বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিন্তু প্রথমেই তারা তাদের সুযোগ নষ্ট করে ফেলেছে। জয়ের পর বাস্তব বুদ্ধির চেয়ে তালেবান নেতারা তাঁদের নিজস্ব বিচার-বিবেচনাকেই বেশি গ্রহণ করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্যতা পেতে যা করা দরকার, সেটাও তাঁরা ভুল করেছেন। পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তালেবানকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক পর্যবেক্ষণ করছে। পশ্চিমা দেশগুলো বলছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারের যে প্রতিশ্রুতি তালেবান দিয়েছিল, সেটা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন তালেবান সরকারের কিছু সদস্যের ‘পূর্ববর্তী যোগসূত্র ও অতীত রেকর্ড’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তঁাদের কেউ কেউ জাতিসংঘের সন্ত্রাসী তালিকায় কিংবা আমেরিকার স্বীকৃত সন্ত্রাসী তালিকায় রয়েছেন। বোঝা যাচ্ছে যে যতক্ষণ পর্যন্ত তালেবান তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করছে, পশ্চিমা দেশগুলো তাদের স্বীকৃতি কিংবা বৈধতা দেবে না। বিশেষ করে তারা দেখতে চায়, আফগানিস্তানের মাটি যেন বৈশ্বিক সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।

তালেবান হয় বাকি বিশ্ব তাদের কাছে কী প্রত্যাশা করেছে সেটা বুঝতে ভুল করেছে। অথবা একদমই তাদের পরোয়া করেনি। এই নেতারা দেশের ভেতরে তাদের বিরুদ্ধে কী কর্মকাণ্ড দানা বাঁধতে পারে, সেটা বুঝতেও ভুল করেছে। প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে আফগানিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় শত শত প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছে। এসব প্রতিবাদের বেশির ভাগের নেতৃত্ব দিয়েছেন নারীরা। তারা যে নৃশংস উপায়ে এসব প্রতিবাদ দমন করেছে, বিশেষ করে সাংবাদিকদের পিটিয়ে জখম করছে, তাতে করে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছে।

পানশিরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশের মধ্যে আর সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে তালেবানকে পড়তে হচ্ছে না। কিন্তু রাস্তায় জনসাধারণের প্রতিবাদের মুখে তাদের ঠিকই পড়তে হচ্ছে। সর্বোপরি, ১৯৯০–এর দশকের আফগানিস্তান এটা নয়। যুদ্ধে পারদর্শী তালেবানের জন্য সরকার পরিচালনার চ্যালেঞ্জ গতবার তারা যখন ক্ষমতায় ছিল তার থেকে অনেক বেশি। নারীসহ নতুন ও শিক্ষিত প্রজন্মের চাওয়া–পাওয়াকে তাদের গুরুত্ব দিতে হবে। ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মুখোমুখি হতে হবে। তারা যদি মনে করে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় করার মানে হচ্ছে জনগণের মন জয় করা, তাহলে তারা ভুল করবে।

এরপর আফগানিস্তানের বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেখানে অসন্তোষ বাড়াতে পারে। এমনকি অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। আমেরিকা আফগানিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থগিত করে রেখেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ তাদের সহযোগিতা বন্ধ রেখেছে। খাদ্য ও নগদ টাকার সঞ্চয় ফুরিয়ে এসেছে। ফলে আফগান জনগণ ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। তালেবান সরকারের নমনীয় হওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট বড় একটা কারণ। তারা যদি কট্টরপন্থা ছেড়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জনগণের প্রতি নমনীয় না হয়, তাহলে টাকার অভাবে তাদের অর্থনীতি ধসে পড়বে।

আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি যৌথ স্বার্থ রয়েছে। সেখানকার মানবিক সংকট উত্তরণে সহায়তার দায়িত্ব সবার রয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রচণ্ড খরা, বন্যা এবং করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের কারণে আফগানিস্তানের অর্ধেক জনগোষ্ঠী ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে।’ বিশ্বের বড় শক্তি এবং আঞ্চলিক দেশগুলো আফগানিস্তানে স্থায়িত্ব দেখতে চায়। বিভাজনের পথ পরিহার করে একত্র হয়ে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে বিশ্বকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।

পাকিস্তানের দ্য ডন পত্রিকা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মালিহা লোদি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন