default-image

মরণঘাতী মহামারি করোনাভাইরাসে যখন সারা পৃথিবী সয়লাব, তখন এই মরণব্যাধি ঠেকাতে সদ্য আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন নিয়ে জীবন বাঁচাতে ব্যতিব্যস্ত পৃথিবীর মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ। তাহলে পৃথিবীর ৮৬ শতাংশ মানুষের কপালে কী ঘটবে, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স’।

গত বছর ১০ নভেম্বর বিশ্বের প্রথম করোনাপ্রতিরোধী টিকা আবিষ্কার করে জার্মানির বিওনটেক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মাসিউটিক্যাল প্রস্তুতকারক ফাইজার কোম্পানি। এক সপ্তাহ পরই করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের খবর জানায় যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি মডার্না। পরে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, রাশিয়ার গামেলেয়া স্পুতনিক ফাইভ করোনা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

করোনা মহামারি প্রতিরোধক ভ্যাকসিন ব্যবহারের ফলে ধনী দেশগুলোর রাষ্ট্রনেতারা তাদের নিজ নিজ দেশের জনগণকে স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও মৃত্যুহার হ্রাস পাবে বলে আশ্বস্ত করছেন। নিজ দেশের বাইরেও যে আরও দেশ, আরও মানুষ রয়েছে, সেই বিষয়টিতে এখন তাঁদের তেমন নজর নেই।

এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মুখে সর্বত্র করোনাপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন সংগ্রহ নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে এই ভ্যাকসিনের ক্রয় বাণিজ্য ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধনী দেশগুলোর আধিপত্য বেশি করে চোখে পড়ছে। বিশ্বজুড়ে এই সংকটময় অবস্থার আলোকে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স’ বা সর্বজনের জন্য টিকা জোট নামে একত্র হয়েছে। এদের মধ্য অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফ্রন্টলাইন এইড, গ্লোবাল জাস্টিস নাউ, অক্সফাম, কারিতাস প্রভৃতি সংগঠনগুলো রয়েছে।

নবগঠিত পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স বলছে, তাদের এই জোট বিশ্বের সব মানুষের জন্য করোনাপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন চাই, তা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। তারা বলছে ভ্যাকসিন বিষয়ে ধনী দেশগুলো এমন কোনো প্রভাব খাটানো বা মজুত করা উচিত নয়, যাতে অন্য দেশগুলোর ভ্যাকসিন পেতে সমস্যা হতে পারে।

বিশ্বের সব মানুষের ভ্যাকসিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এই বিষয়টি যদি ধনী দেশগুলো এবং ওষুধ কোম্পানিগুলো এখনই বিবেচনা না করে, তাহলে কী ঘটবে, সেই প্রশ্ন এসেছে! এতে করে বিশ্বের ৭০ দরিদ্র দেশের সরকারগুলো করোনাভারাস প্রতিরোধে তাদের জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে সক্ষম হবে।

‘পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স’ তাদের বিবৃতিতে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, আপাত কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন বণ্টন ব্যবস্থায় যা দেখা যাচ্ছে, তাতে এই বছরে পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোতে প্রতি ১০ জনের মধ্য ৯ জন মানুষের ভাগ্যে ভ্যাকসিন জুটবে না। বিপরীতে ধনী দেশগুলো যে পর্যাপ্ত হারে ভ্যাকসিন অর্ডার দিয়েছে বা মজুত করেছে, তাতে তারা তাদের নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের তিনবার করে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে পারবে। হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের ধনী দেশগুলো যাদের মোট জনসংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার তুলনায় মাত্র ১৪ শতাংশ। অথচ তারা ৫৩ শতাংশ ভ্যাকসিন ডোজ সংগ্রহে সচেষ্ট রয়েছে। ধনী দেশগুলোর এমন উদ্যোগ মানবতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিশ্বের সব মানুষের ভ্যাকসিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এই বিষয়টি যদি ধনী দেশগুলো এবং ওষুধ কোম্পানিগুলো এখনই বিবেচনা না করে, তাহলে কী ঘটবে, সেই প্রশ্ন এসেছে! এতে করে বিশ্বের ৭০ দরিদ্র দেশের সরকারগুলো করোনাভারাস প্রতিরোধে তাদের জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে সক্ষম হবে।

গত ৯ ডিসেম্বর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল ইস্যু বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে ‘পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স’ বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, জীবন বিজ্ঞান ও বাজার গবেষণাবিষয়ক কয়েকটি সংস্থার গবেষকেরা বিভিন্ন ধনী দেশগুলোর সঙ্গে টিকা প্রস্তুতকারী ওষুধ কোম্পানিগুলোর চুক্তি পরীক্ষা করেছেন। এই গবেষণালব্ধ ও তথ্যউপাত্ত নিয়ে করোনা মহামারি প্রতিরোধে অসম বিশ্বজনীন টিকা ব্যবস্থার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করেছে। করোনায় আক্রান্ত ৬৭ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশ নিয়ে তারা গবেষণা করেছে, যেমন পাকিস্তান, মিয়ানমার, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ইউক্রেন প্রভৃতি দেশে গত মাস পর্যন্ত ১৫ লাখ মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। এই দেশগুলো ঝুঁকির মধ্যে রইলেও টিকা সংগ্রহের বিষয়ে তাদের সামর্থ্যতা কম।

বিজ্ঞাপন

অক্সফামের প্রধান স্বাস্থ্য আধিকারিক আনা ম্যারিয়ট বলেছেন, ‘মুনাফার আগে মানুষের জীবন নিয়ে ভাবতে হবে। কার পকেটে কত টাকা রয়েছে, তাই যদি জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন ব্যবহারের মানদণ্ড হয়, তবে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ এই মহামারি প্রতিরোধে টিকা নিতে অসমর্থ হবে।’ গ্লোবাল জাস্টিস নাওয়ের হাইডি চৌ বলেছেন, বিজ্ঞানের অর্জন যেন মানুষের জীবনরক্ষাকারী না হয়ে শুধু ওষুধ কোম্পানিগুলোর মুনাফা অর্জনের পথ না হয়। ফ্রন্টলাইন এইডসের পরিচালক লোইস চিংগান্দুর মতে, এই মহামারিটি একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা, যার একটি বৈশ্বিক সমাধান প্রয়োজন। আর যতক্ষণ না পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের এই ভ্যাকসিন নেওয়ার সামর্থ্য রইবে না, ততক্ষণ বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল ইস্যুবিষয়ক পরিচালক স্টিভ ককবার্ন জানিয়েছেন, ভুলে গেলে চলবে না, মানবাধিকার বিষয়ে ধনী দেশগুলোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই ভ্যাকসিন নিয়ে শুধু নিজেদের কথা না ভেবে, গরিব দেশগুলোর জন্যও টিকা পাওয়ার সুযোগ ও সহযোগিতায় এগিয়ে যেতে হবে।

গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন বা গ্যাভি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বজুড়ে গরিব দেশগুলোর জন্য স্বল্পমূল্যে টিকা দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া ইইউ কমিশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক উদ্যোগে, সংক্রামক রোগ ও মহামারির টিকা তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক সংস্থার (সিইপিআই) নেতৃত্বে করোনার টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণের বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স গড়ে উঠেছে। কোভ্যাক্স স্বল্প ও মধ্যম আয়ের ৯২টি দেশকে করোনা টিকা সংগ্রহে সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছে।

ইতিমধ্যে বিশ্বের শতাধিক সাবেক রাষ্ট্রনেতা, সাংবাদিক, শিল্পী, অর্থনীতিবিদ—যাঁদের মধ্য রয়েছেন সিরিল রামাফোসা, গর্ডন ব্রাউন, হেলেন ক্লার্ক, মেরি রবিনসন, জোসেফ স্টিগলিটজ, টমাস পিকেটি প্রমুখরা যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে একটি উন্মুক্ত চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে তাঁরা করোনা ভ্যাকসিনের বিশ্বজনীন ব্যবহারের বিষয়ে বাইডেনের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

বিজ্ঞান প্রযুক্তি সর্বজনীন হোক, বিশ্বজুড়ে সবার জন্য ভ্যাকসিন দাবিটি ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। ইউরোপে নানা মানবাধিকার সংগঠন ক্রমেই বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে, আর তা অবশ্যই আশাপ্রদ।

সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মান প্রতিনিধি

sharaf. ahmed@gmx. net

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন