default-image

এক মাসের বেশি হয়ে গেল মিয়ানমারে সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করেছে সামরিক বাহিনী। যদিও এ হস্তক্ষেপকে তারা অভ্যুত্থান বলতে চায় না। সামরিক বাহিনী ১৯৬২ সাল থেকেই সংসদে ও সরকারে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে কথিত নির্বাচিত সরকার গঠনের পর সাংবিধানিক কারণে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) প্রধান প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হলে একটি ভিন্ন পদ সৃষ্টি করে মোটামুটিভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন। তবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ঘুড়ির নাটাই নিজেদের হাতেই রেখেছে।

২০০৮ সালের সংবিধানে অতি কৌশলে সামরিক বাহিনীর প্রাধান্য বজায় রাখা হয়েছে। ৪১৭ ধারায় যে সাংবিধানিক ক্ষমতা সামরিক বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে, তাতে কোনোভাবেই এটাকে গণতান্ত্রিক সংবিধান বলা যায় না। কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে বেসামরিক সরকারের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করার চাবিকাঠি সামরিক বাহিনীর হাতেই রাখা হয়েছে। শুধু কেন্দ্রীয় সংসদই নয়, স্টেট সংসদেরও মোট আসনের ২৫ ভাগ সংরক্ষিত আছে। এদের নিয়োগ দেয় তাতমাদো বা সামরিক বাহিনীর প্রধান বা কমান্ডার–ইন–চিফ। কাজেই সংবিধানের কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি, বিদ্যমান ব্যবস্থায় সম্ভবও নয়। এর ওপর রয়েছে সামরিক বাহিনীর সমর্থক দল। সব মিলিয়ে চালকের আসনে সামরিক বাহিনীই আসীন। এ সংবিধানকে স্বীকৃতি দিয়েই গণতন্ত্রের কথিত মানসকন্যার নেতৃত্বে এনএলডি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

বিজ্ঞাপন

মিয়ানমারের সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতাও অনেকটা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। সংবিধানে বলা হয়েছে, বিশেষ কয়েকটি কারণ ঘটলে প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবেন। কোনো বিষয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হলে, দেশে অস্থিরতা বাড়লে প্রেসিডেন্ট ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর সঙ্গে পরামর্শ করে এক বছর মেয়াদে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়কের হাতে হস্তান্তর করতে পারবেন। ডিফেন্স কাউন্সিলকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কাজেই সংবিধানকে ঢাল বানিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে, আইনের আওতায় যা অবৈধ বলে বিবেচিত হবে না।

এই প্রেক্ষাপটেই ক্ষমতা গ্রহণ করে তাতমাদো, সর্বাধিনায়ক মিন অং হ্লাইং হন সব ক্ষমতার অধিকারী। এবারের সামরিক হস্তক্ষেপকে সামরিক অভ্যুত্থান বলতে চাইছে না তাতমাদো। তারা বলছে, সংবিধানের ধারা অনুযায়ীই এক বছরের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে। মিয়ানমারে নতুন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন কমিশন বর্তমান নির্বাচনী পদ্ধতি মেজরেটিয়ান বাদ দিয়ে প্রপরশনেট রিপ্রেজেন্টেশন (আনুপাতিক হার) পদ্ধতি চালুর চিন্তাভাবনা করছে।

দেশের বৃহত্তম দল এনএলডি যাতে এককভাবে সংসদ দখল করতে না পারে, তার জন্যই নির্বাচন পদ্ধতির এ পরিবর্তন। কোনোভাবেই এখন অং সান সু চিকে ক্ষমতায় ফিরতে দিতে চায় না তাতমাদো। সু চির বিরুদ্ধে তাই চারটি অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে আছে অবৈধভাবে বেতারযন্ত্র রাখা এবং এর মাধ্যমে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া। এগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চারটি অভিযোগই আদালতে প্রমাণিত হবে, এমনটাই নিশ্চিত করেছেন জেনারেল মিন হ্লাইং।

মিয়ানমারের জেনারেলদের বহির্বিশ্বে একেবারেই সমর্থন নেই, তা–ও কিন্তু নয়। অন্তত দুই প্রতিবেশী দেশ নিজস্ব স্বার্থেই মিয়ানমারের কথিত গণতন্ত্র নিয়ে তেমন একটা উদ্বিগ্ন নয়। শুধু অর্থনৈতিক সামরিক স্বার্থই নয়, মিয়ানমারে ভারত-চীনের কৌশলগত স্বার্থ অন্য যেকোনো দেশ থেকে বহুগুণে বেশি। চীন তো তাতমাদোর জন্মলগ্ন থেকেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জড়িত। অতীতে পশ্চিমা অবরোধ যত বেড়েছে, তত ঘনিষ্ঠ হয়েছে চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক। এবারও মনে হচ্ছে ব্যতিক্রম হবে না।

এনএলডি নেতা দেশের ভেতরে অবশ্যই যথেষ্ট জনপ্রিয়, তাতমাদো ক্ষমতা গ্রহণের পর এ জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। মিয়ানমারের মানুষ সবাই সু চির ভক্ত না হলেও যতটুকু গণতন্ত্র ছিল, ততটুকু অন্তত ফিরে পেতে চাইছে। সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব অবসানের দাবি ক্রমেই বেগ পাচ্ছে বলে সামরিক বাহিনীও আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। রোহিঙ্গা নিধনে সু চির নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে বহির্বিশ্বের অনেকেই মনে করেন, এ হত্যাযজ্ঞ তাঁর অজ্ঞাতসারে হয়নি। এ হত্যাযজ্ঞের সপক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতে তিনি সাফাই পর্যন্ত গেয়েছেন। বিশ্ববাসীর সমালোচনা এড়াতে কফি আনান কমিশনকে সমর্থন দিতে বাধ্য হলেও পরে তাদের সুপারিশটা পর্যন্ত কার্যকর করেননি। কাজেই পশ্চিমা বিশ্ব গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বললেও সু চির সপক্ষে তেমন কোনো জোরালো বক্তব্য এখন পাওয়া যায়নি। কাজেই সু চিকে নিয়ে জান্তা যে খুব একটা বিপদে আছে, তেমন মনে হয় না।

মিয়ানমারের বড় বড় শহরে জনবিরোধ দেখা গেলেও রাখাইন রাজ্যে সু চি বা গণতন্ত্র নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। বরং ওই রাজ্যের স্থানীয় পার্টি আরাকান ন্যাশনাল পার্টি (এপিএন) এনএলডির হাতে নিগৃহীত হয়েছে। যেসব জায়গায় এপিএনের জনসমর্থন বেশি, নির্বাচন কমিশন সেখানে নির্বাচনই করেনি। অপরদিকে সামরিক বাহিনী বর্তমানে আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে। কাজেই মিয়ানমারের বিবদমান রাজ্য ও অঞ্চলের কিছু কিছু জায়গায় সেনাবিরোধিতা দেখা গেলেও এসব রাজ্যের প্রায় ১৪টি বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ মনে করে, সেনাবাহিনীর একক কর্তৃত্বের সঙ্গে আলোচনাই বরং বেশি ফলপ্রসূ। কাজেই এ সময়ে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করতে চায় না তারা।

আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী আপাতত পিছপা হচ্ছে না, অন্তত একটি বছর। এক বছর পর যে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তাকে হাইব্রিড গণতন্ত্রের মধ্যেও ফেলা যাবে না। মিয়ানমারে আমরা সেনানিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র দেখেছি, তাতমাদো ভবিষ্যতে এ নিয়ন্ত্রণে আরও কৌশলী হবে। এ হবে এক নতুন ব্র্যান্ডের গণতন্ত্র।

  • ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

[email protected]

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন