>
default-image
কোভিড-১৯ পূর্ববর্তী সময়ে, গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রথম আলো ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (গেইন) যৌথভাবে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা: খাদ্য ও পুষ্টি প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আয়োজন করে। সেই গোলটেবিল বৈঠকের সারাংশ এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো।

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও সঞ্চালনা:
লরেন্স হাদ্দাদ, নির্বাহী পরিচালক, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (গেইন)
মো. মুজিবুল হক এমপি, সভাপতি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
মো. জাকির হোসেন আকন্দ, সদস্য (সচিব), কৃষি পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান, পরিকল্পনা কমিশন
হ্যারি ভারউয়ে, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত
পিয়ালি মুস্তাফি, পুষ্টি বিভাগের প্রধান, ইউনিসেফ
মো. রুহুল আমিন তালুকদার, অতিরিক্ত সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়
মো. আবদুস সাত্তার, অতিরিক্ত সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়
মো. শাহ নেওয়াজ, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ
মো. বদরুল আরেফীন, মহাপরিচালক, খাদ্য পরিধারণ মূল্যায়ন ইউনিট, খাদ্য মন্ত্রণালয়
এম মোস্তাফিজুর রহমান, লাইন ডিরেক্টর, জাতীয় পুষ্টি সেবা
রিচার্ড রেগান, কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি
ইফেতখার রশিদ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিশ্বব্যাংক
মানফ্রেড ফার্নহলজ, টিম লিডার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন
রবার্ট সিম্পসন, কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ, জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা
যেবা মাহমুদ. কান্ট্রি ম্যানেজার, অ্যালাইভ অ্যান্ড থ্রাইভ
জয়নাল আবেদিন. সহকারী পরিচালক, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান
মুহাম্মদ খালেদুজ্জামান তালুকদার, ব্যবস্থাপক (প্রযুক্তি উন্নয়ন), এমএসই ফাউন্ডেশন
আব্দুল কাইয়ুম, সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো
ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো ­­­

আলোচনা
আবদুল কাইয়ুম

আমরা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন দরকার গুণগত মান বাড়ানো, যা পুষ্টি নিশ্চিত করবে। গ্রামপর্যায়ে বয়স্ক ভাতা চালু রয়েছে, তবে এর পরিমাণ যথেষ্ট নয়। বিধবা ও স্কুলগামী শিশুদের জন্যও ভাতা আছে। পুষ্টিমান বাড়াতে অনেক এলাকায় স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিফিন দেওয়ার মতো চমৎকার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার লক্ষ্যে আমাদের কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নে আরও গবেষণা জরুরি।

default-image

লরেন্স হাদ্দাদ
পুষ্টি খাতে বাংলাদেশের অর্জন সতি্যই প্রশংসনীয়। প্রতিবছর ১ শতাংশ হারে অপুষ্টি কমানোর এই প্রবণতা স্বাভাবিক মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। তবে বাইরে থেকে যাওয়া ৩১ শতাংশ এখনো অনেক বেশি। পার্বত্য চট্টগ্রামে অপুষ্টির হার ৫১ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে অনেক কাজ করতে হবে। গত এক দশকে ওজন ও উচ্চতার ঘাটতির সমস্যা প্রায় অর্ধেক কমেছে। কিন্তু যে হারে আমরা খাদ্যে বৈচিত্র্য দেখতে চাই তেমনটি হচ্ছে না, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের বেলায়। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের মাত্রা বেড়েছে। প্রক্রিয়াজাত সব খাবারই খারাপ নয়, তবে অত্যধিক পরিমাণে লবণ, চিনি ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত ক্ষতিকর খাবার গ্রহণের হার বেড়েছে।

অপুষ্টি নিরাময়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ সহজতর হয়। এর ফলে ক্ষুধা নিবারণ ও স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। বিশ্বজুড়ে রোগের প্রকোপ সৃষ্টির কারণ হিসেবে ১০টি বড় ঝুঁকির মধ্যে অন্তত ৫ থেকে ৬টি খাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। দূষিত পানি বা দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা তৈরি করে, এসবের প্রভাব একজন ব্যক্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি। অপুষ্টির মূল কারণ সঠিক পরিমাণ ও সঠিক পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য খেতে না পাওয়া।

ক্ষুধা নিবারণের হার ও ভাত গ্রহণের মাত্রা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে, তবে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে ডিম, দুধ, ফলমূল ও ডালজাতীয় শস্য গ্রহণের মাত্রা বাড়াতে হবে, যা বর্তমানে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ১৫-৩০ শতাংশ। গত তিন বছরে চিনি গ্রহণের মাত্রা দ্রুতগতিতে বেড়েছে। গেইন-এর মাধ্যমে আমরা সরকারি-বেসরকারি খাতসহ সুশীল সমাজের সঙ্গে কাজ করছি, যেন সব মানুষের খাদ্যব্যবস্থার মধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য গ্রহণের নিশ্চয়তা অর্জিত হয়। এ জন্য আমরা ভোক্তার দিকেও নজর দিচ্ছি। কেননা, দুর্বল বা পর্যাপ্ত পুষ্টিগুণহীন খাদ্যাভ্যাস কেবল ব্যক্তির সীমিত আয়ের কারণেই গড়ে ওঠে না, এ ব্যাপারে ব্যক্তির অজ্ঞানতা বা অসচেতনতাও অনেকাংশে দায়ী। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে ভোক্তাদের এমনভাবে সমন্বয় ঘটাতে হবে, যেন নিরাপদ ও মানসম্পন্ন খাদ্য সবার জন্য সুলভ করা যায়। এ জন্য আমরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও কাজ করছি। মনে রাখতে হবে, খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে ব্যবসার সম্পর্ক রয়েছে, আর এখানে খাদ্যের মান ও নিরাপত্তার ব্যাপারও জড়িত।

জনশক্তিকে শক্তিশালী করে তুলতে পারলে তা দেশের পক্ষে উপকারী। বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে আইএলও বলেছে, একজন কর্মী মনে করেন, যদি চাকরিদাতা বা নিয়োগকর্তা তাঁর কর্মীর খাদ্যমান নিয়ে ভাবেন, এর অর্থ হলো, তিনি তাঁর কর্মীকে একজন ব্যক্তি হিসেবে গুরুত্ব দেন। কাজেই কর্মক্ষেত্রের খাদ্যব্যবস্থায় পুষ্টির ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে দেখেছি, এ ধরনের ব্যবস্থা নিলে কর্মীদের মধ্যে রক্তশূন্যতা পূরণে ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কর্মক্ষেত্রে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য বা কোথাও কোথাও কোনো ধরনের খাদ্যব্যবস্থাই নেই। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা নিলে দীর্ঘ মেয়াদে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষই নানাভাবে লাভবান হয়। সমস্যা রয়েছে, তবে এর পাশাপাশি উদ্যোক্তাকে সমাধানেরও অংশ হতে হবে।

আর অবশ্যই জবাবদিহিতা থাকতে হবে। সুশীল সমাজও গুরুত্বপূর্ণ, তারা এ ধরনের বিষয়ে সবাইকে নজরদারির মধ্যে রাখে ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। তবে বিশ্বজুড়েই আমরা এমন অভিযোগ পাই, সবকিছু শেষ পর্যন্ত কেবল পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এমন হলে হবে না, সবাইকে সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে, যেন সঠিক উদ্দেশ্য পূরণ হয়।

আমরা প্রায়ই দাবি করি, পুষ্টি খাতে কাজের জন্য আরও অর্থ দরকার। ফলে সরকার ও দাতাগোষ্ঠী অনেক সময় পিছিয়ে যায়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে, এই খাতে যে বরাদ্দ আছে, সেটুকু কি সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে? যে ফল পাওয়ার কথা, আমরা কি তা পাচ্ছি? এই খাতে ব্যয়িত অর্থ কি স্বচ্ছ? কেবল বড় বাজেটের পেছনে ছুটলে হবে না, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের বিষয়ে যত্নশীল হতে হবে। আমার ধারণা, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে অপুষ্টির ব্যাপারে লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। তবে আমাদের অপুষ্টি, অতিপুষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং সেগুলোও মোকাবিলা করতে হবে। আর এসব অর্জিত হতে পারে কেবল সমন্বিতভাবে কাজ করার মধ্য দিয়েই। (মূল প্রবন্ধের সংক্ষেপিত পাঠ)

default-image

মো. রুহুল আমিন তালুকদার
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা (এনপিএএন-২) দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের প্রতিশ্রুতির বহিপ্রকাশ। এখনো খাদ্যব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো বুঝে সীমিত সম্পদের ব্যবহার করে দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও অগ্রাধিকারগুলোকে চলমান রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা হলো শ্রম উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করা, যা খাদ্যের উৎপাদক, জোগানদাতা ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারীদের পুষ্টির কার্যক্রম ত্বরান্বিত রাখতে সহায়ক।

আরেকটি দিক হলো কৃষি ওরিয়েন্টশন সূচক, যা জিডিপির সামগ্রিক ব্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিতে ব্যয়ের সঙ্গে তুলনীয়। ফসল সংগ্রহ পরবর্তী ক্ষতি, বিশেষ করে তাজা সবজি ও ফলমূলের ক্ষেত্রে ২০-৩০% কমানোর লক্ষ্যে আমরা বেসরকারি খাত থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাশা করছি। সরকার গ্রামাঞ্চলে কৃষিজাত পণে্যর গুণগত মান ও উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় যুবকদের কৃষি উদ্যোগে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।

default-image

এস এম মুস্তাফিজুর রহমান
দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য পূরণে এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ, সুশীল সমাজ ও গবেষকদেরকে সরকারের সঙ্গে একত্রিতভাবে কাজ করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি ২-এর কথা যদি বলি, আমরা শস্য উৎপাদনে এগিয়ে আছি কিন্তু প্রোটিনসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি।

গর্ভবতী নারীদের পুষ্টি ও মনো-সামাজিক বিকাশের দিকে নজর দিতে হবে। কেননা এর মাধ্যমে শিশুদের মস্তিষ্কের সার্বিক গঠন নিশ্চিত করা যাবে।

প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরীর পুষ্টি অবস্থার উন্নয়নে আমাদের কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। আয়রনের ঘাটতি বা রক্তশূন্যতা আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা। তাই সব বয়সেই পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হার ৬৫ শতাংশ হলেও বাকি ৩৫ শতাংশকে এর আওতায় আনা যাচ্ছে না। কেবল মায়ের দুধই যথেষ্ট নয়—এ ধরনের নানা ভুল ধারণার কারণে এমনটি হচ্ছে। এসব ধারণা দূর করতে হবে।

এ ছাড়া বাজারের অস্বাস্থ্যকর মুখরোচক খাবারের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি সম্পর্কে আমাদের আরও সতর্ক থাকা দরকার এবং সে সম্পর্কে নীতিগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

default-image

মো. বদরুল আরেফীন
খাদ্য মন্ত্রণালয় এসডিজি ২০৩০ লক্ষ্য অর্জনে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার নতুন খসড়া নীতিমালা করেছে। পুষ্টি পরিস্থিতি বেশ নাজুক বা জনসাধারণ অপুষ্টির শিকার—এমন ১২টি জেলায় আমাদের একটি প্রকল্পের কাজও চলছে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত অপুষ্ট জনগোষ্ঠীর বাড়িতে ছোট পুকুরে মাছ উৎপাদনের জন্য সহায়তা প্রদান করা হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউকেএইডের আর্থিক সহায়তায় এবং ইউএসএইডের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্প চলছে। অতিদরিদ্র শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী ও মাতৃদুগ্ধদানকারী মায়েরা এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে।

গবেষণায় আমরা দেখেছি, টেকসই উপায়ে তথ্য তুলে ধরা গেলে শিশুরা তা দীর্ঘ সময় মনে রাখতে পারে। লিফলেট বা পোস্টারের মাধ্যমে উপস্থাপিত তথ্য তারা দ্রুত ভুলে যায়। তাই আমরা এসব পুষ্টিতথ্য শিশুদের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করেছি। ৪ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে প্রতিবছর নতুন বই দেওয়া হয়। বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদের ১০ শতাংশ জায়গাতেও যদি এসব তথ্য রঙিন কার্টুনের মতো দৃষ্টিনন্দন উপায়ে তুলে ধরা যায়, সেটি ভালো ফল দেবে।

default-image

মো. আবদুস সাত্তার
পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের মোট ভূমির ১০ শতাংশ, কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেছিলেন শুধু উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য। উন্নয়ন বোর্ড পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ কিছু আবাসিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়া হয়। কৃষি বিভাগ সেখানে ফলমূল চাষের প্রকল্প চালু করেছে, যা ওই সব এলাকার অধিবাসীদের রোজগারে সহায়তা করছে। এর আগে স্থানীয় বাসিন্দারা জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ফলের উদ্বৃত্ত উৎপাদন হয়। কিন্তু এগুলো সংরক্ষণ করা যায় না বলে রপ্তানি করাও সম্ভব হয় না। আম, কাঁঠাল, আনারস ও কলার মতো পুষ্টিকর ফল বাজারজাত হচ্ছে না। খামারের অভাবে সেখানকার মানুষ দুধ ও ডিম পাচ্ছে না বলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে না। তাই এসব সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার অনুরোধ করছি; আমাদের মন্ত্রণালয় এ জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

default-image

মানফ্রেড ফার্নহলজ
অপুষ্টি কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো করছে বলে আমাদের বিশ্বাস। এ ধারাকে আরও বেগবান করতে বহুখাতভিত্তিক পদ্ধতিতে এগিয়ে যেতে হবে। এ রকম একটি বহুখাতভিত্তিক পদ্ধতির জন্য এফপিএমইউ এবং বিএনএনসির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাজ করছে। কেবল প্রত্যক্ষ পুষ্টি পদ্ধতিতে নয়, বরং পুষ্টি সংবেদনশীল পরোক্ষ পদ্ধতির ওপর জোর দিতে আমরা কাজ করছি।

আমাদের বুঝতে হবে, এ কাজে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন দাতা বা সরকারি কোষাগার থেকে আসবে না। পুষ্টির ক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগ আনতে এবং বাংলাদেশে আরও কার্যকর ও দক্ষ সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করার প্রবণতা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে হবে।

আমরা স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। এগুলো আরও সাশ্রয়ী করার জন্য ভ্যালু চেইন নিয়ে কাজ করতে হবে। এমনকি পুষ্টিমান সমৃদ্ধ খাবারের জন্য ভর্তুকি বিষয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। অংশীদারত্ব নিয়েও ভাবতে হবে। স্থানীয়, জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের গণমাধ্যম থেকেও সমর্থন প্রয়োজন। কারণ, তারা আমাদের সঠিক বার্তা প্রচারে ও জনগণকে সংবেদনশীল করতে সহায়তা করবে।

পুষ্টি যেন রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা কেবল সংসদেই নিশ্চিত করা সম্ভব। সঠিক আইন ও বিধিমালা কার্যকর করার পাশাপাশি যথাযথ বাজেট বরাদ্দ ও বিতরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

খাদ্য সুরক্ষার পাশাপাশি আমাদের এটিও স্বীকার করতে হবে যে অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই সত্যিকার অর্থেই জটিল কাজ। সুতরাং একটি বহুখাতভিত্তিক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আমরা হয়তো অপুষ্টি হ্রাস করার ক্ষেত্রে বেশ ভালো অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। তবে ভুলে গেলে চলবে না, আমরা দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের চক্রে থাকা ৫০ লাখ শিশুর কথা বলছি। তারা তাদের নিজ পরিবারের জন্যই বড় সমস্যা হতে চলেছে। পরিবারগুলোর ঘাড়ে চাপছে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বোঝা এবং এ চক্র পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে। সুতরাং, এ নিয়ে আরও মনোযোগ দেওয়া দরকার। আমি আরও মনে করি, শিক্ষা ও শিশুদের জন্য বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি সত্যিই পুষ্টি উন্নয়নে কাজ করি, তাহলে এটা বলা যায়, পরবর্তী প্রজন্ম যথাযথ পুষ্টির সুবিধা সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হতে যাচ্ছে।

default-image

রবার্ট সিম্পসন
কৃষিক্ষেত্র নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। যদিও বর্তমানে লোকজন শহরে চলে যাওয়ার কারণে কৃষি বর্তমানে ১৪ শতাংশ হ্রাস পাচ্ছে, তারপরও কৃষিই এখনো পুষ্টির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কীভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে এবং তা ভোক্তার কাছে যাচ্ছে, এর ওপর নির্ভর করছে পুষ্টিমান। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আমরা যে বার্তাটি দিতে চাই, তা হলো এসডিজি অর্জনে ‘সমন্বিত খাদ্যব্যবস্থা কর্মসূচি’।

আমরা যে গ্রহে বাস করি, তাকে যেভাবে দূষিত করছি, এখন প্রশ্ন তুলতে হবে, আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি। আমরা যে পরিবেশে বাস করি, তার থেকে খাদ্যব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত হবে না। এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কার্বন শোষক হচ্ছে সমুদ্র। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমুদ্রের গভীরতম অঞ্চলগুলোয় তাপমাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে। এর মানে, কার্বন শোষণ করার আর ক্ষমতা নেই সমুদ্রের। তাই দূষণ নিয়ে ভাবনা খুবই জরুরি। পুষ্টির ক্ষেত্রে অর্থায়ন, সমন্বিত খাদ্য সুরক্ষাব্যবস্থার মতো পদক্ষেপ এবং ফেলে রাখা সম্পদ কাজে লাগানোর উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সুতরাং, সামনে এগোনোর সময় জলবায়ু-মানানসই ও জলবায়ু-সংবেদনশীল কৃষির শক্তিশালী সমন্বয় দরকার। মাংস, ফলমূল ও শাকসবজিতে আমাদের আরও বৈচিত্র্য প্রয়োজন। প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যাপারে যুবক ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে চাহিদা বাড়ছে। আমাদের পুষ্টিনীতিতে এই বিষয়গুলোর সমাধান থাকা উচিত। বেসরকারি উদে্যাক্তা, বিশেষত ছোট ও মাঝারি পরিসরের কৃষকদের জন্য কোন কোন বিষয় সহায়ক, আমাদের তা নিয়েও ভাবতে হবে।

default-image

যেবা মাহমুদ
পুষ্টি নীতিমালা ও এর বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা রয়েছে—এমন গুটিকয় দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য পুষ্টিকেও একটি নিয়ামক হিসেবে দেখার এখনই সময়। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন অংশীজন, যেমন সরকার, নীতিনির্ধারক, মন্ত্রণালয়, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন অংশীদার ও দাতাগোষ্ঠীদের এখন আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা দরকার। বেসরকারি খাতের একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এই খাতটি সাধারণভাবে উপেক্ষিতই থেকে যায়।

আমাদের মতো সুশীল সমাজের কর্মীরা নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে কাজ করছি। এভাবে আমরা বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে কৌশলগত কাজের সমন্বয়ের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিচ্ছি। অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে আমরা সরকারকে বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করতে পারি।

default-image

রিচার্ড রেগান
পাবলিক সেক্টরের একজন ব্যক্তি হিসেবে হয়তো কথাটা বলা বেমানান হতে পারে, কিন্তু আমি সত্যিই মনে করি না যে পুষ্টির ক্ষেত্রে একমাত্র সরকারি খাতই সমাধান। এটা এখন বেসরকারি খাত দ্বারা ত্বরান্বিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ সময় ডব্লিউএফপির মতো সংস্থাগুলো পুষ্টি খাতে যে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে, তা সত্যিই অনেক পরিবর্তন সাধন করছে।

চালের পুষ্টিমান বৃদ্ধি নিয়ে আমরা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি। চালের পুষ্টি সুরক্ষার উদ্যোগটি যদি বাংলাদেশে সফল হয়, তাহলে এই দেশই হবে অন্যতম নেতৃত্বস্থানীয় দেশ। আয়োডিনযুক্ত লবণ উদ্যোগের মতো এটাও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।

আমরা মন্ত্রিপরিষদের সঙ্গেও কাজ করেছি। স্বাস্থ্যকর ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের মধ্যে যে বড় রকমের পার্থক্য আছে, আমরা তা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। খাদ্যাভাস পরিবেশ দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং প্রতিদিন তা পাল্টে যেতে পারে। পুষ্টিমান সরবরাহের পাশাপাশি পরিবর্তিত জলবায়ুতে কীভাবে আমরা টিকে থাকব, এ নিয়ে বড় পরিসরে ভাবতে হবে। অন্যথায় শিশুদের বাঁচার জন্য কোনো পৃথিবী থাকবে না।

default-image

মো. শাহ নেওয়াজ
বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএনএনসি) ২২টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করে, যেগুলো পুষ্টি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সম্প্রতি আমরা পুষ্টি খাতে আর্থিক ব্যয়ের ওপর এক মূল্যায়নে দেখেছি, শতকরা ৯৮ ভাগ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে পুষ্টি-সংবেদীর পরোক্ষ কর্মকাণ্ডে, আর মাত্র ২ শতাংশ খরচ হয়েছে পুষ্টি প্রত্যক্ষ কাজের পেছনে।

দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনার (এনপিএএন-২) ৬৪টি সূচকে মোট ২৩০টির মতো কার্যক্রম রয়েছে। তার মধ্যে ২০২৫ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষে্য আমরা ২৫টি সূচককে প্রাধান্য দিয়েছিলাম, যা অনেকটাই এখন আমাদের নাগালের মধ্যে।

default-image

পিয়ালি মুস্তাফি
খর্বতার হার কমিয়ে আনার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চা–বাগানগুলোয় খর্বতার সমস্যা এখনও রয়েছে; চা–বাগানে এ হার এখনও ৪৫ শতাংশ। শহুরে বস্তিগুলোতেও অপুষ্টির হার খুব বেশি। এগুলো মোকাবিলা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা খাদ্য ও পুষ্টি নিয়ে অনেক কথাই বলছি। কিন্তু মাত্র ২৭ শতাংশ মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে থাকে।

১৮ বছর বয়সের আগেই প্রায় ৫১ শতাংশ মেয়ে শিশুর বিয়ে হয়ে যায়। এটা চিন্তার ব্যাপার। কেননা, এতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ এবং মাতৃমৃত্যুহার ও কম ওজনের শিশুজন্মের ঝুঁকি বাড়ে। সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশু সারা জীবন অপুষ্টিতে ভোগে। সুতরাং, যেকোনো মূল্যে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতেই হবে। আমরা ভালো করছি, আমরা খর্বতা নিয়ে এসডিজির লক্ষ্য পূরণ করতে পারব। কিন্তু উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে আমাদের কর্মসূচিকে আরও এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি মায়ের পুষ্টি এবং অনূর্ধ্ব তিন ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর পুষ্টি, কৈশোর-পুষ্টি বিষয়ে আমরা যদি খেয়াল রাখি এবং এক হাজার দিবস কর্মসূচিকে আরও জোরদার করি, তাহলে অবশ্যই তা বড় অর্জন নিয়ে আসবে।

default-image

ইফতেখার রশিদ
আমরা শহর এলাকাগুলোকে কম গুরুত্ব দিয়েছি। বিগত আড়াই দশকে সরকারের কর্মসূচিগুলো মূলত গ্রামীণ এলাকানির্ভর ছিল। এর কারণ হলো শহর এলাকাগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত নয় বরং এসব এলাকা স্থানীয় সরকারের আওতাভুক্ত।

শহুরে বস্তিগুলোতে খর্বকায়তার হার অনেক বেশি, বিশেষত গত সাত বছরে এর পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হার দুর্গম পল্লি অঞ্চলে যেসব এলাকায় পৌঁছানো কঠিন, সেসব এলাকার থেকেও বেশি। জীবনযাত্রার ধরন, পানি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রান্নার সুবিধার অভাবই এর পেছনে প্রধান কারণ। সুতরাং, আমাদের শহুরে অঞ্চলকে প্রাধান্য দেওয়া এবং খর্বকায়তা হ্রাস করার জন্য একটি বহুক্ষেত্রবিশিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করা প্রয়োজন।

default-image

মো. খালেদুজ্জামান তালুকদার
বিভিন্ন বিভাগের কাজকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে সরকার ২০১৯ সালে এসএমই নীতি প্রণয়ন করে । ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির ৫০ শতাংশ এসএমই থেকে আসবে বলেও সরকার অঙ্গীকার করেছে। খাদ্য ও পুষ্টি এসএমই ফাউন্ডেশনের বিশেষ ক্ষেত্র। এই ফাউন্ডেশন ১১৭টি ক্লাস্টার প্রতিষ্ঠা করেছে, যার মধ্যে ৩৪টি কৃষিভিত্তিক। এ ক্লাস্টারগুলোর মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অর্থায়ন। বাণিজ্যিক খাতগুলো থেকে অর্থ পাওয়া সম্ভব হলেও এদের সুদের হার বেশ চড়া। তবে এসএমই ফাউন্ডেশন ২০০৮ সাল থেকে তুলনামূলক কম সুদে ঋণসুবিধা দিয়ে আসছে।

default-image

জয়নুল আবেদিন
পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হলে আমাদের পানিসম্পদের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সরকারের উচিত নদীগুলো খননের মাধ্যমে শুকনা মৌসুমে পানির জোগান নিশ্চিত করা। এ ছাড়া খাদ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা দরকার, যেন তা থেকে আমরা বেশি মাত্রায় প্রোটিন ও ফ্যাট পেতে পারি। ধান ছাড়াও আমাদের নানা ধরনের ডাল, সূর্যমুখী ও শর্ষে উৎপাদন করতে হবে।

default-image

হ্যারি ভারউয়ে
বেসরকারি খাত নিয়ে সাধারণ কিছু অভিমত তুলে ধরতে চাই। এই দেশের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, অন্য বড় সংস্থা এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে। জাতিসংঘ, নেদারল্যান্ডস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র—এসব পক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা আমাদের সবার বুঝতে হবে।

এ সম্পর্ক এখন আর দাতা ও অনুদানগ্রহীতার সম্পর্ক নয়, বরং এটা এখন সমান অংশীদারত্বের সম্পর্ক। কিন্তু সমান অংশীদার মানে বাণিজ্যিক ও বাণিজ্য সম্পর্কে সমান ভূমিকা রাখা। আমরা বন্ধু হিসেবে ৫০ বছর সময় পার করছি। এখন এমন বন্ধু হতে চাই, যেন বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারি। কৃষিক্ষেত্রেও পরিবর্তন দরকার। প্রত্যেক কৃষকই একজন উদ্যোক্তা। বাংলাদেশে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে অনেক খামার আছে। এদিকে আমাদের নজর দেওয়া উচিত।

কৃষিতে সেচব্যবস্থাটিও গুরুত্বপূর্ণ। বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বড় বন্ধু আমরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশে কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে এটা পানিকেন্দ্রিক বিশাল এক উন্নয়ন পরিকল্পনা। এটা কৃষিতে নতুন জাত ও চাষাবাদের নতুন পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে।

নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বলব, আমরা সংযোগ তৈরির চেষ্টা করছি। আমরা প্রযুক্তি ও দক্ষতার ক্ষেত্রগুলোর আদান–প্রদানকে সহজ করি। আমাদের দক্ষতা ব্যবহার করে আমরা নতুন কিছু প্রবর্তন করতে চাই। বেসরকারি খাত, কর্মসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠান এবং বড় উদ্যোক্তাদের অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাদের কাছে অর্থ আছে, তাদের বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। কৃষি ও পানি খাতে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সামনের দিনগুলোয় বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চাই। আমি বলব, আরও বেশি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আনার চেষ্টা করা উচিত। এখানে এফডিআই জিডিপির শতকরা ১ ভাগের কম। তুলনার জন্য বলছি, ভিয়েতনামে এটা ১৫ শতাংশ। এর মানে, এখনো অনেক সুযোগ সৃষ্টির কাজ বাকি আছে। দেশকে যত বেশি ব্র্যান্ড করবেন, তত বেশি এফডিআই আসবে। কথাগুলো আমি বাংলাদেশের ভক্ত হিসেবেই বললাম।

default-image

মো. জাকির হোসেন আকন্দ
দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দরিদ্রতা ও অপুষ্টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সরকার দেশ থেকে অপুষ্টি দূরীকরণে বদ্ধপরিকর। আর এসব কমিয়ে আনা মানেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টিখাতে সময়, শ্রম ও অর্থ বাড়ানো।

পুষ্টি অবস্থার উন্নতিতে আমাদের সরকার প্রতিশ্রতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ বাজেট আগের বছরের চেয়ে তিন গুণ বাড়ানো। সরকার গত বছর একটি জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা নীতি অনুমোদন দিয়েছে। এসবই অপুষ্টি ও এ–সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপুষ্টি বলতে আমরা মূলত প্রাণিজ প্রোটিনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। এটি মাথায় রেখেই সরকার এ ঘাটতি পূরণে সহায়ক নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আমরা মাংস উৎপাদনে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ, তবে দুধ উৎপাদনে এখনো পিছিয়ে আছি। কৃষি খাতে সরকার ডাল ও তৈলবীজের মতো উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন শস্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে।

সুতরাং, সরকার যেভাবে দারিদ্র্যের মাত্রা হ্রাস করছে, আমরা বিশ্বাস করি, আমরা অপুষ্টি কমাতেও সক্ষম হব এবং মানসম্পন্ন ও পুষ্টিকর খাবার নিয়ে আসতে পারব। আমি উন্নয়নসহযোগী, সুশীলসমাজ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশে অপুষ্টি হ্রাসের জন্য এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানাই। সরকার এ কাজ একা করতে পারে না। এর জন্য চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

default-image

মো. মুজিবুল হক এমপি
বাংলাদেশ সরকার খাদ্য ও পুষ্টি খাতের আইন ও নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নে অত্যন্ত আগ্রহী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দূরদর্শী নেতা জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। খাদ্য ও পুষ্টি খাতে সরকারের অঙ্গীকার প্রণীত আইন ও নীতিগুলোর মধ্যেই দৃশ্যমান। এর সবই এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পুষ্টিমান ও খাদ্য সুরক্ষা উন্নত করার কথা থাকবে। মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে আমাদের দৃঢ় ও কার্যক্ষম জনবল দরকার হবে। আর পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটলে তা বাস্তবায়িত হবে না।

আমি খুব খুশি যে গেইন ও অন্যান্য সংস্থা বাংলাদেশে পুষ্টি ঘাটতি কমিয়ে আনতে, নারী ও শিশুর কল্যাণের জন্য এবং তৈরি পোশাক খাতে কর্মশক্তির ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, আমরা খাদ্যব্যবস্থা ও পুষ্টির অবস্থা পরিবর্তন করতে সক্ষম হব।

বেশ আগের একটা কথা বলি, ১৯৭৫ সালে এমআইটিতে ১০ জন অধ্যাপক তৃতীয় বিশ্বের দেশ নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। তাঁরা মন্তব্য করেছিলেন, বাংলাদেশ যেন ক্যানসারে আক্রান্ত এক রোগী, যার চিকিৎসা করা যায় না। তাঁরা উন্নয়নসহযোগীদের অন্যত্র তাঁদের কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চার দশক পর ২০১৫ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর–এর সম্পাদক লিখেছেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

২০৩০ সালের মধ্যেই পুষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে আমাদের সরকার। ইংল্যান্ডের মতো দেশ মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করতে ৭০ বছর পার করে দিয়েছে। আর আমরা মাত্র ৪০ বছরের মধ্যেই মাথাপিছু আয় তিন গুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছি। আমাদের সরকার নীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে দেশের অপুষ্টিজনিত ঘাটতি দূরীকরণের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে বলে আমি আশাবাদী।

ফিরোজ চৌধুরী

আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

[এ ছাড়া গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন গেইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রুদাবা খন্দকার, ইউএসএআইডির কৃষি কর্মকর্তা রয় ফেন, এফএওর জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদ ললিতা ভট্টাচার্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটির প্রোগ্রাম ম্যানেজার আসুন্তা তেস্তা প্রমুখ।]

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0