default-image

প্রথম আলো: করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে বেশ আগে থেকেই কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন প্রস্তুতি ছিল না। ইতিমধ্যে অনেক ক্ষতি হয়েছে। এই মুহূর্তে ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনার উপায় কী?

মুজাহেরুল হক: এটা সত্যি, সরকারের তেমন প্রস্তুতি ছিল না। অনুধাবনের বিষয় হলো, এটি অতিমারি এবং বিশ্বব্যাপী। এর কোনো সীমা যেমন নেই, ঠিক তেমনি এর কোনো প্রতিকারে ওষুধও নেই। এটি থেকে পরিত্রাণ পেতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু পরামর্শ বা নির্দেশনা আছে বিশ্বের সব দেশ এবং বাংলাদেশের জন্যও। দ্বিতীয় ঢেউ, এমনকি তৃতীয় ঢেউও আসতে পারে। করোনার বিষয়টি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায় ২০১৯-এর ডিসেম্বরে। এর পরপরই বিশ্বের সব দেশকে করোনা প্রতিরোধ করার জন্য নির্দেশনা পাঠানো হয়। দেশগুলো তাদের কৌশল ঠিক করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। মালদ্বীপ টেস্ট কিট কিনে প্রস্তুতি নেয়। আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি আইইডিসিআরের মাত্র একটি ল্যাব দেশের ১৭ কোটি লোকের জন্য। পরবর্তী সময়ে যা ঘটার ঘটল। লাভ হলো, সরকার তার ভুলগুলো স্বীকার না করলেও দেশের অনেক জায়গায় এখন শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে। সরকার প্রথম ঢেউ সামলে নিলেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য প্রস্তুতি নেয়নি। দিন দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। কবে থামবে কেউ জানে না। ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব?

মুজাহেরুল হক: ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকারকে একটি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। কী করব? কীভাবে করব? কত দিনে করব? সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা জাতির কাছে তুলে ধরা দরকার। সেখানে থাকবে সরকার বা জনগণের কী করণীয়। সচেতনতা মুখ্য। তবে এটাই সব নয়। জনগণকে যথেষ্ট সচেতন করতে হবে। ধূমপানের ক্ষতি সম্বন্ধে সবাই সচেতন, এমনকি অতিসচেতন। কিন্তু তারপরও ধূমপায়ীরা সমাজে বহাল তবিয়তে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ ছিল জনগণকেও সম্পৃক্ত করা। এ কাজ করতে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অন্য যেসব দেশ দ্বিতীয় ঢেউ কমাতে সফল হলো, তাদের প্রস্তুতি কী ছিল?

মুজাহেরুল হক: অন্যান্য দেশ আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। কৌশলগত পরিকল্পনা করেই অগ্রসর হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তন করে সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সফলতা এনেছে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের যা করণীয়, তা কি করছে বলে মনে করেন?

মুজাহেরুল হক: না। সরকারের যা যা করণীয়, তা আংশিক করেছে। পরিকল্পনামাফিক করছে না।

জনগণকে সম্পৃক্ত করার কাজটি কি ঠিকমতো হচ্ছে?

মুজাহেরুল হক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ ছিল করোনা মোকাবিলায় জনগণকে সম্পৃক্ত করা। এ কাজ করতে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

তাহলে এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় কী?

মুজাহেরুল হক: জনগণকে সম্পৃক্ত করা হবে সরকারের আশু লক্ষ্য, তবেই করোনা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে। সরকারকে কৌশল ঠিক করে পরিকল্পনামাফিক যা করণীয়, তা করতে হবে জনগণকে সম্পৃক্ত করে।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সবকিছু তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেই।

মুজাহেরুল হক: সরকার স্বীকার না করলেও সমন্বয়হীনতা যে আছে, তা জনগণ দেখছে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ও বইমেলা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব জেলা ও ভালো সার্জনদের দিন। তাঁদের দায়বদ্ধ করুন। করোনা নিয়ন্ত্রণের সফলতা আসবে। সহায়তা দিন ও সহযোগিতা করুন। সে ক্ষেত্রে করোনা নিয়ন্ত্রণে সফলতা আসবে। সমন্বয় করার দায়িত্বও সিভিল সার্জনের।

গত বছর চীনা বিশেষজ্ঞরা এসে কিছু সুপারিশ করে গিয়েছিলেন। সেই সুপারিশ এখনো ফাইলবন্দী আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক সেটি পড়েও দেখেননি। তাঁকে কেউ এ সম্পর্কে কিছু জানানওনি।

মুজাহেরুল হক: চীনের পরামর্শগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। তারা করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল। তবে পরামর্শ নেওয়া আর সিদ্ধান্ত নেওয়া এক কথা নয়। ওই পরামর্শের আলোকে নিজেদের অবস্থা, অবস্থান ও সামর্থ্য বিবেচনায় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে কোনো বাধা নেই।

টিকার প্রথম ডোজ সময়মতোই বাংলাদেশ পেয়েছে। এটাকে সরকারের সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয় ডোজ পাওয়া নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা আছে বলে মনে করেন?

মুজাহেরুল হক: এখন পর্যন্ত কোনো অনিশ্চয়তা দেখা যায়নি। তবে সময়মতো টিকার দ্বিতীয় ডোজ পাওয়ার বিষয়টিও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

যুক্তরাজ্যে যে নতুন ধরনের করোনা সংক্রমণ ঘটেছে, তা নিয়েও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক আছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যফেরত অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

মুজাহেরুল হক: আমি মনে করি, যুক্তরাজ্যে যে নতুন ধরনের করোনার সংক্রমণ ঘটেছে, তা নিয়ে আমাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কেননা, এই করোনা প্রতিরোধে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কার্যকর।

এই মুহূর্তে সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

মুজাহেরুল হক: সরকারের কাছে আমার তিনটি পরামর্শ। এক. সরকারি কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। ২. করোনা নিয়ন্ত্রণে সঠিক কৌশল গ্রহণ করা। ৩. হার্ড ইমিউনিটি নিশ্চিত করা। করোনাযুদ্ধে সঠিক কৌশল নিতে পারলে করোনাকে আয়ত্তে আনা সম্ভব। এই কাজগুলো যত তাড়াতাড়ি আমরা করতে পারব, তত বেশি জীবন বাঁচাতে পারব।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকার সোমবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন দিচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছেন?

মুজাহেরুল হক: লকডাউন দিলেই তো হবে না। লকডাউন সারা দেশে কেন? এটি বিজ্ঞানসম্মত নয়। লকডাউন দিতে হবে জনগণের চলাচল সীমিত করার জন্য। যেসব এলাকায় করোনার সংক্রমণ বেশি, সেখানে লকডাউন দেওয়া যুক্তিযুক্ত। ওই সব এলাকা থেকে যাতে অন্যখানে সংক্রমণ না ঘটে। কিন্তু সারা দেশে লকডাউন মোটেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। যেসব এলাকায় সংক্রমণ কম, সেখানে লকডাউনের প্রয়োজন নেই। এতে শ্রমজীবী মানুষের রুটিরুজির পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

মুজাহেরুল হক: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন