বিজ্ঞাপন

মূল সমস্যা হচ্ছে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অপ্রতুলতা, যা অধ্যাপক আহমেদ হেলালের লেখায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। আশির দশকের শুরুতে দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন জনা তিরিশেক। গত ৪০ বছরে এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এগিয়েছি আমরা। তবে পথ তো এখনো বাকি বেশির ভাগটাই। প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য একজন করে যদি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকতে হয় (ভারত যে লক্ষ্যে এগোচ্ছে), তবে বাংলাদেশে বিশেষজ্ঞ দরকার ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০। আমাদের কি কোনো পরিকল্পনা আছে এ সংখ্যায় পৌঁছানোর?

অধ্যাপক আহমেদ হেলালের লেখায় দুটি তথ্য উঠে এসেছে, যা খুবই দুশ্চিন্তার কারণ। তিনি বলেছেন, প্রতিবছর ৫ থেকে ১০ জন নতুন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছেন বাংলাদেশে। সংখ্যাটি অপ্রতুল, তা–ও তিনি বলেছেন। তাঁর সঙ্গে একমত না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একজন বিশেষজ্ঞের গড় কার্যকাল যদি হয় ৪০ বছর, তাহলে এই হারে ৪০ বছরে মাত্রই ২০০ থেকে ৩০০ বিশেষজ্ঞ তৈরি হবেন বাংলাদেশে। অর্থাৎ আমরা যেখানে আছি, বর্তমান চিত্রকল্পে কমবেশি সেখানেই আটকে থাকব। একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উত্তরণ ঘটতে হলে প্রতিবছর নতুন বিশেষজ্ঞ তৈরির হার অন্তত এর তুলনায় পাঁচ থেকে আট গুণ হতে হবে।

প্রতি জেলায় দুজন সাধারণ চিকিৎসককে ৮৫ দিনের মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রকল্পটি ইতিবাচক। এতে পরিস্থিতির বেশ কিছুটা উন্নতি হবে অবশ্যই, তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের স্থায়ী বিকল্প তাঁরা হতে পারেন না। আরেকটু এগিয়ে আমি বরং বলতে চাই, আমাদের বেশির ভাগ উপজেলার লোকসংখ্যা দুই থেকে চার লাখ। তাই এরূপ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক–দুজন চিকিৎসক বরং প্রতি উপজেলায় প্রয়োজন। আর ২০৪১ সালে আমরা যেহেতু ‘উন্নত’ দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তত দিনে প্রতি উপজেলায় অন্তত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকতে হবে। হিসাব করে এখন থেকেই তার প্রস্তুতি শুরু করা দরকার, সময় মাত্র ২০ বছর।

দ্বিতীয় তথ্যটি হলো, সরকারি চাকরিতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ১২০, অর্থাৎ প্রতি ১৪-১৫ লাখ লোকের জন্য একজন! মনোরোগ চিকিৎসা কতটা অবহেলিত, তা বোঝার জন্য এই একটি তথ্যই যথেষ্ট। মেডিকেলের এমবিবিএস কারিকুলামে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি যে অবহেলিত, তা আমার চিকিৎসক বন্ধুরা সবাই স্বীকার করেছেন। এর নিরসনে মেডিকেল কারিকুলাম আধুনিকায়ন করতেই হবে। স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চিকিৎসকদের পদায়নও জরুরি। তবে ‘একমাত্র চিকিৎসকদের’ পদায়ন কতটা ভালো ফল দেবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের কার্যালয় নিয়ে চিকিৎসকদের কাছ থেকেই প্রচুর অভিযোগ শোনা যায়।

রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে আমার ৬৫ জন সহপাঠী বন্ধুর মধ্যে চিকিৎসক ১৫ জন। আমার লেখায় চিকিৎসকদের প্রতি কোনো শ্লেষ প্রকাশিত হয়ে থাকলে তা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত, এ ব্যাপারে আমি লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বছরাধিককাল ধরে তাঁরা যে নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, সে জন্য আমরা সবাই তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। পথেঘাটে বা চিকিৎসাকেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক নিগৃহীত হলে আমরা বেদনাহত হই। আমরা চাই অপাত্রে প্রণোদনা না দিয়ে কোভিডবিরোধী এই সম্মুখযোদ্ধাদের আকর্ষণীয় প্রণোদনা দেওয়া হোক। অধ্যাপক হেলাল যেমন বলেছেন, চিকিৎসকেরা ব্যতিক্রম অবশ্যই, শিক্ষকেরাও তা–ই ছিলেন। সার্বিক অবক্ষয় স্পর্শ করছে সব শ্রেণিকেই, আমি শুধু এটুকুই বলতে চেয়েছিলাম।

আমলাদের কথা আলাদা, তিন হাজার বছর ধরে তারা গালিগালাজের শিকার সব ‘সভ্য’ সমাজেই। আমলাতন্ত্র একটি ‘নেসেসারি ইভিল’, অনেকটা রাষ্ট্রব্যবস্থার মতোই। টিকে আছে এ জন্য যে এখনো এর কোনো কার্যকর বিকল্প বের হয়নি।
শেষ করি একটা ব্যক্তিগত মন্তব্য দিয়ে। ‘কেন অবসরের পরপরই কর্তাব্যক্তিরা সবাই সত্যকথনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন আর পদে থাকাকালে কেন চুপ থাকেন’, একজন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অধ্যাপক হেলাল অবশ্যই এ প্রশ্নের উত্তর জানেন। ‘সত্যকথন’–এর কারণে চাকরিতে থাকাকালে আমাকে নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। আমার স্নেহাস্পদ কনিষ্ঠ সহকর্মীদের আমি তাই উপদেশ দিয়েছি আমাকে অনুসরণ না করতে।

মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন