default-image

ঢাকা সফর করে ফিরে আসার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, কেমন হলো, তাহলে এক শব্দের উত্তর পাবেন—দারুণ। সামান্য একটু ব্যাখ্যা চাইলে সাউথ ব্লক বলবে, বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে গিয়েছিলেন, বিশ্বাসের বীজ বপন করে ফিরেছেন।
অতি সংক্ষেপে এই সফরের নির্যাস এটাই। বন্ধুতা, বিশ্বাস, সহযোগিতা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ—এ বার্তাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একেবারে প্রথম দিন থেকেই প্রতিবেশীদের দিতে চেয়েছেন। শপথ গ্রহণের দিন প্রতিবেশী রাষ্ট্রনায়কদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভুটানকে বেছে নিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম একক সফরের জন্য বাংলাদেশকে পছন্দ করেছেন।
ওখানেই থেমে থাকেননি তিনি। শ্রীহরিকোটা থেকে ভারতের আরও একবার সফল উপগ্রহ উৎক্ষেপণের দিন তিনি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এবার একটা সার্ক উপগ্রহ তৈরি করুন, যা আমরা প্রতিবেশীদের উপহার দেব। সেই উপগ্রহ, যা আমাদের দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূর করতে সাহায্য করবে, সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানের প্রসার ঘটাবে, সার্কের যুব সম্প্রদায়ের বিকাশের জন্য সুযোগ ও সুবিধার এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।’ সংক্ষেপে, সুষমার তিন দিনের ঢাকা সফর ছিল প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক প্রতিবেশী-পরিকল্পনারই এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
কংগ্রেস সরকারের বাংলাদেশ-নীতি নতুন সরকারের আমলে বদলায় কি না, এমন একটা জল্পনা বাংলাদেশে ভোটের আগে-পরে মাথাচাড়া দিয়েছিল। এর নানাবিধ অভ্যন্তরীণ কারণ আছে। সেই কারণগুলোর কিছু কিছু অতিসরলীকরণও বটে। যেমন, ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ও বিজেপি যেহেতু ভিন্ন মেরুর, কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক যেহেতু মাখামাখি, সেহেতু ক্ষমতায় এসে কংগ্রেসি-নীতি বিজেপি বদলে দেবে, বিজেপি-বিএনপি কাছাকাছি আসবে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করবে ইত্যাদি।
এ ধারণা যাঁদের হচ্ছিল, তাঁরা কিন্তু এটা বুঝলেন না যে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে, যা সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় না। তাঁরা এটাও দেখলেন না যে, যে নির্বাচন নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, মোদি সেই নির্বাচনে জিতে আসা সরকারের প্রধানমন্ত্রীকেই তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেন। এ-ও দেখলেন না, সেই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণেই সুষমার ঢাকা সফর। নির্বাচন নিয়ে যত প্রশ্নই উঠুক, ভারত সেই নির্বাচনকে প্রথম দিনেই সাংবিধানিকভাবে বৈধ বলে জানিয়েছে, নতুন সরকারও সেই বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি; বরং তার আচরণ সেই বৈধতাকেই মান্যতা দিয়েছে।
সুষমার এ সফর স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে ভিত এত বছর ধরে গড়ে উঠেছে, তা মজবুত করে তার ওপরেই সম্পর্কের শক্তপোক্ত খিলান গড়ে ভারত এগোতে চায়। বাংলাদেশের জনগণই ঠিক করবেন, তাঁরা কোন ধরনের সরকার চান, কাদের তাঁরা ভরসা করবেন, পছন্দ করবেন। এই বার্তা সুষমা আন্তরিকতার সঙ্গেই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষকে দিয়ে আসতে পেরেছেন।
যেকোনো সম্পর্কেরই দুটি দিক থাকে। একটি তাৎক্ষণিক, অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা ভারত দীর্ঘ মেয়াদের আলোয় দেখতে চাইছে। সুষমাও বারবার সেটা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন। এবং সে কারণেই তিনি এ সফরকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত হিসেবে দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাণিজ্য, সংযোগ, বিদ্যুৎ, যাতায়াত, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলমিশ বাড়ানোর কথা যেমন বলেছেন, তেমনই সন্ত্রাস, মৌলবাদ, দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো একই ধরনের সমস্যাগুলোর নিরসনে যৌথ প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি জানতেন, আস্থার কথা, ভরসার কথা, শুভেচ্ছার কথা যতই বলা হোক, কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয় বাংলাদেশ তুলবেই এবং সেগুলোর জবাব এড়ানো যাবে না।
এই অতি স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত প্রটোকল বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা এবং অবৈধ অভিবাসনের মোকাবিলার প্রশ্নগুলো। সুষমা কিন্তু এ প্রশ্নগুলোর একটিও এড়িয়ে যাননি। এটা ঠিক, এ চারটি ক্ষেত্রেই দলগতভাবে বিজেপির ভূমিকা বেশ কঠোর। কিন্তু সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বাস্তবোচিত ভূমিকা নিয়ে সমাধানের প্রক্রিয়ায় যে তাঁরা আগ্রহী, সেই বার্তা কিন্তু তিনি দিতে পেরেছেন এবং সেই ভরসা তিনি জোগাতে সফল। তিস্তা ও সীমান্ত প্রটোকল নিয়ে সফরের দিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনালাপ সুষমার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিচক্ষণতারই পরিচায়ক।
এটা ঠিক যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আধার হিসেবে তিস্তা ও সীমান্ত বিরোধকে প্রধান করে তোলার

বাংলাদেশি মানসিকতা ভারতের সাউথ ব্লকের রীতিমতো না-পছন্দ। কিন্তু সেই দেশের রাজনৈতিক আবহে এ দুই বিষয়ই যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এ বাস্তবতাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্বীকার করতে পারছে না। বাংলাদেশকে সুষমা এটা বোঝাতে চেয়েছেন, স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মীমাংসায় সরকার একান্তই আগ্রহী। সে জন্য সময় লাগবে। কিন্তু সম্পর্কের প্রবাহ সেই কারণে থমকে যাওয়া উচিত নয়।
সীমান্ত হত্যা ও অনুপ্রবেশের সমস্যাও স্পর্শকাতর বিষয়। সুষমাকে এ দুই প্রশ্নের মুখোমুখিও হতে হয়েছে। তাঁর পক্ষে এ দুই বিষয়ে বাংলাদেশি মানসিকতার মোকাবিলা করাটাও ছিল কঠিন। কারণ, দলীয় অবস্থান। ভোটের আগে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি বিভিন্ন জনসভায় অনুপ্রবেশ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, যা বাংলাদেশের অপছন্দ। সীমান্তে নরম মনোভাব গ্রহণও বিজেপির দলগত নীতির পরিপন্থী। সুষমা কিন্তু বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি; বরং দলীয় অবস্থানের বাইরে এসে সমস্যা দুটি ‘মানবিক’ আখ্যা দিয়ে তার সার্বিক মোকাবিলার ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের নেতাদের তিনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন, অনুপ্রবেশ সত্যিই যে একটা সমস্যা, সেটা অস্বীকার করলে ভাবের ঘরে চুরি করা হবে। এ সমস্যা বিশ্বব্যাপী। সর্বজনীন। অতএব এর মোকাবিলায় যা কিছু করণীয়, তা করতে উদ্যোগী হতে হবে, যাতে দুই দেশই সমস্যামুক্ত হয়।
বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সুষমা দেখা করেন কি না, সেই আগ্রহ বাংলাদেশে যেমন ছিল, তেমনই ছিল দেখা হলে আলোচনার গতিপ্রকৃতি কোন খাতে বয়, তা নিয়ে। এই সাক্ষাৎ নিয়ে শাসকগোষ্ঠীরও হয়তো কিছুটা আড়ষ্টতা ছিল। শেষ পর্যন্ত সুষমার হোটেলে এসে খালেদা দেখা করেন। গণতান্ত্রিক ভারত কোনো দেশের বিরোধীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও যে গণতন্ত্রী, খালেদার সঙ্গে দেখা করে সুষমা সেটাও বুঝিয়ে দিলেন। খালেদার সঙ্গে সুষমার কথাবার্তা প্রায় পুরোটাই ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক, একমাত্রিক ও নালিশে ভরা। সুষমা তাঁকেও বুঝিয়ে দিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ সমস্যার মোকাবিলা বাংলাদেশের জনগণকেই করতে হবে। ভারত সম্পর্ক রাখবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে। বিরোধী নেত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গেও সুষমা দেখা করেছেন। তাঁকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন; অথচ খালেদা জিয়াকে তা জানাননি। দ্বিধাবিভক্ত বাংলাদেশি রাজনীতিতে এটা নিশ্চিতভাবেই আওয়ামী লীগের কাছে শ্লাঘার বিষয়।
ভারত যে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ দেখতে চায়, এ বার্তা সুষমা বারবার দিয়েছেন। প্রতিবেশী অশান্তিতে থাকলে ভারতও যে শান্তিতে থাকতে পারে না, এ কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার বুঝিয়েছেন। প্রতিবেশীদের সবাইকে নিয়ে ভারত উন্নতির সিঁড়িগুলো ভাঙতে চায়, বিকাশের পথে এগোতে চায়—এ কথাও মোদি বারবার বলছেন। এগুলো যে কথার কথা নয়, ক্ষমতায়নের এক মাসের মধ্যেই তা তিনি রেখেছেন। সুষমাকে ঢাকা সফরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত তারই প্রমাণ।
এ সফরে সুষমা তাঁর একমাত্র সাক্ষাৎকারে প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘গত আর্থিক বছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৫৬৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।’ ভারত চায়, অচিরেই রপ্তানির পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াক। তাহলে সহযোগিতার বহর বৃদ্ধি বোঝানো যাবে। এর অর্থ বাংলাদেশের আর্থিক দিক থেকে বলশালী হওয়া। মোদি সরকারের লক্ষ্যও বাংলাদেশকে শক্তিশালী ও বিত্তশালী দেখা। প্রথম একক সফরে ঢাকায় গিয়ে সুষমা সেটাও বোঝাতে পেরেছেন।
সুষমার এই সফরকে ‘শুভেচ্ছা সফর’ বলা হয়েছে। সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে জানা, সে দেশের সরকার ও জনগণকে চেনা-জানা ও নিজেকে চেনানো। পরস্পরকে জানা-চেনার এই প্রাথমিকতায় সুষমা স্বরাজ সফল। প্রথম সফরে তিনি কীভাবে আদৃত এবং পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসা স্থাপনে কতটা সফল, একটি ছবিই সম্ভবত তা বুঝিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। ২৯ জুন প্রথম আলোয় প্রকাশিত হাসিনা ও সুষমার সেই ছবিটা আরও একবার ভালো করে দেখুন। কোনো কোনো ছবি কিছু না বলেও অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়; ক্যাপশনের প্রয়োজন হয় না।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0