default-image

বীর মুক্তিযোদ্ধা কবীর মেহরাব কোভিড-১৯ আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর জন্য একটা আইসিইউ বেডের জন্য কত যে হাহাকার করেছি। কত জনকে যে ফোন করেছি একটি আইসিইউ বেড ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যাও–বা একটা পাওয়া গেল, সেটাও কোনো এক প্রভাবশালী ব্যক্তি হুমকি দিয়ে দখল করে নিলেন। নিরুপায় হয়ে আবার খোঁজাখুঁজি, অবশেষে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একজন মন্ত্রীর রেফারেন্স দিয়ে রাত একটায় গুলশানে এক হাসপাতালে একটি আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা করা হয়। ২৭ জুন রাতে তাঁকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি ২৮ জুন বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ৬৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে কবীর মেহবার ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রতিদিন চার থেকে পাঁচবার কথা হতো। তিনি এক সপ্তাহ আগেও আমাকে একটি চিঠি পড়ে শোনালেন। চিঠিটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে লেখা। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গার্ড অব অনার নেবেন না। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ না করে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়েছেন, প্রতি মাসে মুক্তিযোদ্ধার বেতন–ভাতা নিচ্ছেন, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার নিচ্ছেন। এটা আমাদের জন্য একটি জাতীয় লজ্জা। এই লজ্জা থেকে বাঁচার জন্য আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গার্ড অব অনার প্রত্যাখ্যান করলাম।
তিনি আরও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, যেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধা লাঞ্ছিত হয়, অপমানিত হয়, সেখানে মৃত্যুর পর আমি রাষ্ট্রীয় সম্মান চাই না।
চিঠিটি গন্তব্যে পাঠানোর আগেই তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন চির ঘুমের দেশে।
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা কবীর মেহরাব একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগঠন দি মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভারস অব দ্য ওয়ার্ল্ড সোসাইটি বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। এই সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার। তিনিও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে আনিসুজ্জামান স্যারকে নিয়ে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য অনেকের কাছে তিনি লেখা চেয়েছিলেন। করোনা–পরবর্তী সময় সংগঠনের পক্ষ থেকে আনিসুজ্জামান স্যারের অনেক বড় করে স্মরণসভার আয়োজন করার কথা ছিল। কিন্তু আজ তাঁর জন্যই যে আমাদের স্মরণসভার আয়োজন করতে হবে।
কবীর মেহবার ১৯৫৩ সালে ১ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদ ময়নামতির সিন্ধুরিয়াপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ২ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন। মুজিব বাহিনীর বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার কমান্ডার সৈয়দ রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে তিনি দেরাদুনে ট্রেনিং নিয়েছিলেন। ট্রেনিংয়ের আগে তিনি প্রথম গিয়েছিলেন আ স ম আবদুর রবের কাছে এবং বলেছিলেন, রব ভাই, আমি মুক্তিযুদ্ধে যাব। রব সাহেব বললেন, ও পারবে রাজু? ও কি পারবে? শারীরিক ফিটনেস দেখে তাঁরা তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে নিলেন না। কিন্তু অদম্য সাহসী ও নাছোড়বান্দা কবীর মেহরাব মুক্তিযুদ্ধে যাবেনই। তারপর রব সাহেব তাঁকে পাঠালেন সোনামুড়া সৈয়দ রেজাউর রহমানের কাছে এবং বললেন, ওখানে গিয়ে দেখো রেজা সাহেব তোমাকে মুক্তিযুদ্ধে নিতে পারেন। আগরতলা থেকে ৫০ থেকে ৬০ মাইল দূরে সোনামুড়া বাসে ঝুলে চলে গেলেন সৈয়দ রেজাউর রহমানের কাছে। খুঁজে বের করলেন তাঁকে। সেখানে কবীর মেহরাব সৈয়দ রেজাউর রহমানকে বললেন, রেজা ভাই, আমি মুক্তিযুদ্ধে যাব। রেজা সাহেব তাঁর ইন্টারভিউ নিলেন। কী পড়ো? ভিক্টোরিয়া কলেজে, থার্ড ইয়ারে।
কবীর মেহরাবের আত্মবিশ্বাস দেখে সৈয়দ রেজাউর রহমান তাঁকে নিয়ে নিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে কবীর মেহবারের সঙ্গে থাকা তিনজন সহযোদ্ধা সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।
কবীর মেহরাব মুজিব বাহিনীর প্রধান শেখ ফজলুল হক মনির খুব স্নেহভাজন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনি তাঁকে ঢাকায় থাকার জন্য জমি দিতে চেয়েছিলেন। তিনি নেননি। তাঁর মতো একজন দেশপ্রেমিক, নির্লোভ, নিরহংকার মানুষ আজকের সমাজে খুব বেশি দেখা যায় না। ২৮ জুন রাত ১০টায় কুমিল্লার ময়নামতির সিন্ধুরিয়াপাড়া গ্রামে তাঁকে তাঁর বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়েছে।
তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল, অনেক প্রত্যাশা ছিল দেশকে নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। তাঁর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ওপর ডকুমেন্টারি ফিল্ম নির্মাণের কাজটি অসমাপ্ত থেকে গেল। মাতৃভাষার ওপর তৈরি এই তথ্যচিত্রটি জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। তাঁর রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজগুলো আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
একজন মুক্তিযোদ্ধা যে চোখ দিয়ে তাঁর দেশকে দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁর দেশের মানুষকে দেখতে চেয়েছিলেন, সেই চোখ দিয়ে আমরা যেন তাঁর রেখে যাওয়া আগামী দিনের স্বপ্নের বাংলাদেশকে দেখি।

সুজন হাজং: সাংগঠনিক সম্পাদক দ্য মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভারস অব দ্য ওয়ার্ল্ড সোসাইটি, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0