যেসব অপরাধীর বয়স ১৮ বছরের নিচে, তাদের শিশু উন্নয়ন সংশোধন কেন্দ্রে রাখা হয় এই উদ্দেশ্যে যে তারা যাতে নিজেদের সংশোধনের সুযোগ পায়। এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে যাঁরা থাকেন, তাঁদের অধিকতর সংবেদনশীল ও মানবিক হতে হয়।

বাংলাদেশের শিশু আইন–২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছর বা এর কম বয়সী শিশু-কিশোরের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের জেলে নেওয়ার পরিবর্তে উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে, যাতে তারা সংশোধিত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। কিন্তু যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে যঁাদের কাছে শিশু-কিশোরদের সংশোধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের হাতেই তিন কিশোর নির্মমভাবে নিহত হলো। এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। নিকট অতীতে কারাগারেও এ রকম হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।

বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে ঘটনার যে বিবরণ বেরিয়েছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়; রোমহর্ষক। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক, সহকারী তত্ত্বাবধায়কসহ পাঁচ কর্মকর্তা ও প্রহরী ঠান্ডা মাথায় এই তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। অথচ তাঁরা প্রথমে প্রচার করেছিলেন, কিশোরেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে গিয়ে নিহত হয়। প্রকৃত ঘটনা হলো প্রধান রক্ষী কিশোরদের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়কের কাছে মনগড়া নালিশ জানালে কিশোরেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ৩ আগস্ট তাঁকে মারধর করে। এর শাস্তি হিসেবে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় অজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত ১৮ জনকে মারধর করা হবে। এরপর কর্মকর্তা ও রক্ষীরা বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযুক্ত কিশোরদের পিটিয়ে অজ্ঞান করে মেঝেতে ফেলে রাখেন। সেখানেই তিনজন মারা যায় এবং অন্যদের সন্ধ্যার পর অচেতন ও মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কেন্দ্রের কিশোরেরা অপরাধ করলে কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেই শাস্তি এমন হতে পারে না যে তাদের জীবনহানি ঘটতে পারে। কিশোরদের মারধর করার পর কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবরও দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে ঘটনাটি জানায়। ফলে এই হত্যাকাণ্ডের দায় যশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনোভাবে এড়াতে পারেন না। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তত্ত্বাবধায়ক, সহকারী তত্ত্বাবধায়কসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সমাজসেবা বিভাগ তত্ত্বাবধায়ককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার এটাই একমাত্র ঘটনা নয়। ২০১৪ সালে কেন্দ্রের নানা অনিয়ম ও নিম্নমানের খাবার দেওয়ার প্রতিবাদে বেশ কয়েকজন কিশোর ছুরি দিয়ে নিজেদের হাত কেটে রক্তাক্ত করেছিল। সে সময় পাঁচ-ছয়জন কেন্দ্র থেকে পালিয়েও গিয়েছিল। সেই ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ করেছিল, তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। যেখানে কারাগারেও বন্দীকে মারধর করার বিধান নেই, সেখানে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটল কীভাবে? যে কিশোরদের এখানে পাঠানো হয়েছিল চরিত্র সংশোধন করার জন্য, তারাই লাশ হয়ে ফিরে গেল? এই নৃশংসতার জবাব কী?

দেশে তিনটি শিশু-কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। টঙ্গী ও যশোরের দুটি ছেলেদের এবং গাজীপুরেরটি মেয়েদের। এর আগে টঙ্গীর কেন্দ্রে নিয়েও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তিন কিশোর হত্যার ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন ও সমাজসেবা বিভাগ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা আশা করব, এসব কমিটির রিপোর্ট জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন। যেখানে একটি কেন্দ্রের কর্মকর্তারা অজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত কিশোরদের পেটানোর সিদ্ধান্ত নেন, সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় কীভাবে?

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন