোই জানা যাবে না। তবে কিছু সম্ভাব্যতা অনুমান করা যায়। ধরা যাক ইরান ইচ্ছা করেই হামলা করেছে। কারণ হতে পারে ইরান জেনারেল সোলাইমানির হত্যা, মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল হামলা ও পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট উত্তেজনা থেকে নজর সরিয়ে নেওয়ার জন্য হামলা করেছে। ইরান জানত না ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পর মার্কিন প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। তাই যাত্রীবাহী বিমানে হামলা করে সবার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে। এটা নিয়েই কিছুদিন হইচই হবে। এই সুযোগে ইরান ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে জেনারেল সোলাইমানির শূন্যতা পূরণে কাজ করবে। ভুল বা কারিগরি ত্রুটির জন্যও মিসাইলটি আঘাত হানতে পারে। মিসাইলটি সম্ভবত রাশিয়ার তৈরি ছিল। প্রযুক্তিগত উন্নতির এই যুগে কারিগরি ত্রুটি খুব বেশি গ্রহণযোগ্য নয়। শেষ অনুমান হচ্ছে, বিমানটিতে ভুল করেই আঘাত করা হয়েছে। ঘটনা যা-ই হোক, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

ইরান কেন স্বীকার করে নিল?
সুবিধা নেওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবেই ইরান দায় স্বীকার করতে পারে। এমনিতেই ইরান নানাবিধ চাপে আছে। এ অবস্থায় পুরোপুরি অস্বীকার করলে ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হবে। ইরানের ওপর দিয়ে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ হতে পারে। ইরান দায় স্বীকার করায় বড়জোর আর্থিক জরিমানা করা হবে। এখানে ইরান হিসাব করে দেখেছে, দায় স্বীকার করলে ক্ষতি কম। তাই দায় স্বীকার করেছে। এর আগেও ভুল করে বিমান ধ্বংসকারীদের তেমন কোনো সাজা বা ক্ষতি হয়নি।

এ ছাড়া দায় স্বীকার করে ইরান নতুন ইমেজ গঠনের চেষ্টা করছে। ইরানের আয়াতুল্লাহ–শাসিত সরকারব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। সেখানে গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতাকে ক্রমেই সংকুচিত করা হয়েছে কর্তৃত্ববাদী শাসনের মাধ্যমে। সম্প্রতি কঠোরভাবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করা হয়েছে। তাই বহির্বিশ্বের কাছে স্বচ্ছ ইমেজ গঠনের চেষ্টা করছে ইরান। নানবিধ চাপে থাকা ইরান নতুন করে আর কোনো দেশের সঙ্গে তিক্ততাও সৃষ্টি করতে চাচ্ছে না।

ইরানে বিক্ষোভ উসকে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকার ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করবে। বিভিন্ন ধরনের অবরোধ আরোপসহ যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকে উসকে দিতে পারে। অবরোধের কারণে এমনিতেই ইরানের নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাসক পরিবর্তনে কাজে লাগাতে পারে। বিমানে ধ্বংসের দায় স্বীকারের পরপরই একদল লোক বিক্ষোভ করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভে সংহতি জানিয়ে টুইট করেছেন। যুক্তরাজ্যের দূত ওই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, ইরান সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও বিক্ষোভকারীরা সোলাইমানিকে হত্যার দায়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

তবে মনে হয় না এই বিক্ষোভ দিয়ে ইরানের শাসকদের টলানো যাবে। আয়াতুল্লাহদেরও জনসমর্থন রয়েছে। জেনারেল সোলাইমানির শেষকৃত্যে জনতার ঢল এর প্রমাণ। এর আগেও একাধিকবার বিক্ষোভ হয়েছে। পাল্টা সমাবেশও আয়াতুল্লাহপন্থীরা করেছে। আয়াতুল্লাহবিরোধী বিক্ষোভের মূল দুর্বলতা হচ্ছে অতিমাত্রায় পশ্চিমা সমর্থন-নির্ভরতা। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের ভাবমূর্তি মুসলিম দেশগুলোতে ইতিবাচক না। যুক্তরাষ্ট্রকেই এখন সন্ত্রাসী রাষ্ট্র মনে করে অনেকে। আল–কায়েদা, আইএস যদি সন্ত্রাসীদের অপ্রাতিষ্ঠানিক শক্তি হয়, তবে সন্ত্রাসকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই জনসাধারণকে সম্পৃক্ত না করে শুধু পশ্চিমের সমর্থন নিয়ে ইরানের শাসকদের ফেলা কঠিন। বড়জোর আরেকটি সিরিয়া বানানো যেতে পারে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প বা যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো কিছুর পক্ষে থাকে, তখন ওই আন্দোলনের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ওই আন্দোলনের বিপক্ষে লোকের অভাব হয় না। এ ছাড়া ইসরায়েলের সমর্থন নিয়ে কোনো গণবিক্ষোভ তৈরি করা সম্ভব না।

ধীরে খেলতে চায় ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ইরানের কৌশল হবে সময় ক্ষেপণ করা। এই কৌশলের অংশ হিসেবেই ইরান হামলার পর দায় স্বীকার করতে কিছুটা সময় নিয়েছে। একই পদ্ধতি ইরান পরমাণু সংকটেও প্রয়োগ করেছে। একদিকে আলোচনা, আরেক দিকে পরমাণু কর্মসূচি অব্যাহত রাখা। ইরান ‘নন কো-অপারেটিভ ইনফনিটিভ গেম’ খেলছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে। সামরিক শক্তির পার্থক্য মোকাবিলায় সময়ক্ষেপণের কৌশল অবলম্বন করাই ইরানের জন্য লাভজনক হবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান করতে চাইবে। ধীরগতির খেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ইরান নয়, জেনারেল সোলাইমানির ছায়ার সঙ্গেও লড়তে হবে। এর সঙ্গে যদি চীন, রাশিয়ার অদৃশ্য সমর্থন যুক্ত হয়, তবে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে থাকবে না। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের তৈরি ফাঁদে আটকে পড়বে। যে ফাঁদে তারা সিরিয়ায় আটকে আছে। না বের হতে পারছে বা টিকে থাকতে পারছে।

সংকট কি আরও ঘনীভূত হবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধই অনিবার্য বলে মনে হতে পারে। তবে যুদ্ধ না-ও হতে পারে। বরং শিগগির ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপ হলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার পর উভয় পক্ষ হুমকি–ধমকি দিলেও খুব বেশি আক্রমণাত্মক ছিল না। যত দূর জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করল কোনো দেশ। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা কোনো হামলা করেনি। উভয় দেশই দাবি করেছে যে উভয় দেশই ভয় পেয়েছে। এটা প্রমাণ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যাওয়ার জন্য খুব বেশি আগ্রহী না। মান রক্ষার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই হামলা করবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোথাও কোনো একটা করিডর বা প্যাসেজ খোলা আছে বলে ধারণা করা হয়। সেই প্যাসেজ হতে পারে কাতার ও ইরাক। কাতারের আমির ইরান সফরে কূটনৈতিকভাবে সংকট সমাধানের কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রহেই এই সফর হচ্ছে বলে কথা প্রচলিত আছে। নিশ্চিতভাবেই এই সফরে উত্তেজনা প্রশমন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, উভয় পক্ষই সমঝোতার পথ অনুসন্ধান করছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে বিনা শর্তে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। কারণ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাউকেই নির্মূল করা সম্ভব হবে না। এত কিছুর পরও যুদ্ধ হতে পারে যদি সৌদি আরব ও ইসরায়েল লবি সফল হয়। বিশেষ করে ইরানের শাসকদের পতন ইসরায়েলের সম্প্রসারণ ও টিকে থাকার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।

ড. মারুফ মল্লিক: ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব অরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব বন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন