বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যদি এই অল্প সময়ে সরকার নির্বাচন কমিশন গঠনের একটি আইন প্রণয়নও করে, তারপরও তিনটি ঘটনার যেকোনো একটি ঘটতে পারে। এক. চরম বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত একটি সংসদ তার ব্রুট মেজরটির সুবিধা নিয়ে অগ্রহণযোগ্য একটি আইন তৈরি করতে পারে। দুই. একটি ভালো আইন যদি তৈরিও হয়, সেই আইনের অধীনই সরকার চাইলে তার আজ্ঞাবহ কমিশন তৈরি করতে পারে। তিন. আইন এবং কমিশন—দুটোই চমৎকার হতে পারে। ধরে নিই, আশ্চর্যজনকভাবে তৃতীয় ঘটনাটি ঘটল। তাহলেই কি আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করতে পারি?

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, নির্বাচন কমিশনে যে-ই থাকুক না কেন, দলীয় সরকারের অধীন কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। কিছুদিন আগে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) একটি ওয়েবিনারে আইন বিশেষজ্ঞ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন নিয়ে কাজ করা নাগরিকেরা স্পষ্ট বলেছেন, সংবিধান মেনে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি আইন করার বাধ্যবাধকতা আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা মোটেও যথেষ্ট নয়। নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনোভাবেই বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে ১১টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে যে ৪টি নির্বাচন মোটাদাগে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল, তার প্রতিটি হয়েছিল একটি নির্দলীয় সরকারের অধীন। সে বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন তো হয়ইনি; বরং রাজনৈতিক অবিশ্বাস, অনাস্থা, বিদ্বেষ বেড়েছে বহুগুণে।

বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে ১১টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে যে ৪টি নির্বাচন মোটাদাগে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল, তার প্রতিটি হয়েছিল একটি নির্দলীয় সরকারের অধীন। সে বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন তো হয়ইনি; বরং রাজনৈতিক অবিশ্বাস, অনাস্থা, বিদ্বেষ বেড়েছে বহুগুণে।

এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে যেকোনো টক শো, আলোচনা কিংবা প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলাপে সরকারি দলের সদস্যরা সব সময় বড় গলায় গর্ব নিয়ে বলেন, বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রাম জানে না। বিষয়টা অনেকটা এমন, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাইলে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সেটা আদায় করে নিতে হবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের একক দায়দায়িত্ব প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির। অবাক হয়ে লক্ষ করি, তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যখন সেখানে কোনো তথাকথিত নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী উপস্থিত থাকেন, তিনিও আওয়ামী লীগের সুরে একই প্রশ্ন তোলেন।

যে বুদ্ধিজীবীরা প্রতিমুহূর্তে বিএনপিকে নসিহত করেন, কেন তারা আন্দোলন করে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করতে পারে না, তঁারা ভুলেও কখনো প্রশ্ন করেন না, ২০১৪ বা ২০১৮ সালের নির্বাচন কেমন হয়েছে। কখনো জানতে চান না, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতনসহ বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বাক্‌স্বাধীনতা, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অবস্থা কী। প্রশ্ন তোলেন না বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন, রাজনীতিকীকরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়া ইত্যাদি নিয়ে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি আমরা। আজ থেকে ঠিক ৫১ বছর আগে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানি জান্তা সরকারের অধীন যে নির্বাচন হয়েছিল, তাতে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ সেই সময় একটি জান্তা সরকারের অধীনেও এমন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছিল, যাতে পূর্ব পাকিস্তানভিত্তিক একটি দল ভূমিধস বিজয় পেয়েছিল। কিন্তু সেই দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি, যার ফলে পাকিস্তান নামের দেশটি ভেঙে যায় এবং জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

সম্প্রতি মিয়ানমারে নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকটটিও অনেকটা তা-ই। দেশটিতে যে দলই ক্ষমতায় যাক না কেন, সাংবিধানিকভাবেই সামরিক বাহিনী বহুলাংশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধান অনুযায়ী সেখানে সংসদের ২৫ শতাংশ আসন এবং প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, সীমান্ত ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত।

এ পরিস্থিতিতেই ২০২০ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচন হয়, যাতে অং সান সু চির দল ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। জান্তা-সমর্থিত দল নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে, যা নির্বাচন কমিশন নাকচ করে দেয়। সু চিকে গ্রেপ্তার করে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এরপরই মিয়ানমার ভীষণভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে বিকল্প সরকার গঠন করা হয়েছে, তারা বিশ্বের সব রাষ্ট্রের কাছে স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছে। বহু জায়গায় সশস্ত্র বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ সেনাবাহিনীকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, মিয়ানমারে একটা সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পথে। নিশ্চিতভাবেই দেশটিতে অনেক রকম সংকট ছিল। কিন্তু দেশটি আজ গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি পর্যায়ে চলে গেছে শুধু নির্বাচিতদের হাতে সঠিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার কারণে।

পাকিস্তানের ইয়াহিয়া সরকার কিংবা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে কিন্তু বিজয়ীদের ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি বা ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে। আর আমাদের সমস্যা হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে না পারার ব্যর্থতা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার দায় চাপানো হয় প্রধান বিরোধী দলের আন্দোলনের ব্যর্থতা, ভালো নির্বাচন ‘আদায়!’ না করতে পারার ওপর, তখন খুব স্পষ্ট হয়ে যায়, এ দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্তই হলো মল্লযুদ্ধ, আর কিছু নয়। ঠিক এ ধরনের পরিস্থিতিই দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়, অন্তত ইতিহাস তা-ই বলে।

  • রুমিন ফারহানা বিএনপির সাংসদ ও হুইপ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন