default-image

তাঁর ভরাট উদাত্ত উচ্চারণে বিজয়ের বার্তা সেদিন পৌঁছে গিয়েছিল গোটা বাংলায়, বিশ্বে। ইথারে—বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সর্বত্র। বিশেষ বুলেটিন শেষ হতেই বিজয়ের গান—‘বিজয় নিশান উড়ছে, উড়ছে বাংলার ঘরে ঘরে’।

১৬ ডিসেম্বর, একাত্তর। সেদিনের সেই মহার্ঘ বুলেটিন ছিল তাঁর নিজের হাতেই লেখা। তিনি তখন স্বাধীন বাংলা বেতারের নিউজ এডিটর। তিনি কামাল লোহানী। বাংলাদেশের কিংবদন্তিসম সাংবাদিক। শব্দসৈনিক। মার্ক্সবাদী। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক অনন্য চরিত্র। তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে মিলেমিশে আছে রাজনীতি, সাংবাদিকতা আর সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যদিও নিজে বলতেন, ‘তিনটি বিষয়ই কিন্তু রাজনীতিসম্পৃক্ত। আর এর মৌল ভিত্তি হলো জনগণ।’
দেখেছেন দাঙ্গা, স্বাধীনতা, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নয়, বরং এই সাতাশিতেও এক বুক আশা নিয়ে ছিল আঠারোর প্রত্যয়। শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন রাস্তায়। মানুষের কাছে, মানুষের ভিড়ে।
কলকাতায় কেটেছে তাঁর শৈশব। দেখেছেন দাঙ্গা, প্রতিরোধে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা। কলকাতাতেই লাল ঝান্ডার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। স্বাধীনতার দিনে বাসায় লাল ঝান্ডা উড়িয়ে ‘শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা’।
বেয়াল্লিশ থেকে কলকাতায়। আগের বছর মা মারা গেছেন। তাই ফুফুর কাছে চলে আসেন কলকাতায়। ফুফু ছিলেন স্কুলশিক্ষক। থাকতেন পার্ক সার্কাসে, কিম্বার স্ট্রিটে।
বছর তিনেক আগে শেষবার কলকাতায় এসে বলছিলেন, ‘ছেচল্লিশে আমি তখন ক্লাস সিক্সে। মডার্ন হাইস্কুলে। সেদিন ফুফুর চোখ এড়িয়ে স্কুল থেকে হাঁটতে হাঁটতে গিয়েছিলাম গড়ের মাঠের দিকে। দেখি লোকজন দোকান লুট করছে। আমিও দুটো নরম পানীয়র বোতল তুলে নিই। সবাই খুলে খাচ্ছে দেখে আমিও খোলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। বাড়ি নিয়ে এলাম। ফুফু সব শুনে বেদম পেটালেন। বললেন, “জানো, একে কী বলে? একে বলে লুট।” ওই দিনই আমি শিখি দাঙ্গা, লুট, গণহত্যার অর্থ। আর সেই শিক্ষা কখনো ভুলিনি।’
দাঙ্গার ঠিক পরই চলে আসেন এন্টালিতে, ড. সুরেশ সরকার রোডে। ওখানে তখন থাকতেন ডকশ্রমিকেরা। তখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। সিপিআই দাঙ্গাবিরোধী প্রচারাভিযান চালাচ্ছে। ওই শ্রমিকেরাই তাঁকে বোঝান, ওঁরা কমিউনিস্ট, ওঁরা সবার ঐক্য চান। ওঁদের হাতেই প্রথম দেখেন লাল ঝান্ডা। স্বাধীনতার দিনে অতশত না বুঝে ভুল করে বাসায় উড়িয়েছিলেন সেই লাল ঝান্ডা। হাতের কাছে পেয়েছিলেন বলেই হয়তো। ওই ডকশ্রমিকেরাই তখন এসে বুঝিয়েছিলেন, ‘খোকা, এটা কী করেছ? এটা দেশের পতাকা নয়।’ সেদিন নিজের মতো করে বুঝেছিলেন স্বাধীনতা, কমিউনিস্ট পার্টির মানে।
সেদিন দেশভাগ বোঝেননি, বুঝেছিলেন কদিন বাদে। পরের বছর মার্চে পাকাপাকিভাবে চলে এসেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে, আজকের বাংলাদেশের পাবনায়।
মাঝে ছাত্র আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টি, জেল। সেই জেলে তখন ফরিদপুরের শান্তি সেন, ময়মনসিংহের নরেন সরকারের মতো প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতারা ক্লাস নিতেন। আর তাঁর প্রতিদিনের কাজ ছিল শ্রমিক কমরেডদের কাছে কলকাতা থেকে আসা ‘দ্য স্টেটসম্যান’ আর ‘পাকিস্তান অবজারভার’ সরাসরি তরজমা করে শোনানো। আর ‘এভাবেই সংবাদ ছাপা হয়ে গিয়েছিল আমার হৃদয়ে। আসলে সাংবাদিকতা আমি শিখেছিলাম জেলে বসে।’ পরে মুক্তি পেয়ে ’৫৫-তে যোগ দেন ‘দৈনিক মিল্লাত’-এ।
১৯৬২, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সম্পাদক। মতের মিল না হওয়ার কারণে পাঁচ বছর পর প্রতিষ্ঠা করেন বামপন্থী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি’।
একাত্তর, মার্চে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র। আর তখনই কলকাতায় বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে বিদ্রোহী বেতার কেন্দ্র স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রতিষ্ঠা। এখান থেকেই ইথারে ছড়িয়ে পড়ত রণাঙ্গনের খবর, মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য নিয়ে প্রতিবেদন। ‘চরমপত্র’, ‘অগ্নিশিখা’, ‘দর্পণ’, ‘বজ্রকণ্ঠ’র মতো অনুষ্ঠান। রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের অকুতোভয় লড়াইয়ে প্রেরণার উৎস।
১৬ ডিসেম্বর, সকাল থেকেই খবর আসছিল, কিন্তু বিকেল সাড়ে চারটার আগে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না, পাকিস্তানি সেনারা আদৌ আত্মসমর্পণ করবে কি না। যখন নিশ্চিত হলো, উচ্ছ্বাসে সবাই রাস্তায়। খোলা আকাশে স্লোগান। তার পরই বিশেষ বুলেটিন তৈরির প্রস্তুতি। পাঁচ লাইনের নিউজ বুলেটিন। পরে দীপ্তি (লোহানীর স্ত্রী) পাঠ করেছিলেন ‘ঢাকায় স্বাধীনতার সূর্য’, যা তিনি লিখেছিলেন সেই দুপুরেই, যখন খবর আসছিল।
আজ, স্বাধীনতার ৫০ বছরের পথে বাংলাদেশ। শেষ দিন পর্যন্ত স্বপ্ন দেখতেন তিনি। দেখতেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক উপমহাদেশের স্বপ্ন। এ কারণে বছর কয়েক আগে ঢাকায় সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় কালচারাল কনভেনশন করেছেন। বাংলাদেশের উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ছিল এর আয়োজক। তাতে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং চীন ও জাপানের প্রতিনিধিরা ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, পারস্পরিক আদান-প্রদান, মতবিনিময় ভবিষ্যৎকে ঋদ্ধ করবে। তিনি মনে করতেন, আজ সাম্প্রদায়িকতা মানুষের মনে যে শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে, তাতে সংস্কৃতিকর্মী, সাংস্কৃতিক বাহিনীকে তাদের ঈপ্সিত ভূমিকা অবশ্যই পালন করতে হবে।
মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সংস্কৃতির ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট। ‘রাজনীতির ক্ষেত্রে যে বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এ ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছাড়া কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনেই রেহাই মিলবে—বলা মুশকিল। কারণ, রাজনীতি কোনো ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হয়। সেই জায়গায় সংস্কৃতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে রাজনীতি তার পথকে মসৃণ করতে পারে। সে জন্য বাংলাদেশে বর্তমানে যে সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মান্ধতার দাপট—তার বিরুদ্ধে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মানুষ নিশ্চুপ, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। মানুষের মনে ক্ষোভ, অসন্তোষ রয়েছে। প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ। শুধু তা প্রকাশ করার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। সাংস্কৃতিক আন্দোলন এখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।’
মৃত্যুর দুই বছর আগে পি সি যোশীকে লেখা এক চিঠিতে বিখ্যাত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘সাংস্কৃতিক আন্দোলন জমি চাষ করবে। কমিউনিস্ট পার্টি তাতে বীজ বপন করবে। এমনভাবেই এগোতে হবে আমাদের।’ বামপন্থী রাজনীতি যখন অসহায় বোধ করেছে, তখন সব সময়ই সেই হাত ধরে তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করেছে বামপন্থী সংস্কৃতি।
এই তত্ত্বায়নই ছিল লোহানীর জীবনের রসায়ন।

শান্তনু দে:
পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0