বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পশতুনদের আধিপত্য

তিন শীর্ষ নেতাসহ (আমিরসহ) তালেবানের প্রধান নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারণী শুরা কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে বৃহত্তর কান্দাহার থেকে নেওয়া হয়েছে। পশতুন অধ্যুষিত দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রায় পুরো অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত। তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের পরিবারের দুজন সদস্য মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। তাঁর ছেলে মোল্লা ইয়াকুব প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন, চাচা মোল্লা আবদুল মান্নান জনকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। কান্দাহারের ১৫ জন মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন। পশতুন অধ্যুষিত আরেকটি অঞ্চল পাকতিয়া। দক্ষিণের সব প্রদেশ এর অন্তর্ভুক্ত। হাক্কানি নেটওয়ার্ক এ অঞ্চলেরই। মন্ত্রিসভায় এ অঞ্চলের ১০ জন স্থান পেয়েছেন। বহু বছর ধরে ভয়ংকর হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিরাজ হাক্কানি। তিনি তালেবানের উপনেতা হয়েছেন। তাঁর মাথার মূল্য ধরা রয়েছে ১ কোটি ডলার। তাঁকে তালেবান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে। তাঁর চাচা খলিল হাক্কানির মাথার মূল্য ৫০ লাখ ডলার। তাঁকে করা হয়েছে শরণার্থীবিষয়ক মন্ত্রী।

পশতুন অধ্যুষিত আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় নানগড়হর এলাকা থেকে পাঁচজনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল যেখানে পশতুনদের বাইরে অন্য জাতিগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখান থেকে মাত্র তিনজনকে (দুজন তাজিক, একজন উজবেক) মন্ত্রী করা হয়েছে। সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ পদটি দেওয়া হয়েছে তাজিক কমান্ডার কারি ফাসিউদ্দিনকে। নর্দান প্রদেশ জয় করার ভূমিকার কারণে তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনী না থাকায় এর যতটা না স্মারক মূল্য, বাস্তব মূল্য ততটা নয়। দুজন উপপ্রধানমন্ত্রীর একজন আবদুল সালাম হানাফি। মন্ত্রিসভার একমাত্র উজবেক সদস্য তিনি। তালেবানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহু পুরোনো। তিনিও ১৯৯০-এর দশকের তালেবান শাসনের অংশ ছিলেন।

মন্ত্রিসভায় একজনও নারী সদস্য নেই। যদিও দুই দশক ধরে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক অঙ্গনে অনেক নারী নিজেদের জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছেন। অনেক সাহসী ও স্পষ্টবাদী নারী সংসদ সদস্য এবং মেধাবী সাংবাদিক ও সমাজকর্মী সেখানে রয়েছেন। কিন্তু তালেবান তাদের মধ্যযুগীয় মতাদর্শের কারণে নারীদের সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন থেকে সরিয়ে রাখতে চাইছে। তারা এবার নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বন্ধ করতে না পারলেও শ্রেণিকক্ষে পর্দা দিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের পৃথক করেছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ড্রেস কোড নির্ধারণ করে দিয়েছে।

তরুণদের উপেক্ষা

মন্ত্রিসভার বেশির ভাগ সদস্য মধ্যবয়সী, তাঁরা তালেবানের পুরোনো প্রহরী। তরুণেরা নতুন মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব করছেন না। প্রকৃতপক্ষে মাদ্রাসা শিক্ষার পুরোনো পটভূমি থাকার কারণে তালেবান নেতারা লাখ লাখ তরুণকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। ছেলেমেয়ে দুইয়ের ক্ষেত্রেই এটা সত্য। গত দুই দশকে দেশের আনাচকানাচে শিক্ষার যেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, এসব তরুণ সেখান থেকেই এসেছে। পাকিস্তানের মাদ্রাসায় প্রশিক্ষিত তালেবান আফগানিস্তানের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা আফগান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভয়াবহ একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করল। এসব বাদ দিয়ে দেওয়া তালেবানের স্মারকচিহ্ন হয়ে থাকল। খুব তাড়াতাড়ি তালেবান প্রতিরোধের বীজ এতে বোনা রইল। এরই মধ্যে পানশিরে সশস্ত্র সংগ্রাম এবং শহরগুলোতে নারীদের নেতৃত্বে যুব আন্দোলন হয়েছে। তালেবান মন্ত্রিসভা ঘোষণার সময়েই এসব দ্বন্দ্ব যেন প্রতীকী হিসেবে হাজির হয়েছে। আহমেদ মাসুদের ডাকে তালেবানবিরোধী একটা সাহসী মিছিল হয়েছে। আহমেদ মাসুদ ১৯৯০–এর দশকে তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য পরিচিত পানশিরের নেতা আহমেদ শাহ মাসুদের ছেলে। তালেবানের বন্দুকের মুখে নারী প্রতিবাদকারীদের সাহস ছিল অবিস্মরণীয়। প্রতিবাদ মিছিলটি কাবুলে পাকিস্তান দূতাবাসের দিকে যায়। তারা পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান দেয়। কেননা পাকিস্তান ও তালেবান অভিন্ন সত্তা।

পাকিস্তান তাদের নিরাপত্তায় যাদের বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না, এমন তালেবান কমান্ডারদেরও সরকার থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। মনসুর ও আমির খানের নেতৃত্বাধীন অংশকে সরকারে নেওয়া হয়নি। একইভাবে সার্দি ও গুল মোহাম্মদের মতো কমান্ডারদেরও বাইরে রাখা হয়েছে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে এমন নেতাদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভার তালিকা থেকে এটা স্পষ্ট, তালেবানে তেমন কোনো বদল আসেনি। বদলে যাওয়া তালেবানের যে সচকিত শব্দ শোনা যাচ্ছিল, সেটা আসলে কিছুই না।

কিন্তু এর সবকিছুর মধ্যে অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক শাখা–প্রশাখা রয়েছে। পাকিস্তান পশতুন তালেবানের ওপর জোর দিয়েছে। ডুরান্ড লাইনের দুই পাশের পশতুন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দুর্বল করতে চায় তারা। পশতুনদের তালেবানকরণের পেছনে পাঞ্জাবি জেনারেলদের উদ্দেশ্য এটাই। কিন্তু পশতুনদের বাইরে অন্য জাতিগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়ার ফলে আফগানিস্তান ভয়ানক অস্থিতিশীলতার মধ্যে পড়বে।

জাতিগতভাবে একই গোষ্ঠীর লোকেরা আফগানিস্তানের উত্তর এবং পশ্চিম সীমানার একই জায়গায় বসবাস করে। আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সমস্যাটা যুক্ত। প্রকৃতপক্ষে ১৯৯০–এর দশকে ছায়াযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এটা। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেই তারা কেবল তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেবে। এমনকি তুরস্ক, যারা আফগানিস্তানের নিকট প্রতিবেশী নয়, তারাও তালেবানকে স্বীকৃতির জন্য যে শর্ত দিয়েছে, সেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারের বিষয়টা রয়েছে। কিছু পশ্চিমা দেশ তালেবান সরকার থেকে নারীদের বাদ রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। অন্যান্য মুসলিম দেশ ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে অন্যান্য শিক্ষাকে যুক্ত করেছে। তালেবানের কমান্ডারদের আয়ত্তে এই দুই বিষয় একসঙ্গে নেই। একটা ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তালেবানের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে ছাইপাঁশের সঙ্গে তুলনা করছেন। এ ধরনের শিক্ষা তাঁকে নিতে হয়নি বলে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন তিনি। আধুনিক সরকারব্যবস্থা নিয়ে তালেবানের কোনো ধারণা নেই। কলাকৌশলে অভিজ্ঞ লোকদের আকৃষ্ট করার সক্ষমতাও তাদের নেই। মজার বিষয় হচ্ছে, সরকারব্যবস্থা কেমন হবে, তা জানিয়েই মন্ত্রিসভার ঘোষণা দিয়েছে তালেবান। সংবিধান এবং এর বিধিবিধান নিয়ে একটি শব্দও তারা উচ্চারণ করেনি।

আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী বলে স্বীকৃতদের উপেক্ষা করা শুধু বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে বাধা সৃষ্টি করবে না, তালেবান সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তব একটা সমস্যাও তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ তালেবান সরকারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্যদের কয়েকজন যাঁদের নাম আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের তালিকায় রয়েছে, তাঁরা কীভাবে অন্য দেশে ভ্রমণ করবেন? জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কারা মোকাবিলা করবেন? সশস্ত্র গোষ্ঠী কীভাবে আফগানিস্তান দখল করার পর সরকার ও রাষ্ট্র বনে গেল? কেবল সময়ই তার উত্তর বলে দেবে।

# আফ্রাসিয়াব খটক: পাকিস্তানের সাবেক সিনেটর ও আঞ্চলিক রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক

ইংরেজি থেকে অনূদিত

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন