বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
অভিযোগটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে সরকারপ্রধানের কার্যালয়ের ভাবমূর্তি। এখানে কোনো কর্মকর্তার দুর্নীতি বা ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞা ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অপকর্ম যাঁরা করেন, তাঁরা জনপ্রশাসনের সম্পদ নয়, বরং দায়। এ দায় যত ছেঁটে ফেলা যায়, ততই মঙ্গল।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ চলে। সুতরাং, সে কার্যালয়ের ছয়টি টিম ত্বরিত নেমেছে মাঠ পরিদর্শনে। আশা করব, পরিদর্শন প্রতিবেদন ও তার মূল্যায়নে স্থান পাবে না কোনোরূপ অনুরাগ বা বিরাগ। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অপচয় বা অবজ্ঞাজনিত দায় যাঁদেরই থাকবে, তাঁদের দ্রুত বিভাগীয় শাস্তির আওতায় নিতে হবে। গণমাধ্যম বিষয়টি সামনে নিয়ে আসায় তারা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। তেমনি প্রতিকারের জন্য সরকার দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করায়ও আমরা কিছুটা আশ্বস্ত। তবে প্রকৃত দোষী ব্যক্তি শাস্তির আওতায় না আসা পর্যন্ত এ নিয়ে বিভ্রান্তি কাটবে না। স্মরণে রাখতে হবে, অভিযোগটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে সরকারপ্রধানের কার্যালয়ের ভাবমূর্তি। এখানে কোনো কর্মকর্তার দুর্নীতি বা ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞা ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অপকর্ম যাঁরা করেন, তাঁরা জনপ্রশাসনের সম্পদ নয়, বরং দায়। এ দায় যত ছেঁটে ফেলা যায়, ততই মঙ্গল।

ঠিক তেমনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ কিছু কাজও মাঠ প্রশাসনের কেউ কেউ করছেন। ওই সব বিষয়ও সামনে নিয়ে এসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ইতিবাচক মূল্যায়ন করা দরকার। বিষয়গুলোও সামনে আনছে গণমাধ্যম। প্রথমে উল্লেখ করতে হয় পিরোজপুরের একটি ঘটনা। কাউখালী উপজেলার এক নারী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত নারীর গোসল দিতে আত্মীয়-প্রতিবেশী কোনো নারীই কাছে আসছিলেন না। বেশ সময় গড়াচ্ছিল। খবর আসে ইউএনও খালেদার কাছে। তিনি একজন নারী এনজিওকর্মীকে নিয়ে সেখানে গিয়ে মৃত নারীর গোসল দেন নিজ হাতে।

করোনার সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন আরও ঘটনা ঘটছে যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন বিরূপ পরিস্থিতিতেও দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি। এমনকি প্রথম দিকে করোনার মৃত ব্যক্তিদের কবরস্থানে দাফন করা নিয়ে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ছিল। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ দিয়ে সে বাধার মুখে নিজে জানাজা পড়িয়েছেন। অংশগ্রহণকারী ছিলেন পুলিশ সদস্যরাই। তাঁরাই সবাই মিলে দাফনের কাজ সেরেছেন। এখানেই ইউএনও এবং ডিসির চাকরির ভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যা অন্য কোনো চাকরির সঙ্গে মেলানো যাবে না। যে কাজ করার জন্য কেউ নেই, কোনো আইন বা বিধি দ্বারা অর্পিত নয় সে দায়িত্ব, ক্ষেত্রবিশেষে তা পালন করতে হয় ডিসি ও ইউএনওদের। তবে সবাই এক ধরনের আন্তরিকতা বা নিষ্ঠা নিয়ে এমনটা করেন, তা–ও নয়।

প্রশাসনে অনেক জনবান্ধব ভালো কর্মকর্তা আছেন। তাঁদের কয়েকজন সম্পর্কে সামান্য ইঙ্গিত দিয়েছি। তাঁদের সব ভালো কাজ ম্লান করে দেন এ ধরনের অল্প কিছু কর্মকর্তা। সংখ্যায় কম হলেও যেকোনো কারণে তাঁরা প্রভাবশালী। অনেক ক্ষেত্রে রয়ে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনটা যেন এবার না হয়, সে প্রত্যাশা রইল।

ঘটনাগুলো একটির সঙ্গে একটিকে মেলানো যাবে না। গণমাধ্যম তাদের পেশার ধর্ম অনুসারে ভালো ও মন্দ দুই ধরনের কাজই জনসমক্ষে নিয়ে আসে। এই করোনাকালেই বিচিত্র রকম ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন স্থানে। চাঁদপুর শহরের মিশন রোড এলাকায় একটি বাড়িতে বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী বসবাস করতেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে দুজন দুই কক্ষে আইসোলেশনে ছিলেন। প্রতিষ্ঠিত তিন সন্তান বিদেশে। ধারেকাছে স্বজন কেউ নেই। এর মধ্যে একজন মরে পড়ে আছেন। অপরজন লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে। তিনি জানেনও না। এক দরদি গণমাধ্যমকর্মীর নজরে আসে ব্যাপারটি। তিনি তাৎক্ষণিক খবর দেন সদরের ইউএনও সানজিদাকে। ছুটে আসেন তিনি। জীবিতজনকে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে পাঠানো হয় হাসপাতালে। সমন্বয় করেন মৃত ব্যক্তির দাফনের কাজ।

দেখা গেছে স্বজনের দরদ নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একজন কর্মকর্তা। গণমাধ্যমেই খবরটি এসেছে। আলোচিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। তবে বৃহৎ অর্থে কিন্তু অনালোচিত থেকে যাচ্ছেন এ ধরনের কর্মকর্তারা। তাঁদের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে একটি প্রশংসাপত্রও মনোবলকে করতে পারে আরও চাঙা। তৈরি হতে পারেন ভবিষ্যতে উত্তরোত্তর চ্যালেঞ্জ গ্রহণের। কিন্তু কোথাও যেন একটু ফাঁক থাকছে।

দেশে উত্তরাঞ্চলের একজন ইউএনও আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় বাড়ি নির্মাণের কাজ সুসম্পন্ন করে কিছু টাকা ফেরতও দিয়েছেন সরকারি কোষাগারে। এটাও আমরা জেনেছি গণমাধ্যমের বরাতে। যেখানে বরাদ্দ লুটপাট করে অতি নিম্নমানের কাজের অভিযোগ, তার বিপরীতে এ নজির অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। যিনি বরাদ্দকৃত টাকায় কাজ সুসম্পন্ন করে টাকা বাঁচালেন, আমরা অবশ্যই তাঁর প্রশংসা করব। তাহলে ভবিষ্যতে এমনটা করতে পাবেন প্রেরণা।

এ ডামাডোলের মধ্যেই আবার দেখি দক্ষিণাঞ্চলের ইন্দুরকানি উপজেলার ইউএনও দায়িত্ব পালন শেষে নিয়মমাফিক বদলি হলে সেখানকার সব স্তরের মানুষ এ বদলি ঠেকাতে আন্দোলন করেছিলেন। দাঁড়িয়েছিলেন মানববন্ধনে। বদলি প্রশাসনের চাকরির স্বাভাবিক নিয়ম। সেখানে এ ধরনের জনমতের জন্য তাঁর বদলির আদেশ বাতিলের প্রশ্ন আসেনি। তবে লক্ষ করার থাকে এই কর্মকর্তা উপজেলার দলমত-নির্বিশেষে সবার আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। বদলি হয়ে চলে আসতে হয়েছে তাঁকে। তবে এসব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইতিবাচকভাবে নজরে রাখতে পারেন।

লেখাটির শুরু আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে। চলমান তদন্তের কার্যপরিধি আমাদের জানা নেই। তবে এ কাজগুলোকে বাস্তবায়নের পাশাপাশি তদারক করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রয়েছেন। আছেন প্রকল্প পরিচালক ও তাঁর সহকর্মীরা। নির্মাণকালে বিষয়টি তাঁদের সতর্ক নজরদারিতে ছিল কি না, এ প্রশ্ন অনেকের। আলোচিত তদন্তে নিশ্চয়ই এর উল্লেখ থাকবে। না থাকলে প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থা নেওয়ার পর আরও গভীরে যেতে হবে। তদারককারীদেরও দায় নির্ধারণ করার বিষয় রয়েছে। সম্পাদিত কাজের শতকরা হারের যত কমই হোক, ঘটনাগুলো জনপ্রশাসনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

প্রশাসনে অনেক জনবান্ধব ভালো কর্মকর্তা আছেন। তাঁদের কয়েকজন সম্পর্কে সামান্য ইঙ্গিত দিয়েছি। তাঁদের সব ভালো কাজ ম্লান করে দেন এ ধরনের অল্প কিছু কর্মকর্তা। সংখ্যায় কম হলেও যেকোনো কারণে তাঁরা প্রভাবশালী। অনেক ক্ষেত্রে রয়ে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনটা যেন এবার না হয়, সে প্রত্যাশা রইল। অনুরোধ থাকবে দুঃসময়ে যাঁরা জনবান্ধব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তাঁদের উপযুক্ত স্বীকৃতির। সে স্বীকৃতি বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার একটি আধা সরকারি পত্রও হতে পারে।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন