বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এর মাত্র আট বছর পর, জাপান-চীন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চীন তাইওয়ানকে স্থায়ীভাবে জাপানের কাছে সমর্পণ করে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত তাইওয়ান জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনে ছিল। ১৯৫১ সালে ‘সান ফ্রান্সিসকো শান্তি চুক্তি’র আওতায় জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানকে মুক্ত করে। এরপর থেকে তাইওয়ান স্বশাসিত। অন্যভাবে বলা যায়, ১২৬ বছর ধরে তাইওয়ান চীনের বৈধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সব চিহ্নই তাইওয়ানের এখন আছে। অধিকাংশ তাইওয়ানবাসী সেটাই চান। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দ্বীপটিকে চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে উদ্‌গ্রীব। ১৯৫০-এর দশকে মাও সে–তুং যেভাবে তিব্বতকে চীনের অংশ করে নিয়েছিলেন ‘পুনরেকত্রীকরণ’-এর নামে, সি চিন পিং সেটাই করতে চাইছেন। তাইওয়ানে চীন হামলা চালালে সেটা বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চীনের সঙ্গে ‘আরও বেশি সমঝোতামূলক’ কৌশল নিয়েছেন। এটাই সম্ভবত প্রেসিডেন্ট সির আত্মবিশ্বাসের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। হিমালয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের ১৭ মাসের সামরিক সংঘাতকেও বিবেচনায় নিতে পারেন তিনি। চীন সীমানা লঙ্ঘনের উদ্দেশে্য সেখানকার সীমান্তে বড় সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। চীন যদি এ ক্ষেত্রে চাপের মুখে পড়ত, তাহলে তাইওয়ানের ব্যাপারে চীনকে অন্তত ভাবতে হতো।

এটা সত্য যে চীনের স্থল, পানি ও আকাশপথে অভিযান এড়ানোর জন্য তাইওয়ানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা খুব জরুরি। কিন্তু তাইওয়ান সরকার যদি চীনের সঙ্গে তার ‘অসম’ সামর্থ্য দূর করতে আমেরিকার সঙ্গে একটি চুক্তিও করে, তারপরও চীনা ড্রাগনের শ্বাস রোধ করার উপযুক্ত ‘শজারু তাইওয়ান’ তৈরি হতে কয়েক বছর লেগে যাবে।

কেবল একটা বিষয়ই তাইওয়ানকে আবার উপনিবেশ বানানো থেকে চীনকে বিরত রাখতে পারে। তাদের যদি এই ধারণা হয় যে এটা শুধু চীনের ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে না, বাস্তবে তারা বড় ক্ষতির মুখেও পড়বে। পাশাপাশি তাইওয়ানকে রক্ষায় আমেরিকা সামরিক সমাবেশ ঘটাবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে অবশ্যই এ ধরনের স্ফটিক স্বচ্ছ বার্তা দিতে হবে। কিন্তু তিনি কি তা করছেন? ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা ছাড়ার আগে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকার ‘কৌশলগত নীতি’ সম্পর্কিত নথি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে সুপারিশ করা হয়েছে, চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের যে ‘অসম’ সামর্থ্য, তা বাড়াতে আমেরিকা সহযোগিতা করবে।

এই কৌশল আমেরিকার কয়েকজন সাবেক সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছেন। দেশটির অবসরপ্রাপ্ত নৌ-কর্মকর্তা জেমস স্টাভরিডিস এই কৌশলকে ‘শজারুর কঁাটা’ কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর ফলে বড় কোনো আগ্রাসী তাইওয়ানকে যাতে হজম করতে না পারে। তাইওয়ানে যদি চীন আগ্রাসন চালায়, তবে চীনকে সেখানে রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী গেরিলাযুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে।

এটা সত্য যে চীনের স্থল, পানি ও আকাশপথে অভিযান এড়ানোর জন্য তাইওয়ানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা খুব জরুরি। কিন্তু তাইওয়ান সরকার যদি চীনের সঙ্গে তার ‘অসম’ সামর্থ্য দূর করতে আমেরিকার সঙ্গে একটি চুক্তিও করে, তারপরও চীনা ড্রাগনের শ্বাস রোধ করার উপযুক্ত ‘শজারু তাইওয়ান’ তৈরি হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। হানাদারদের ওপর যাতে কার্যকর গেরিলা হামলা চালানো যায়, সে জন্য তাইওয়ানের বেসামরিক নাগরিকদের বড় অংশকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সে পর্যন্ত চীনকে ঠেকিয়ে রাখার একমাত্র কৌশল হচ্ছে যুদ্ধের হুমকি দেওয়া। পশ্চিম বার্লিনে আমেরিকা যেটা করেছিল। সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাইওয়ানের চেয়ে বেশি অনিশ্চিত ছিল।

চীনের তাইওয়ান আত্তীকরণ নীতির বিরোধিতার ক্ষেত্রে আমেরিকার বর্তমান অবস্থান দ্বীপটিকে রক্ষার বিশ্বাসযোগ্য কোনো ইঙ্গিত দেয় না। এ ধরনের অবস্থান সি-কে শক্তি জোগাচ্ছে। এতে তিনি তাইওয়ানে হামলার আচমকা নির্দেশ দিয়ে বসতে পারেন। যদি তা হয়, তবে ইন্দো-প্যাসিফিকের শক্তিসাম্য উল্টে যাবে। আমেরিকার বৈশ্বিক মোড়ল হওয়ার বাসনাও মাঠে মারা যাবে।

ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন