default-image

গত এক যুগে ফিলিস্তিনের হামাস ও ফাতাহর মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা এবং চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবে শান্তির দেখা মেলেনি। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। আরব রাষ্ট্রগুলো যখন ফিলিস্তিনিদের পরিত্যাগ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উদগ্রীব, যখন ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করা হয়, যখন শতাব্দীর চুক্তি নামে ফিলিস্তিনিদের ভূমি কেড়ে নেওয়া চলে, যখন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকে বৈধতা দেওয়া হয়, তখন ফিলিস্তিনের প্রধান দুই স্বাধীনতাকামী দল হামাস ও ফাতাহ দীর্ঘ বৈরিতা ভুলে আলোচনায় সম্মত হয়েছে। এই আলোচনা ফিলিস্তিনিদের জীবনে আশার সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কারও উদ্রেক ঘটিয়েছে।

আল–জাজিরার খবরে প্রকাশ, ফাতাহ ও হামাসের শীর্ষ নেতৃত্ব ইসমাইল হানিয়া এবং মাহমুদ আব্বাস দীর্ঘ আলোচনার পর আগামী ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাজি হয়েছেন। কয়েক ধাপে হবে এই নির্বাচন, যার শুরু স্থানীয় সরকার থেকে আর শেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনের খবরে গাজা, রামাল্লা ও পশ্চিম তীরের মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ উৎসব করেছেন। প্রধান দুই দলের মধ্যে মীমাংসার আশা দেখছেন তাঁরা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দুই কারণে নির্বাচন নিয়ে আশার আলো দেখছেন না। প্রথমত, ফাতাহ ও হামাসের মধ্যকার এই বিভেদ নিছক বিবাদ নয়, এই বিবাদ আদর্শিক। এই আদর্শিক বিভেদের সঙ্গে ওয়াশিংটন, লন্ডন, মস্কোসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুই বলয় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাই নির্বাচন বরং আদর্শিক এই বিভেদকে উসকে দিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ স্থায়ী করবে।

দ্বিতীয়ত, আমিরাতে নির্বাসিত মোহাম্মাদ দাহলানের ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি। একসময়ের ফাতাহ নেতা দাহলান বর্তমানে আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের উপদেষ্টা। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধুচন্দ্রিমার প্রধান রূপকার বলা হয় দাহলানকে। ইসরায়েলের প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সৌদি বলয় এবং মার্কিনরা মাহমুদ আব্বাস–পরবর্তী সময়ে মোহাম্মাদ দাহলানকে ফাতাহর প্রধান হিসেবে দেখতে চায়। পশ্চিমাদের প্রিয় দাহলান ফাতাহর প্রধান হলে হামাস ও ফাতাহ দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। তাই নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ পরিত্যাগ করা দুষ্কর হয়ে উঠবে।

বিজ্ঞাপন

ফিলিস্তিনিদের প্রথম ইন্তিফাদা–পরবর্তী সময়ে ভিন্নমতাবলম্বী গ্রুপের একটি অংশ এবং তৎকালীন মুসলিম ব্রাদারহুডের সহযোগিতায় ১৯৮৭ সালে গাজায় হামাস গঠিত হয়। আদর্শিকভাবে ফাতাহ ও হামাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফাতাহ যেখানে সমাজবাদী ও সেক্যুলার আদর্শকে প্রাধান্য দিত, সেখানে হামাস সম্পূর্ণ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে সংজ্ঞায়িত করে। সময়ের পরিক্রমায় হামাস ও ফাতাহর দ্বন্দ্ব স্থায়ী রূপ নেয়। সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি হয় যখন ১৯৯৩ সালে আরাফাত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনের সঙ্গে পশ্চিমা বিশেষ করে মার্কিনদের প্রচেষ্টায় অসলো চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ফাতাহ ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং ইসরায়েল ফিলিস্তিনের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ফাতাহকে স্বীকৃতি প্রদান করে হামাসকে আলোচনার মঞ্চ থেকে বের করে দেয়। এই চুক্তির মাধ্যমে আরাফাত ফিলিস্তিনের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমনকি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বৃহৎ অর্থে সশস্ত্র সংগ্রামের ইতি টেনেছিলেন। এডওয়ার্ড সাইদ থেকে শুরু করে উপনিবেশবাদবিরোধী সব চিন্তকেরা আরাফাতের চুক্তিতে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সাইদ আরাফাতের এই চুক্তিকে আলোচনা নয়, বরং ইসরায়েলের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে অবহিত করেছিলেন, যা উঠে এসেছে সাইদের ‘দ্য এন্ড অব দ্য পিস প্রসেস’ গ্রন্থে।

১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই মূলত ফিলিস্তিনিদের উপনিবেশবাদবিরোধী আন্দোলনে ভাটা পড়ে। আন্দোলনের নৈতিক অবস্থান বিলীন হতে থাকে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিতে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি পশ্চিমাদের সহায়তায় ফাতাহর বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অন্যান্য আরব ও পশ্চিমা দেশে আবাস গড়েন। যেকোনো সংগ্রামের প্রধান শক্তি আপসহীনতা। এই সংগ্রামে সামান্য আপস সমগ্র আন্দোলনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে; এমনকি সংঘবদ্ধ শক্তির দখলদারত্বের বৈধতাও প্রদান করতে পারে। কালের পরিক্রমায় ফাতাহ এই পরিণতি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেনি। ফাতাহ যেভাবে পশ্চিমাদের বগলবন্দী হয়ে উপনিবেশবাদবিরোধী আন্দোলনকে থামিয়ে দিয়ে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, ঠিক একইভাবে সিরিয়ার পিকেকে মার্কিনদের সহযোগিতায় নতুন জাতিবাদী কুর্দি রাষ্ট্র গঠনের আশায় কুর্দিদের ইরাক, সিরিয়া, ইরান ও তুরস্কের বিরুদ্ধে নিজেদের আদর্শিক সংগ্রামকে পরিত্যাগ করে, মার্কিনদের বগলবন্দী হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সমাজবাদী আন্দোলনকে নিস্তেজ করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া সময়, ধৈর্য ও প্রছন্ন কর্মপদ্ধতি দাবি করে। অটোমানদের শেষ সময় থেকেই ফিলিস্তিনিরা ইউরোপে থেকে উচ্ছেদকৃত ইহুদিদের কাছে নিজেদের খামারি জমি, বসতবাড়ি হারাতে শুরু করে। শুরুতে মহল্লাকে কেন্দ্র করে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রশিক্ষিত ব্রিটিশ সৈন্যদের বুলেটের সামনে এই প্রতিরোধ আন্দোলন ব্যর্থ হলেও ওই আন্দোলন ফিলিস্তিনের নতুন প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেছিল।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনিদের মাটিতে ইহুদিবাদীরা ফিলিস্তিনি ভূমির প্রায় ৮০ ভাগ দখল, প্রায় ৮ লাখ বাসিন্দাকে উচ্ছেদ এবং হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস করে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠন করলে ভয়াবহ এক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। মাতৃভূমির এই বিপর্যয়কে সঙ্গী করে মাতৃভূমিকে দখলদারত্ব থেকে মুক্ত করতে কুয়েতপ্রবাসী ফিলিস্তিনিদের প্রচেষ্টায় ১৯৫০ সালে ইয়াসির আরাফাত এবং তাঁর সহকর্মীদের সংগ্রামী স্পৃহায় ফাতাহ গঠিত হয়েছিল। ইসলামপন্থী ও সমাজবাদী চিন্তার এক বিরল মিশ্রণে গঠিত ফাতাহ–পরবর্তী কয়েক দশকের জন্য ফিলিস্তিনের সব মানুষের কণ্ঠস্বর এবং ১৯৬৭ সালে আরব–ইসরায়েল যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে গোটা বিশ্বে ইয়াসির আরাফাত সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

তবে ইয়াসির আরাফাত এবং তাঁর ফাতাহকে উৎখাতের জন্য ইসরায়েলের ১৯৮২ সালের লেবানন আক্রমণ ও পরবর্তী সময়ে আরব রাষ্ট্রগুলোর ক্রমাগত বৈরিতা ও বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া আরাফাত যখন ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় সম্মতি জানান, তখন থেকেই ফিলিস্তিনিদের জনমনে এবং দুনিয়ার মানুষের মধ্যে আরাফাতের উপনিবেশবাদবিরোধী চিত্রে ফাটল শুরু হয়। আরাফাতের আত্মঘাতী এই শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ আন্দাজ করতে পেরে নিজস্ব কায়দায় উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম জারি রাখার পরিকল্পনা নিয়ে একটি অংশ ফাতাহ ত্যাগ করে। ত্যাগী এই গ্রুপের প্রধান যুক্তি ছিল, বৃহৎ পশ্চিমা শক্তি এবং সুসংগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ–আলোচনায় ফাতাহ পেরে উঠবে না। আর ইসরায়েল ও মার্কিনরা কখনোই দুই রাষ্ট্র গঠনের চুক্তিও মানবে না। তাই আদতে এই শান্তি আলোচনা ইসরায়েলের দখলদারত্বকে বৈধতা প্রদান করা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। এই ঘোষণা দিয়ে সংগ্রামের অবিরত ধারাতেই মুক্তি নিহিত বলে মনে করেন ফাতাহ ত্যাগ করা ভিন্নমতাবলম্বীরা।

বিজ্ঞাপন
ফিলিস্তিনিরা জানে না আদৌ নির্বাচন হবে কি না, কিংবা নির্বাচনের ফল পশ্চিমারা মেনে নেবে কি না। তবে এই আংশিক আলোচনা ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের মধ্যে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসার বিষয়ে আশার সঞ্চার করেছে।

প্রথম ইন্তিফাদায় জন্ম নেওয়া হামাস ২০০০ সালের দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় আপসহীনতার দরুন ফিলিস্তিনিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে হামাস ২০০৬ সালের নির্বাচনে ইয়াসির আরাফাতের ফাতাহকে হারিয়ে দেয়। নির্বাচনে ১৩২ আসনের মধ্যে হামাস ৭৬টি এবং ফাতাহ ৪৩টি আসন পায়। নির্বাচনে ফাতাহর পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে আপস এবং ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে বিকিয়ে দেওয়া। হামাসের সরকার গঠনের এক বছরের মাথায় মার্কিনদের বিশেষ করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনবরত যুদ্ধের অন্যতম রূপকার কন্ডোলিৎসা রাইসের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস হামাসের সরকারকে বরখাস্ত করে।

এখানেই রয়েছে পশ্চিমা গণতন্ত্রের আসল চোরাবালি। আদতে গণতন্ত্রের নামে পশ্চিমারা নিজেদের মিত্রদের নির্বাচনে জিতিয়ে আনতে চায়, যেখানে সাধারণ মানুষের ইচ্ছার কোনো মূল্যায়ন নেই। মিত্ররা পরাজিত হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধুয়া তুলে অর্থনৈতিক অবরোধ অথবা সেনা অভ্যুত্থান দিয়ে সরকারের পতন ঘটায়। বৃহৎ অর্থে হামাসের পরিণতি সমকালীন ভেনেজুয়েলার মাদুরো, বলিভিয়ার ইভো মোরালেস থেকে খুব ভিন্ন নয়। আদতে পশ্চিমারা কি অপশ্চিমা দেশগুলোকে গণতন্ত্রচর্চার সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নে প্রস্তুত আছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে।

ফিলিস্তিনিরা জানে না আদৌ নির্বাচন হবে কি না, কিংবা নির্বাচনের ফল পশ্চিমারা মেনে নেবে কি না। তবে এই আংশিক আলোচনা ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের মধ্যে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসার বিষয়ে আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে ফাতাহ এবং সৌদি বলয় হামাসকে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগ করতে আবার চাপ প্রয়োগ করবে নিশ্চয়ই। তবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির পরিক্রমা মাথায় রেখে যদি হামাস অস্ত্র পরিত্যাগ করে, তাহলে আগামী এক দশক পর ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের অস্তিত্ব থাকবে কি না, সেই বিষয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। এই দুর্দশার মধ্যে ফিলিস্তিনের জন্য আশার সংবাদ হলো, গাজা, রামাল্লা ও পশ্চিম তীরে স্থানীয় সমাজে প্রভাবশালীরা আবার একত্র হয়েছেন ফাতাহ ও হামাসের মধ্যকার ‘বিবাদ’ নিরসনে। ভূমিহারা ও নির্যাতিত এই সব বঞ্চিত মানুষ মনে করেন, ট্রাম্প ও সৌদি বলয় ‘শতাব্দীর চুক্তি’র মাধ্যমে ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রদান করছে। তাই এখন আবার সময় এসেছে উপনিবেশবাদ ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে নতুন করে সম্মিলিত সংগ্রামের।

রাহুল আনজুম: আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক গবেষক।

মন্তব্য পড়ুন 0