নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সামাজিক আন্দোলন জরুরি

বিজ্ঞাপন
default-image

নিরাপদ খাদ্য দেশের মানুষের অন্যতম আকাঙ্ক্ষার বিষয়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে আইনের প্রয়োগসহ তথ্য-উপাত্তের জন্য দেশে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নিরাপদ খাদ্যের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। 

গতকাল রোববার প্রথম আলো আয়োজিত ‘নিরাপদ খাদ্য সবার জন্য’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন। প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল আয়োজনে সহায়তা করে সুপার স্টোর চেইন শপ স্বপ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, নিরাপদ খাদ্য অনেক ব্যাপক বিষয়। সরকার একা দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পারবে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমকে নিয়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে ২৫ লাখ খাদ্য ব্যবসায়ী আছেন। খাদ্যের বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে ১৮টি মন্ত্রণালয়ের ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান জড়িত। এ ব্যাপারে ১২০টি আইন ও বিধিবিধান রয়েছে। ৬৪টি জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ৭৪টি আদালত নিরাপদ খাদ্যের জন্য কাজ করছে।
মাহফুজুল হক বলেন, নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি অতীতে প্রশাসনিকভাবে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে। পেশাদারি বিষয়গুলো কম গুরুত্ব পাওয়ায় কিছু ভুল হয়েছিল।
পণ্যে ফরমালিন ও কার্বাইড থাকার অভিযোগে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে অহেতুক ঝামেলার মুখে পড়তে হয়েছে, তার বর্ণনা দেন স্বপ্নের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান। স্বপ্নের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য পাওয়া মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। স্বপ্ন প্রতিদিন সরকার, গণমাধ্যম, কৃষক, ভোক্তা-সবার কাছ থেকে নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে শেখার চেষ্টা করে। খাদ্যের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার জন্য কাজ করছে স্বপ্ন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, মানুষের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিরাপদ খাদ্য। এ ক্ষেত্রে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূষিত খাদ্যের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক মো. ইকবাল রউফ মামুন বলেন, খাদ্যদূষণ ও নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে অনেকে বক্তব্য দেন গবেষণালব্ধ তথ্য ছাড়াই। মিনিকেট চাল খেলে ক্যানসার হয়-এর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কীটনাশক অর্থই তা খারাপ, এমন নয়। বিধিবিধান মেনে কীটনাশক ব্যবহার করলে ক্ষতি নেই।
শুরুর উপস্থাপনায় স্বপ্ন-এর বাণিজ্য বিভাগের প্রধান মো. মাহদি ফয়সাল বলেন, সারা দেশে স্বপ্নের ৭৫টি বিপণন কেন্দ্র আছে, এর মধ্যে ঢাকা শহরে ৫৪ টি। এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫ লাখ ক্রেতা তাঁদের পণ্য নিয়মিত কেনেন। দেশের ২ হাজার ৭৯২ জন কৃষকের কাছ থেকে স্বপ্ন নিরাপদ শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস সংগ্রহ করে। তিনি বলেন, ৭৫ শতাংশ কৃষক জানেন কীটনাশকে ক্ষতি হয়, তারপরও ফসল কম হবে, এই আশঙ্কায় কীটনাশক ব্যবহার করেন।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, হাসপাতালগুলোতে রোগী বেড়ে যাওয়ার কারণ দূষিত ও ভেজাল খাদ্য। মাটি দূষিত হলে সেই মাটি থেকে আসা খাদ্য বিশুদ্ধ হওয়ার সুযোগ কম। সরকারের মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ জেলার মাটিতে জৈব উপাদান শূন্যের কোঠায়। দেশে গরু মোটাতাজাকরণের নামে যা হচ্ছে, সে ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ইউএসএআইডির ব্যক্তি খাতবিষয়ক পরামর্শক অনিরুদ্ধ হোম রয় বলেন, বাংলাদেশে মানুষ গড়ে বছরে ১৭৩ কেজি চাল, ২৭ কেজি শাকসবজি ও চার কেজি মাংস খায়। ধান-চালের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা। এই ‘ভরপেট’-এর ধারণা থেকে বের হওয়া দরকার। যেনতেনভাবে খাদ্য উৎপাদনের কারণে খাদ্য নিরাপদ রাখা কঠিন। অনিরাপদ খাদ্য বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
একই প্রতিষ্ঠানের অ্যাগ্রিকালচারাল ভ্যালু চেইন প্রকল্পের চিফ অব পার্টি পল বানডিক বলেন, অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন কৃষকের জন্য সমস্যা। এটা ব্যবসায়ীদের জন্যও সমস্যা। বেশ কিছু কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো অজানা। এসব বিষয়ে কৃষক ও ভোক্তাদের সচেতন করার দায়িত্ব গণমাধ্যমের।
একই প্রকল্পের ডেপুটি চিফ অব পার্টি বানি আমিন বলেন, ভোক্তা যদি নিরাপদ খাদ্যের জন্য মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে কৃষক লাভবান হন। কৃষক লাভবান হলে তিনি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে মনোযোগী হবেন। ভোক্তা সচেতন হলে নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বাড়বে।
গোলটেবিল বৈঠকে প্যাকেট করা আঙুর এনেছিলেন ভারতের ফার্ম প্রোডিউস অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রির নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক পরামর্শক অভিলাষ গোরহে। তিনি ইউরোপের বাজারে কোন প্রক্রিয়ায় নিরাপদ আঙুর রপ্তানি করেন, তার বর্ণনা দেন।
গোলটেবিল বৈঠকে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কুল্লাপাড়ার কৃষক মো. সাইফুল ইসলাম অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, তাঁর এলাকায় ১০০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে স্বপ্ন। এর ফলে ফলন বেড়েছে। কীটনাশক ব্যবহার করে আগে যেসব শারীরিক সমস্যা হতো, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তা কমেছে।
বৈঠকে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারাসাইটোলজি বিভাগের শিক্ষক মো. সহিদুজ্জামান। আধুনিক পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, খাদ্য ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ, প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি এবং নিয়মিত গবেষণার ব্যবস্থা করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. কামরুল ইসলাম বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। আইন করাই যথেষ্ট নয়। দরকার আইনের প্রয়োগ।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সেবা শাখার উপসমন্বয়ক মোস্তফা মাহফুজ বলেন, ঢাকা শহরের চারটি বস্তির ৩৬০ শিশুর ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ শিশুই অনিরাপদ খাবার খায়। অতিসম্প্রতি ঢাকা শহরে ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দেওয়ার কারণ অনিরাপদ পানি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন